রাশিয়াতে একটা গণঅভ্যুত্থান ঘটে ১৯০৫ সালে। অনেকটা বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতই।

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জার আপসরফা হিসেবে ‘অক্টোবর ম্যানিফেস্টো’ ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে সংগঠন করার অধিকার দেওয়া হয়, ধর্মঘট করার অধিকার দেওয়া হয় এবং একটা পার্লামেন্ট করা হয় যে জারের ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ চলতে পারে, এরকম একটা সেটেলমেন্ট।

অক্টোবর মেনিফেস্টোতে ছিল মূলত তিনটি বিষয়। যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হচ্ছে –

"ব্যক্তি, নিরাপত্তা, বিবেকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা। সভা ও সংগঠন করার স্বাধীনতা, যেটা আগে ছিল না।"

১৯০৫ এর পরপরই বলশেভিক ও অন্যান্য আন্ডারগ্রাউন্ড যেসব সংগঠন ছিল, তারা থেকে প্রকাশ্যে আসে। প্রধাণমন্ত্রী হিসেবে আসীন হয় পিওতর স্তলিপিন। যাকে সহজেই মুহাম্মাদ ইউনুস বা বর্তমান প্রধাণমন্ত্রীর সাথে মেলানো যায়।

গোটা পরিস্থিতিকেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর সাথে মিলিয়ে পড়া যায়।

হাসিনার আমলে ডেমোক্রেটিক রাইটস বলতে যেগুলো বুঝায়-  যেমন হরতাল, বিক্ষোভ সমাবেশ এগুলো করতে দেয়া হতো না সহজে। যে কোনো বিরোধীপক্ষ ক্র্যাকডাউন ও নিপীড়নের শিকার হতো। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগও আওয়ামিলীগ দিচ্ছিল না। যেহেতু কোন রিকন্সিলিয়েটরি প্রসেস ছিল না (অর্থাৎ আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে কোন দাবি দাওয়া আদায় করা বা সরকার পরিবর্তনের কোন প্রক্রিয়া ছিল না), এই কারণে হাসিনাকে বলপূর্বক উৎখাত করতে হয়েছে এবং একটা গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত ৫ই আগস্টের পরে হয়েছিল। এর মানে হলো যে – ২৪ এর অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ নিয়ে আসার পিছনেই সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সংগঠিত হয়েছিল।

অক্টোবর ম্যানিফেস্টো’র ন্যায় বাংলাদেশেও ‘জুলাই চার্টার' বা 'জুলাই সনদ’ – হতে দেখা যায়। এবং হাসিনার আমলে সাধারণ গণতান্ত্রিক দলগুলোও সংগঠিত হতে পারছিল না। প্রতিবাদ, সভা-সমাবেশ, জনগণকে সংযুক্ত ও সক্রিয় করার পথগুলো রুদ্ধ ছিল।

ইসলামপন্থীদের প্রকাশ্যে সত্য কথা বলা তো ছিল অকল্পনীয় বিষয়। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কথা বলাই ছিল আয়নাঘরে গমন, ক্রসফায়ারে শিকার হওয়া বা দীর্ঘমেয়াদী কারাবাসের কারণ। তাহলে প্রকৃত ইসলামপন্থীদের সংগঠিত মেহনত হাসিনার আমলে প্রকাশ্যে, খোলামেলাভাবে করার সুযোগ কতটা সংকীর্ণ ছিল তা বলাই বাহুল্য। গণমানুষের কাছে হকের দাওয়াত ও সংগঠনকে যথাযথভাবে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি চিন্তা করাও ছিল মুশকিল।

জুলাই সনদে সকল রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর করা এবং তৎপরবর্তীকালে এদেশের রাজনৈতিক অবস্থা এখন কেমন? সাধারণ মানুষের অবস্থা কেমন?

