দ্বীন হল- নাসিহা বা কল্যাণকামিতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الدين النصيحة، قلنا: لمن؟ قال: لله، ولكتابه، ولرسوله، ولأئمة المسلمين وعامتهم
“দ্বীন হল-কল্যাণকামিতা। (সাহাবায়ে কেরামের উক্তি) আমরা বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! দ্বীন কার জন্য কল্যাণকামিতা? তিনি বললেন-আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল ও মুসলিম উম্মাহর আমির-উমারা এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য”।
(হাদিসটি সহীহ মুসলিমে হযরত তামিম দারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত)
নাসিহা দ্বীনেরই একটি অংশ। নাসিহা হৃদয়ে দয়া ও ভালবাসা সৃষ্টি করে। যখন কোন ব্যক্তির নিকট নাসিহা পেশ করা হয়, এটা তার প্রতি কল্যাণকামিতা ও দয়ার আলামত। সাধারণভাবে নাসিহা হল - কোনো ভাল কাজের পথ দেখানো এবং কোনো মন্দ কাজ থেকে লোকদেরকে সতর্ক করা। সামষ্টিক বিবেচনায় এটি আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারের অন্তর্ভূক্ত একটি আমল - যদিও তা এর চেয়ে একটু খাস। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الدين النصيحة لله، ولكتابه، ولرسوله، ولأئمة المسلمين وعامتهم
“দ্বীন হল নাসিহা বা কল্যাণকামিতা। আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল ও মুসলিম উম্মাহর আমির-উমারা এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য”।
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। বরং এক্ষেত্রে নাসিহা প্রযোজ্য হবে। এই দুই ক্ষেত্রে নাসিহা বলতে বুঝায়। যেমনটি আহলে ইলমগণ বলেন -
• কিতাবুল্লাহর জন্য নাসিহা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা’আলার কিতাব শেখা, শেখানো ও তার গভীর ইলম অর্জন করা, তাতে উল্লখিত হুদুদ-শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা।
• কিতাবুল্লাহর জন্য নাসিহা দ্বারা আরেকটি উদ্দেশ্য হল- কোরআনের তেলাওয়াত করা এবং আল্লাহ তা’আলার কিতাবের অনুসরণ করা।
• আল্লাহর রসূলের জন্য কল্যাণকামিতার অর্থ হল - তাকে ও তাঁর পবিত্র সুন্নাহকে সম্মান করা, তাঁর সুন্নাহর পরিপূর্ণ পাবন্দি করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধকে কাজে পরিণত করা।
মুসলিম উম্মাহর ইমামদের জন্য নাসিহার অর্থঃ
শায়খ আব্দুল্লাহ বিন খালেদ আল-আ’দম রহ. বলেন, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাদের উপর অর্পিত আমানতের ব্যাপারে (আমাদের পক্ষপ থেকে)তাদেরকে সহযোগিতা করা, নেক কাজে তাদের আনুগত্য করা, গাফলতির সময় তাদেরকে সতর্ক করা, ভুল-ত্রুটির ক্ষেত্রে তাদেরকে বারণ করা, তাদের প্রতি অনাসক্ত হৃদয়গুলোকে তাদের দিকে ফিরিয়ে দেয়া এবং উত্তম পদ্ধতিতে তাদেরকে জুলুম থেকে বিরত রাখা।
শরয়ী উলুল আমর তথা কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য নাসিহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজনে তাকে সত্যের পথ প্রদর্শন করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য নাসিহা করতে হবে। যদিও তিনি শরয়ী বিধান অনুযায়ী বিচার করেন, তবুও তো তিনি নিস্পাপ নন। তার ভুল-ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। তাই তিনি যখন ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তাকে সঠিক ফয়সালার দিক-নির্দেশনা দেওয়া, বিষয়টির ক্ষতিসমূহ বুঝিয়ে দেওয়া জরুরী।
আমাদের হক্বপন্থি উলামায়ে কেরাম উম্মাহর খলিফাদের ব্যাপারে খুবই ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। হকপন্থি মুত্তাকি আলেমগণ উমাইয়া ও আব্বাসি খলিফাদেরকে উত্তমভাবে সত্যের পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন অথচ সেসময় জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারপরেও তারা নাসিহা প্রদানে সচেষ্ট ছিলেন। তারা উত্তমরুপে নাসিহা প্রদান করতেন, কখনো তা হত বজ্রকন্ঠে, কখনোবা বিনম্রভাষায়। কখনো প্রকাশ্যে তারা নাসিহা করতেন, আবার কখনো গোপনে।
