‘সংগঠনে আলেম কোথায়?’

‘সংগঠনে কি আলেমদের বোর্ড আছে কি না?’

এই প্রশ্নগুলো সাধারণত দেওবন্দী ঘরানার তরুণ ছাত্র ভাইদের থেকে (এবং যে ভাইয়েরা তরুণ তালেবে ইলম ভাইদের থেকে দ্বীন শেখেন তাদের থেকে) প্রকাশ পায়।  তাই দেখা যায়, যখনই কোনো ইসলামি সংগঠন ময়দানে দাওয়াতি, সাংগঠনিক কাজে ব্যপ্ত হয় তখন এই প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেয়া হয়। 

কোনো সংগঠন হক্বের মানদন্ডে উত্তীর্ণ কি না, শরঈ উসুলের খেলাফ করছেন কি না- এ দিকগুলোর পরিবর্তে সংগঠনে মাদ্রাসার ভাইদের অংশগ্রহণকে হক্বের মানদন্ড বানানোর দুঃখজনক প্রবণতাও দেখা যায়।

আলহামদুলিল্লাহ!  উলামায়ে দেওবন্দ ও ছাত্র ভাইদের মধ্যে যারা প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও আকাবিরে দেওবন্দের কিতাবাদি পড়েছেন- তাদের দিক থেকে এমন প্রশ্ন বা আপত্তি দেখা যায় না। 

কেননা, সকলেই জানেন ইলমের খেদমত – দ্বীন ইসলামের স্বতন্ত্র খেদমত।  আর যে কোনো ইসলামী মেহনত- চাই তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হোক – প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে হওয়া জরুরি।  আর তা উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হওয়া ব্যতীত সম্ভব না। 

আমাদের উলামাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য এটাই যে- আহলুল ইলম অর্থাৎ, উলামায়ে কিরামদের অবস্থান সকল আন্দোলন ও সংগঠনের উর্ধ্বে।  কোন আলেমকে সাংগঠনিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা শরীয়াহ’র দিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। 

আলহামদুলিল্লাহ, বিষয়টা আমাদের উলামায়ে কিরাম বারবারই আলোচনা করেছেন।  বিশেষ করে শায়খ উমার মাহমুদ উসমান, শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী (রহিমাহুল্লাহ) দের লেখনিতে সুস্পষ্টভাবে এই আলোচনাগুলো আমরা পাই।

ইসলামপন্থী কোনো সংগঠন যখন সমাজ ও শাসনব্যবস্থায় ইসলামের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে ময়দানে মেহনত করেন- তখন তাদেরকে দাওয়াহ, তানজিম, সিয়াসাহ, ই’দাদ, প্রতিপক্ষের শক্তির ব্যাপারে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।  সমাজের শ্রেণি-পেশা-বয়স ভেদে মানুষের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে মানুষকে হক্বের উপর পরিচালিত করার পরিকল্পনা করতে হয়।

মোটকথা দাওয়াতি, সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ময়দানে যে ইসলামপন্থী সংগঠন কাজ করে, তাদেরকে নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।  এজন্য ন্যূনতম পরিমাণ ইলম অর্জন করা সদস্য-নেতা; সবার জন্যই জরুরি।  কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই ইলমি ময়দানে ইজতিহাদ ও গভীরতা অর্জনের সক্ষমতা কেবল তা’লিম, তাদরিস, দিরাসাহ ও ইস্তিফাদায় জীবন কুরবান করে দেয়া আলেমদের পক্ষেই সম্ভব। 

তাই উলামায়ে কেরামের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং তাদের থেকে ইলমি দিকনির্দেশনা নিয়েই হকপন্থী সংগঠনকে কাজ করতে হয় এবং হবে।

কিন্তু কেবল আলেমদের বা মাদ্রাসার ভাইদেরকে সংগঠনভুক্ত করে নিজেদের ইসলামি প্রমাণের শর্টকাট পন্থা অবলম্বন করা উচিৎ নয়।  এটাও উচিৎ নয় যে, নিজস্ব শরঈ বোর্ড তৈরি করে কেবল তাদের থেকেই ইলম গ্রহণ করা হবে।