মানুষ ১৭ বছর পরে ভোট দেয়ার আনন্দে আত্মহারা। এমনকি মানুষকে আপ্লুত হতে দেখা যায়, যখন জামায়াতের আমির ও বিএনপির চেয়ারম্যান একত্রে বসে, আলাপ করে। মানুষ উল্লাসে ফেটে পরে প্রধাণমন্ত্রী স্রেফ ঈদের জামাতে টুপি পরলে। এমন অবস্থায় আমূল পরিবর্তনের জন্য চূড়ান্ত দাবী করার রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়া খুবই মুশকিল। কারণ মানুষকে সেক্যুলাররা আবারো প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই এখানে সামগ্রিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে অনেক কিছুই এড়ানো হচ্ছে রাজনৈতিক কারণ বিবেচনায়। আর এই অবস্থা চিরস্থায়ী তো নয়ই, দীর্ঘস্থায়ীও হবার কথা না।

এই সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার মূল বাস্তবতা সুখময় কিছু না, এই পুরো ব্যাবস্থাটাই ভেতরে-বাইরে পরিপূর্ণ করাপ্টেড এক সিস্টেম, এটা মানুষের কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট। এই অলস, স্থিতাবস্থা আর পেছন দিকে যাত্রা আধুনিক সকল ব্যার্থ বিপ্লবের পরই দেখা যায়। কিন্তু এমনটা স্থায়ী হওয়ার নয়।

এদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র পশ্চিমা ডেমোক্রেটিক পার্টিগুলোর মত না। আর এটা হওয়া স্বাভাবিকও না। কারণ হচ্ছে ইউরোপ – আমেরিকায় সরকারী ও বিরোধী পক্ষের মাঝে “Separation of Power”, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও বিকাশ সংক্রান্ত ধারণা বিশেষ প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে এবং দীর্ঘ সময়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হানাহানি ইত্যাদির পর রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে সরকারপক্ষ ও বিরোধী পক্ষের মাঝে যে ভারসাম্য থাকে। আরো কিছু সামাজিক কারণও রয়েছে, যার ফলাফল হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক কাঠামো বেশ ফাংশন করছে। কিন্তু বাংলাদেশ বা মুসলিম বিশ্বে গণতান্ত্রিক কাঠামোটা এভাবে আসে নাই। বরং উপনিবেশবাদের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ইসলামি আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়াও এদেশে এখনো মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা পশ্চিমাদের মতো গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হয়ে উঠেনি, বরং ক্ষমতাকে কিভাবে স্থায়ী করার চেষ্টাই মূলত তারা করে।

এদেশের ইতিহাস থেকে আমরা দেখি, ১৯৫৪ তে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর একটা রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়, যার পরিণতিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পথ সুগম হয়। মোটামুটি ১৫ বছর  স্থিতিশীলতা থাকার পর ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান কিন্তু সংকট রয়ে যাওয়ায় ১৯৭১ সালে জনযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই আবার ১৯৭৫ সালে তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান। জিয়াউর রহমানের শাসনের সমাপ্তি ঘটে ১৯৮১ সালে, যার পরপরই আবার এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থান। দশ বছর পার হবার আগেই ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী নাগরিক অভ্যুত্থান। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করার পর ২০০৬ সালে সেনাপ্রধানের নের্তৃত্বে ১/১১ এর অভ্যুত্থান এবং পরিশেষে ২০০৮ সালে আওয়ামিলীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর।

অত:পর ২০১৪ পর্যন্ত কিছুটা স্থিতিশীল ছিল থাকলেও দেশ আবার অস্থিতিশীল হলেও বিরোধী দল  ব্যার্থতায় সরকার টিকে থাকে। শেষ অবধি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হয়।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, গড়ে প্রতি ১২ থেকে ১৬ বছরের টাইম স্প্যানে বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এটা বহুবিধ কারণেই হয়ে থাকে। তা রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রের কারণে হোক, এদেশের মানুষের সহজাত বিদ্রোহী মানসিকতার কারণে হোক, বারবার প্রতারিত হবার কারণে হোক বা অন্য যে কারণেই হোক না কেন।