মুসলিমদের ক্ষেত্রে নাসিহার পদ্ধতি হল - তাদেরকে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর বিষয়ের দিক-নির্দেশনা প্রদান করা। সকল মুসলিমের জন্য আমভাবে নাসিহা হবে এমন - যা তাদের দ্বীন এবং দুনিয়ার কল্যাণ বয়ে আনবে। সেইসাথে তাদেরকে দ্বীন এবং দুনিয়াবী বিষয়ে ক্ষতি করবে এমন বিষয়ে সতর্ক করা।
নাসিহা প্রদানের কতিপয় আদব এখানে উল্লেখ করা হল:-
প্রথমত:- আল্লাহ তা’আলার প্রতি ইখলাস থাকা। নিঃসন্দেহে আমাদের নাসিহার উদ্দেশ্য হবে এমন - যেন এর উসিলায় আল্লাহ তা’আলার নিকট মাকবুল হতে পারি। যে নাসিহা মুসলিম উম্মাহ, মুসলিম ভাই এবং মুসলিম জামাআর জন্য করব তার দ্বারা যেন আমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারি। এটা যেন আমাকে আমার রবের নিকট নৈকট্যশীল বান্দা বানিয়ে দেয়। আখেরাতের জীবনে এই কাজের প্রতিদান কামনা করব। সেইসাথে রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টিও কামনা করবো। সুতরাং আমার প্রিয় ভাইয়েরা নাসিহার জন্য ইখলাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দ্বিতীয়ত: সাধারণত ভায়েরা গোপনে নাসিহা দিতে ভুলে যান। অথচ একান্তে - গোপনে নাসিহা দেওয়া খুবই ফলপ্রসূ। আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার তো প্রকাশ্য-গোপন উভয় অবস্থায় হবে। আর নাসিহা দেওয়ার বিষয়টি অনেকটা ব্যক্তির অবস্থার উপর নির্ভরশীল। অবস্থাভেদে কখনো কখনো প্রকাশ্যে নাসিহা প্রদান করা জরুরী হয়ে দাড়ায়। তবে অধিকাংশ সময়ের মূলনীতি হলো গোপনে নাসিহা দেওয়া।
তৃতীয়ত: নাসিহা প্রদানে কোমল হওয়া এবং বিনম্র ভাষা ব্যবহার করা।
বলার ক্ষেত্রে মূলনীতি হল - বিনম্র ও সহানুভূতিশীল হওয়া, রুক্ষ ও কর্কশভাষী না হওয়া। নাসিহার ক্ষেত্রে কার্যকরী ও দ্বীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি হলো - নাসিহা গোপনে ও কোমলভাবে দেওয়া। এর কারণটা হল – আমি যাকে নাসিহা দিচ্ছি তাকে আমি শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য ভালবাসি এবং কল্যাণ কামনা করি। তাই আমি তার প্রতি দয়াশীল হবো, তার জন্য হেদায়াত কামনা করবো। আমি তো তাকে ঐ সব বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করতে চাই যার নিকটবর্তী সে হয়েছে। শায়খ আল-আ’দম রহ. বলেন, নাসিহা প্রদানের ক্ষেত্রে – নাসিহা কবুল বা গ্রহণ করার শর্ত আরোপ করা যাবে না। আমি তাকে উপদেশ দিব বলে সেটা তার জন্য গ্রহণ করা আবশ্যকীয় হবে - এমন না হওয়া চাই।
ইমাম ইবনে হাযম রহ. বলেন, তুমি কবুল করার শর্ত আরোপ করে নাসিহা দিবে না। আর যদি এই পদ্ধতিতে সীমালঙ্ঘন কর, তাহলে জেনে রেখ, তুমি উপদেশ দানকারী নও বরং জালেম। আনুগত্য কামনা করা দ্বীনি হকের অন্তর্ভূক্ত নয়।
তিনি আরও বলেন, তুমি মানুষের কাছে এটা কামনা করোনা যে, তারা তোমার আনুগত্য করবে আর তুমি তাদের আমির হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে তুমি হলে তাদের নাসিহা দানকারী। তুমিতো তাদেরকে উপদেশ দিবে। তাদের উপর কর্তৃত্ব করা তোমার সাজে না।
শায়খ আল-আ’দম রহ. বলেন, কবুল করার শর্ত আরোপ করে নাসিহা প্রদান – এমনটা করতে বিবেকও সায় দেয় না। বন্ধুত্বের দাবির ভিত্তিতে এমনটা করাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং স্বাভাবিক হল - আমির তার অধিনস্তদেরকে নির্দেশ করবে এবং মালিক তার গোলামকে আদেশ করবে। আমির বা মনিব তার অধিনস্ত কৃতদাসকে কোন হুকুম দিলে তারা তা সাদরে গ্রহণ করে আনুগত্য করবে। প্রিয় ভাই! এখন তো তুমি তোমার ভাই এবং বন্ধুদের সাথে আছো। সুতরাং তোমার নাসিহা তাদের জন্য কোমলভাবে ও নম্রতার সহিত হওয়া বাঞ্চনীয়।