আলেম বা মাদ্রাসার ভাইদের অবশ্যই সংগঠন করার সুযোগ রয়েছে।  বিশেষত, যে সকল আলেম ও ছাত্রভাই ইলমের গভীরতা অর্জনের চেয়ে বাস্তব ময়দানে মেহনত করায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।  আর এটাও বাস্তবতা যে- মাদ্রাসা থেকে ফারেগ হওয়া সত্ত্বেও ইলমের প্রতি প্রবল ঝোঁক অনেকেরই থাকে না।  এবং ইলমি গভীরতা অর্জন করা ব্যক্তির সংখ্যা কমই হয়ে থাকে।  এমন ব্যক্তিরা সংগঠন করবেন এটাও ঠিক।

পাশাপাশি প্রাজ্ঞ আলেমদের অনেকেও বিশেষ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ময়দানে কাজ করেন।  যেমন- আমাদের নেতা ও শায়খ জামাল ইবরাহিম, শায়খ আবু ইয়াহইয়া, শায়খ আবুল হাসান আল বুলাইদি, শায়খ মুহাম্মাদ আল মুরশিদি, শায়খ ইব্রাহিম আর রুবাইশ (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ। 

তবে এখানে ঢালাও স্থুল চিন্তার অধিকারীদের জন্য কোনো দলীল নেই।  কেননা, উনারা যখন ইলমি প্রবন্ধ ও ফাতওয়া প্রকাশ করেছেন- তখন তা সাংগঠনিক লেন্সে করেন নি, বরং উম্মাহর জন্যই করেছেন।  সংগঠনকেন্দ্রিক মেহনত আর আলেম হিসেবে মেহনত; উভয়ই স্বতন্ত্র অবস্থানে রাখার মতো ইলমি গভীরতা ও ভারসাম্য উনাদের ছিল।  এবং উনাদের থেকে দল-মত, স্থান-কাল নির্বিশেষে মুসলিমরা ফায়দা নিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। 

বিপরীতে, যারা দলের মাঝে আলেমদের অন্তর্ভুক্তিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানান, আমরা তাদেরকে এবং অন্তর্ভুক্ত হওয়া আলেমদেরকে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে যেতে কমই দেখি।  আল্লাহ তা’আলা সহায় হন।

আগেই বলা হয়েছে, এই আপত্তি বা সংশয়টি দেওবন্দি ঘরানার তরুণ তালেবে ইলম ও এ ঘরানার সোহবতপ্রাপ্ত ভাইদের থেকেই বেশি আসে।  বিশেষত দেওবন্দি ঘরানার দল তাবলীগ জামাতের মাঝে “আলেমপন্থী” ও “সাদ-পন্থী”দের বিভাজন, তিক্ততা ও কাঁদা ছোড়াছুড়ির ফলে এই সংশয় ও আপত্তিটি আরো ঘন হয়ে ওঠে। 

এমতাবস্থায় আকাবিরে দেওবন্দের বক্তব্য সামনে থাকলে বোধ করি সংশয়গুলো দেখা দিত না।  তাই মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহিমাহুল্লাহ) এর বক্তব্য সামনে থাকাটা জরুরি।

মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“আজ এ মর্মে চিন্তাভাবনা চলছে যে, আলেমদেরকে রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হতে হবে।  শুনে রেখো, ময়দানে আসার পরিণতি এই হবে যে, কামরাও হাত ছাড়া হবে আর ময়দানও হাতে আসবে না।  যারা আলেমদেরকে মাঠে নামাতে চান তাদের কাছে ময়দানে নামার কোন শর্ত কিংবা সীমারেখা নেই।  তাদের মুখে এও শোনা যায় যে, এখন মাসআলা বলার সময় নয়; বরং কাজের সময়।  সুতরাং কাজ করা চাই।” [আল-ইফাজাত : ১/১৩] 

“খুবই পরিতাপের বিষয় হল, কেউ কেউ তো আরো অগ্রসর হয়ে ইলমের পথে সাধনাকে অনর্থক বলে বক্তব্য দেয়।  জানি না, তারা এ সবক কোথা থেকে গ্রহণ করেছে।  ইউরোপেও তো এহেন প্রথা নেই।  সেখানেও তো এ ধরনের আন্দোলন ও রাজনীতি রয়েছে। 