তাই যদিও আপাতত মানুষের আচরণে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যাবস্থায় আস্থার বিষয়টি প্রকাশ পাচ্ছে, এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবেই। আমরা দেখছি যে, সরকার থেকে কিছু সুযোগ সুবিধা পেলে, সংসদের স্পিকারের আরবি বলা, প্রধাণমন্ত্রীর শিশুদের সাথে সময় কাটানোতে আজ মানুষ সন্তুষ্ট, উল্লাস প্রকাশ করছে।

আমরা গায়েব জানি না।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এটাই যে, বিদ্যমান ক্ষমতালোভী, আদর্শিকভাবে দেউলিয়া রাজনৈতিক দলগুলো সময়ের সাথে সাথে একে অপরকে প্রতিপক্ষ থেকে শত্রুতে পরিণত করবে। সমঝোতার রাজনীতি থেকে বিভাজনের রাজনীতিতে অগ্রসর হবে। আওয়ামীলীগ বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের (সেনাবাহিনী, বিদেশি শক্তি ইত্যাদি) সুযোগ নেয়ার বিষয়টি ব্যাতীত অন্য কোনো কিছু রাজনৈতিক দলগুলোকে হানাহানি ও সংঘাত থেকে বিরত রাখতে পারবে না। যা একসময় আবারো নতুন করে বিপ্লবের নৈর্ব্যক্তিক পরিস্থিতি (objective condition) তৈরি করবে, এমনটা ধারণা করাই যায়।

তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, মানুষের মাঝে প্রকৃত ইসলামি ও বৈপ্লবিক চেতনার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। তাই, ইসলামপন্থীদের আসলে কাজ তো কেবল শুরু। এখানে, একটা হল যে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি বা ইসলামপন্থীদের শক্তির জায়গা থেকেও দেখা যায় যে, তাঁদের সমাজে অবস্থান দুর্বল। অবশ্যই আমরা আশাবাদী এই জায়গায় তবে আমাদের আরো অনেক কাজ করতে হবে বেশ কয়েক বছর। টিকে থাকার জন্যেই আমাদের বেশ কয়েক বছর এখনো কাজ করে যেতে হবে। এরপর দাওয়াহ ও রাজনীতির যথাযথ বিকাশের জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে।

সহজভাবে বললে, শাসকগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার দ্বন্দ, অকার্যকর হবার জন্য সময় দিতে হবে। পাশাপাশি নিজেদেরকেও বিকশিত ও সংগঠিত করতে হবে, ঈমানী রাজনৈতিক দিক থেকে অগ্রসর হতে হবে, মানুষকে হক বোঝানোর মেহনতের পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই দুটি দিকেই ইসলামপন্থীদের, বিশেষ করে সংগঠনের নজর রাখতে হবে এবং সতর্কতার সাথে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগবিরোধী অভ্যুত্থানে কেবল আওয়ামী লীগ গিয়েছে কিন্তু সেক্যুলার শাসনব্যবস্থা আগের জায়গাতেই আছে। তাই কেন্দ্রীয় দাওয়াহ কেবল সরকারি দলবিরোধী হওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ যেন না হয়ে যায়, তাও লক্ষ্য রাখতে হবে। বরং গোটা রাজনৈতিক ব্যাবস্থার আমূল পরিবর্তন, মানুষ ও সমাজকে ইসলামী চেতনায় দীক্ষিত করাকে চিন্তার কেন্দ্রে রাখা উচিৎ।

যদি এমন হয় যে ইসলামপন্থীরা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালি, সংগঠনের গণভিত্তিও আছে, সেক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র যেন প্রকাশ পায় সে লক্ষ্যে কাজ করার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। সংগঠন কেবল গণভিত্তি অর্জন করে বসে থাকবে, বিষয়টা এমন হওয়া উচিৎ নয়। শুরুতে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করে গণভিত্তি অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শাসকগোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণও জরুরি।  কিন্তু প্রিম্যাচ্যুরলি কেবল অন্যের দিকে, প্রতিপক্ষের দিকে নজর রাখা সঠিক না। এটা প্রতিক্রিয়াশীলতা জন্ম দেয়, মনোযোগ নস্ট করে ও ক্লান্ত করে তোলে।

আল্লাহই ভালো জানেন।