শায়খ আল-আ’দম রহ. বলেন, নাসিহার আরেকটি আদব হল - যে বিষয়ে নাসিহা প্রদান করা হবে তার সকল দিক সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানা থাকা। শরীয়ার দিক থেকে তার হুকুম কি তাও জানা থাকা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মানুষ কখনো কখনো এই ধারণা করে উপদেশ দিয়ে থাকে যে, এটা সঠিক। অথচ বাস্তবে তা সুন্নাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেদায়াতের বিপরীত। তাই যে বিষয়ে নাসিহা দেওয়া হবে সে বিষয়ে শরীয়তের হুকুম কি - তা শুরুতেই জেনে নেওয়া উচিৎ।
আমি যে বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার ইচ্ছা করেছি - শরীয়ার হুকুমগত দিক থেকে তার অবস্থান কি? সেটা ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব? এটা খেয়াল করে জেনে নিব। অনেকসময় আমরা মাকরুহ বা ইজমার বিপরীত বিষয়ে নাসিহা দিতে থাকি অথচ আমি জানি-ই না যে, এটি ইজমার বিপরীত। তাই যে বিষয়ে উপদেশ দিব তার শরয়ী হুকুম জানা থাকা অপরিহারর্য।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. মাজমুআতুল ফাতাওয়ায় বলেন:
ওয়াজিব দাওয়াহ এবং অন্যান্য দাওয়াহ বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে এমন শর্তাবলীর প্রয়োজন, যা দ্বারা তা বাস্তবায়ন করা যাবে। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে - আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার যে ব্যক্তি করতে চায়, তার জন্য উচিৎ হল, সে যে বিষয়ে আদেশ করবে তাকে সে বিষয়ের ফক্বীহ হতে হবে। যে বিষয়ে নিষেধ করবে, সে বিষয়েও ফক্বীহ হতে হবে। যে বিষয়ে সে আদেশ বা নিষেধ করবে, সে বিষয়ে কোমল হতে হবে। যে বিষয়ে সে আদেশ-নিষেধ করবে, সে বিষয়ে সহনশীল হতে হবে। আদেশ দেওয়ার আগে ফিক্বাহ অর্জন করবে, যেন সে সৎ কাজকে ভালো এবং অসৎ কাজকে খারাপ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। আদেশ করার সময় কোমল হবে, যেন সে কাংখিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য অধিক নিকটবর্তী পন্থা অবলম্বন করতে পারে। আদেশ করার পর সহনশীল হবে, যেন সে আদেশ-নিষেধ পালনের কষ্টের উপর সবর করতে পারে। কেননা অধিকাংশ সময় তা পালন করতে গিয়ে কষ্ট স্বীকার করতে হয়। (শাইখুল ইসলাম রহ. এর কথা এখানে শেষ হয়েছে)
এ সব কথার উদ্দেশ্য হলো- নাসিহা প্রদানে ইলম, সহনশীলতা, কোমলতা ও দয়া থাকা চাই। এটাই শাইখুল ইসলাম রহ. এর কথার সারাংশ।
হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
"أحب الناس إلي من رفع إلي عيوبي"
“মানুষের মধ্য থেকে আমি তাকে বেশী ভালবাসি যে আমার দোষ দেখিয়ে দেয়”।
হযরত মায়মুন বিন মাহরান রাহ. বলেন, আমাকে উমর বিন আব্দুল আজিজ রহি. বলেছেন,
"قل لي في وجهي ما أكرهه، فإن الرجل لا يَنصح أخاه حتى يقول له في وجهه ما يكرهه"
আমার অপছন্দনীয় বিষয়গুলো আমাকেই বলুন। কেননা কোন ব্যক্তি ততক্ষন তার অপর ভাইয়ের কল্যানকামী হতে পারেনা, যতক্ষন না সে, তার(ভাইয়ের) অপছন্দনীয় বিষয়গুলো তাকেই বলে”।
সাহাবা-তাবেয়ীগণ ঐসব লোককে মুহাব্বত করতেন যারা তাদেরকে হেদায়াত মূলক নাসিহা দিতেন এবং তাদের দোষ-ত্রুটি দেখিয়ে দিতেন – যেন তারা মন্দ থেকে রক্ষা পান। আজ অধিকাংশ মানুষের অবস্থা তাদের মত নয়। যখন কাউকে নাসিহা দেয়া হয়, সে নাসিহা বা উপদেশ দাতাকে শত্রু মনে করে অথচ সে তার কল্যানকামী। নাসিহা দানকারী হবে বন্ধু, কোমল ও দয়াশীল। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপদেশ দানের সময় খেয়াল রাখা অপরিহার্য। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আালার নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে তার আনুগত্যে স্থিরতা দান করেন এবং তার নাফরমানি থেকে ফিরিয়ে রাখেন। নিঃসন্দেহে তিনি সব কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।