কিন্তু যারা ইলমের সাধনায় লেগে আছে তাদেরকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হয় না।  তাই বলি, হুঁশের সাথে কাজ করতে হবে।  এমনিই তো আবেগ দ্বারা কোন কাজ হয় না।  যদি হয়ও তার স্থায়িত্ব খুবই সামান্য সময় হয়ে থাকে।’’ [আল ইফাজাত-১/১৯] 

“যদি সীমারেখা ডিঙ্গিয়ে উন্নতি করা সম্ভব হয় তাহলে এমন উন্নতি হবে যেমনটি ফেরাউন করেছিল।  এমন উন্নতি দিয়ে একজন মুসলমানের কী হবে?  এটাকে মুসলমানদের জন্য উন্নতি বলা বেমানান।  এটাকে কাফেরদের উন্নতি বলা যেতে পারে।  এমন উন্নতির মাঝে মুসলমানদের জন্য কোন গৌরব নেই।  মুসলমানদের গৌরব তো এমন উন্নতির মাঝে নিহিত রয়েছে যেখানে সীমারেখা ও মূলনীতি রক্ষা করা হয়।” [মালফুজাতে হাকীমুল উম্মত-২/১৫] 

“কেউ কেউ বলে থাকে, এখন কামরায় বসে থাকার সময় নয়; বরং ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার সময়।  কিন্তু আমি বলি, উসুল ও নীতিমালা পরিপন্থী পদ্ধতিতে কাজ করলে কামরাও যাবে, ময়দানও যাবে।  না এদিক হবে, না সেদিক হবে।  শরীয়তের সীমারেখা লঙ্ঘন করে যদি সফলতা এসেও যায়, তাহলে তাও একজন মুসলিমের জন্য বড় ব্যর্থতা।” [মালফুজাতে হাকীমুল উম্মত-২/১৪] 

“আমি আলেমদের রাজনীতির মাঠে অবতীর্ণ হওয়ার একেবারেই বিরোধী নই; বরং আমার কথা হল, সবার জন্য ময়দানে আসা জায়েয নেই।  ভালোভাবে ইলম অর্জন করার পর কারো ময়দানে আসার আগ্রহ থাকলে আসবে।  কিন্তু কিছু লোক মাদ্রাসা ও খানকায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা উচিত।  দ্বীনি কিতাবের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা ছাড়া যাদের কোন ব্যস্ততা থাকবে না।

কেননা, অভিজ্ঞতা বলে, অধ্যাবসায় ছাড়া কিতাব বোঝা ও ফতোয়া দেয়ার যোগ্যতা পরিপূর্ণ হয় না। 

এখন যেসব আলেম রাজনীতিতে নেমেছেন তাদের অধিকাংশেরই কিতাবী যোগ্যতা শূন্যের কোঠায়।  আর যদি কারো মাঝে সে যোগ্যতা থেকে থাকে তাহলে তা কামরায় নির্জনবাসের বরকতেই অর্জিত হয়েছে।  তারা একটা দীর্ঘ সময় কামরায় সাধনা করেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন অথচ তারাই এখন সেই কামরাকেই বন্ধ করতে তৎপর।  যার পরিণতি এই হবে যে, কিছু দিনের মধ্যেই কুরআন-হাদীস ও ফিকহ অনুধাবনকারীগণ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবেন। 

পৃথিবীতে যদি আলেম-উলামার উপস্থিতি কামনা করেন, তাহলে সকল আলেমকে ময়দানে নামানোর চিন্তা পরিহার করুন। 

কিছু আলেম ময়দানে তৎপরতা চালাবেন, কিছু মুনাজারা করবেন আর কিছু দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করবেন।” [আত তাবলীগ-২/১৭] 

“একটি জামাত তো এমন হবে যারা সব কিছু হতে পৃথক হয়ে কুরআন-হাদীস, ফিকহ ও আবশ্যকীয় দ্বীনি তালীম প্রদান করবেন।  অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা ছাড়া তাদের আর কিছু না করা উচিত।  এর ব্যতিক্রম হলে কিছুতেই যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম তৈরি হবে না। 

সুতরাং খেদমতের মাঝে সুষম বণ্টন খুবই জরুরি। 

সকল বুদ্ধিজীবি এবং সভ্য ও উন্নত জাতি কর্মবণ্টনের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।  এরপরও কেন কতিপয় বন্ধু আমাদের সকলকে একটিমাত্র কাজে নিরত হতে বাধ্য করতে চান।  সুতরাং আলেমগণ কাজ করেন না বলে অভিযোগ তোলা অবান্তর।  আলহামদুলিল্লাহ! আলেমগণ তাদের মূল দায়িত্ব ঠিকই পালন করছেন।  আপনারা তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে যাবেন না।” [আত তাবলীগ-১২/১৭] 

“আমি বলি, আলেমগণ তাদের দায়িত্ব তথা কুরআন-হাদীসের মর্ম উদ্ধার করা, শরীয়তের বিধি-বিধান বর্ণনা করা ইত্যাদি কাজ সুচারুরূপেই আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।  এর বেশি কিছু তাদের দায়িত্ব নয়।  এখন বলুন, আলেমগণ এসব কাজ থেকে কখনো পিছু হটেছেন?” [আত তাবলীগ-১৫/২৫০]

“কেউ কেউ আলেমদেরকে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মিলে কাজ করার পরামর্শ বিতরণ করে থাকেন।  কেননা, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে শক্তি সৃষ্টি হয়।  আমি বলি, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার মর্মই বুঝেননি।

সকলে কাজ করার মর্ম এই নয় যে, সকলে এক কাজেই লেগে থাকবে; বরং কাজ বণ্টন করে নিবে।  যেমন, একটি গৃহের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হলে কর্মপদ্ধতি কী হবে?  রাজমিস্ত্রী ইট গাঁথবে, কাঠমিস্ত্রী করাত ও হাতুড়ি দিয়ে কাঠের কাজ করবে আর শ্রমিকগণ তাদের সাহায্য করবে।  এটাই হল গৃহ নির্মাণের পদ্ধতি। 

আমি জিজ্ঞাসা করি, সকলে মিলেই যদি ইট গাঁথতে লেগে যায়, কিংবা কাঠের কাজে লেগে যায় কিংবা সকলে মাটি খননে লেগে যায়, তাহলে কি গৃহ নির্মাণ সম্ভব হবে?  নির্দ্বিধায় বলবেন, হবে না।  অনুরূপভাবে দ্বীনি ব্যাপারেও কর্মবণ্টন হওয়া উচিত। 

আলেমগণ তাদের কাজ করবেন এবং রাজনীতিবিদগণ তাদের কাজ করবেন।  এভাবে উভয়ের কাজ এক হয়ে যাবে।  ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার মর্ম হল রাজনীতিবিদগণ মাঠে-ময়দানে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করবেন আর আলেমসমাজ শরীয়তের বিধি-বিধান প্রচার-প্রসারের কাজ করবেন।  এভাবে প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন।” [আত তাবলীগ-১৫/২৪২] 

“প্রত্যেক জাতির জন্য কর্মবণ্টন জরুরি।  এ ছাড়া কাজ চলবে না।  সভ্য সমাজ এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একমত।  তাই তো যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী, অফিসার, কেরানী, চিকিৎসক ইত্যাদি শ্রেণীর লোক যায়।  সকলে মিলে যুদ্ধের কাজ আঞ্জাম দেয়। 

সব জায়গায় কর্মবণ্টন জরুরি মনে করা হয়।  শুধু আলেমদের ক্ষেত্রেই তা জরুরি মনে করা হয় না।  আলেমদের স্কন্ধে দেশের সকল কাজ চাপিয়ে দেয়া হয়।  তারা কুরআন-হাদীস ও ফিকহের ইলম অর্জন করবেন, মানুষকে শেখাবেন, ফতোয়া দিবেন, ওয়াজ করবেন, মাদরাসায় দরস দিবেন, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং রাজনীতিবিদদের সাথে ঝাণ্ডা নিয়ে ময়দানেও শরিক হবেন।  সব কাজ আলেমদের।  অন্যদের ছুটি।  তাদের কোন কাজ নেই। 

রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে আমাদের অভিযোগ নেই যে, তারা জাতীয় রাজনীতির দায়িত্ব কেন নিয়েছেন; বরং আমাদের অভিযোগ হল তারা কেন ঐ কাজে দখল দিতে শুরু করেছেন যেটি আলেমদের ছিল।

সেটি হল শরীয়তের বিধি-বিধানের সমাধান দেয়া।  এটা এখন রাজনীতিকগণই করে ফেলেন।  অথচ তাদের উচিত ছিল জাতীয় উন্নতিকল্পে যে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন তার শরয়ী সমাধান আলেমদের থেকে জেনে নিবেন।  আলেমগণ ফতোয়া দেয়ার পর তা বাস্তবায়ন করবেন। 

রাজনীতিকগণ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করবেন আর আলেমগণ শরীয়তের বিধান বলে দিবেন।  এমনটি হবে না যে, আলেমগণও রাজনীতিকদের সাথে ময়দানে নেমে যাবেন।  তাহলে শরীয়ত নিয়ে গবেষণা করবেন কারা এবং ভবিষ্যতে গবেষক তৈরি হবে কিভাবে? 

এজন্য কর্মবণ্টন খুবই আবশ্যকীয় বিষয়।  জাতীয় উন্নতির পথে নানা উপায় নিয়ে ভাববেন রাজনীতিকগণ।  ভাবার পর নিজেদের মতামত অনুযায়ী বৈধাবৈধের সিদ্ধান্ত দিবেন না; বরং আলেমদের কাছে জেনে নিবেন।  কেবল অনুবাদ পড়েই মাসআলা বলা যায় না।  আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিতে হয়।” [আত তাবলীগ-১/১৪] 

“আমার মতে তালিবুল ইলমদের জন্য কোন আন্দোলনে অংশগ্রহণের অনুমতি না হওয়া উচিত।  ভবিষ্যতের জন্য এতে মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে।  যা এখন অনুভূত হচ্ছে না।  আমি জিজ্ঞাসা করি, কোন একটি দল অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার কাজে নিরত না থাকলে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার কর্মী কোত্থেকে পয়দা হবে? 

যারা পড়ালেখা থেকে অবসর হয়েছো তোমরা যা ইচ্ছা তা-ই হও বা যা করতে মনে চায় তা-ই কর।  কিন্তু ছাত্রদেরকে তাদের কাজে লিপ্ত থাকতে দাও।  যাতে ভবিষ্যতে দীনের আহকাম বলার মতো লোকের ধারা বহাল থাকে। 

তোমরা কি মনে করো ভবিষ্যতে দীনের প্রয়োজন থাকবে না।  যেমন কিনা কেউ কেউ এখনই বলছেন, এটা মাসআলা বর্ণনার সময় নয়, কাজ করার সময়।  তাদেরকে কেউ জিজ্ঞাসা করে দেখুন, আপনারা যে এখন নেতা হয়ে আন্দোলন করছেন তাতো পড়ালেখার বদৌলতেই হয়েছেন। আ র এখন বনে যাওয়ার পর পড়ালেখার মূলোৎপাটন করছেন।” [আল ইফাজাত-১/১৩] 

“রাজনৈতিক সংগঠনের সভা-সমিতিতে ছাত্রদের অংশগ্রহণের অনুমতি কিছুতেই দেয়া উচিত নয়।  এতে সাংঘাতিক বিপদ রয়েছে। বলুন তো, এ কাজের জন্য কি তালেবুল ইলমরাই রয়েছে?  অন্যান্য মুসলমানগণ কোন কাজের জন্য?  তাদেরকে এ কাজে ব্যবহার করুন।” [আল ইফাজাত-১/৯৯]

‘যদি তোমরা কামনা কর যে, আলেমগণ আরেকটু অগ্রসর হয়ে মাঠের রাজনীতিতেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করুক এবং তোমাদের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলেও শরিক হোক, তাহলে মনে রেখো, সেটা তাদের কাজ নয় এবং এ ব্যাপারে তোমরা তাদেরকে বাধ্য করার অধিকার রাখ না। 

তোমরা আলেমদেরকে কী মনে করো?  তারা যেসব কাজ করেন তার গুরুত্ব কতটুকু জানো? 

ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, কোন এলাকায় যদি কেবল একজন আলেম থাকেন, আর জেহাদ শুরু হয়ে যায়, তখন সে আলেমের পক্ষে জেহাদে শরিক হওয়া জায়েয নয়।  কেননা, উলামায়ে কেরাম সকলে শহীদ হলে দীনের জিম্মাদারী কে পালন করবে? 

এজন্য আমাদের হাজী (ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী) সাহেব আলেমদেরকে হিজরত করতে বারণ করতেন।  বলতেন, যদি তোমরা হিন্দুস্তান ছেড়ে চলে যাও তাহলে এখানে দীনের কী অবস্থা হবে। 

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এটা লক্ষ্য করেন না যে, স্বয়ং ফুকাহায়ে কেরাম আলেমদেরকে রাজনীতিতে আসতে নিষেধ করেছেন।  আসলে তাদের কাজই হল অপবাদ ও অভিযোগ দেয়া। 

মুসলমানদের উপর যে কোন বিপদ আসে, সর্বপ্রথম সে ব্যাপারে আলেমদেরকে অপবাদ দেয়া হয়।  সব কিছুর দায়ভার তাঁদের উপর চাপিয়ে সকলে দায়মুক্ত হয়ে যায়।” [আত তাবলীগ- ১৫/২৪১] 

“আলেমদের যেটা দায়িত্ব তারা সেটাই পালন করবেন।  এর বাইরে কিছু আশা করা উচিত নয়।  আলেমদের থেকে অন্যসব কাজের আশা করার উপমা এমন, কোন ব্যক্তি হাকীম মাহমুদ খানের কাছে গিয়ে ছেঁড়া জুতা সেলাই করার নিয়ম জানতে চাওয়া যেমন।  তিনি সাফ বলে দিবেন, রাস্তার কিনারে মুচি বসে আছে, তাকে জিজ্ঞাসা কর।  এটা আমার কাজ নয়, মুচির কাজ। 

হুবহু একই অবস্থা এখানে।  আলেমদের কাছে মাসআলা-মাসাইল জিজ্ঞাসা করো।  দুনিয়া অর্জনের ফন্দিসমূহ তারা কী জানেন?” [মালফুজাতে হাকীমুল উম্মত-২/১৫] 

“সিয়াসাত’ ও প্রশাসনের দু’টি ভাগ রয়েছে।  একটি ভাগ হল ‘আহকামে শরীয়াহ’।  এটি নিঃসন্দেহে শরীয়তের অংশ।  কোন আলেম এ সম্পর্কে অনবগত নন।  ফিকহের কিতাবসমূহে ‘কিতাবুস্ সিয়ার’ নামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে।  মাদরাসাসমূহে নিয়মিত যার পঠন-পাঠন অব্যাহত রয়েছে। 

আর দ্বিতীয় ভাগটি হল, তার অভিজ্ঞতালব্ধ কৌশলীয় ব্যবস্থাপনা।  যা প্রতি যুগেই পরিবর্তিত হয়ে থাকে।  এটি শরীয়তের অংশ নয়।  আর আলেমগণও এ ব্যাপারে পারদর্শী হওয়া আবশ্যক নয়।  তাঁদের পারদর্শিতার অন্যান্য ক্ষেত্র রয়েছে।  সেসব ক্ষেত্রে তাঁরা পারদর্শিতা অর্জন করবেন। 

উপরে যে বলা হল, রাজনীতি বা প্রশাসনের দ্বিতীয় ভাগটি শরীয়তের অংশ নয়, এর অর্থ এই নয় যে, এটি শরীয়তের ঊর্ধ্বে এবং প্রশাসনিক লোকদেরকে শরীয়ত মেনে চলতে হবে না বা শরীয়তের আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে না।  দুনিয়াতে এমন কোন কাজ ও মতামত এমন নেই যার বৈধ অবৈধতার বিধান শরীয়ত থেকে জানার প্রয়োজন নেই।  সেটা সরাসরি শরীয়ত না হওয়া শরীয়তের অনুগামী না হওয়াকে আবশ্যক করে না।” 

“আলেমগণ রাজনীতিতে না যাওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের প্রমাণঃ

পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَإِ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَىٰ إِذْ قَالُوا لِنَبِيٍّ لَّهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُّقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ  قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِن كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا  قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِن دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا  فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ  وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ

“তুমি কি মূসার পর বনী ইসরাঈলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দেখনি?  যখন তারা তাদের একজন নবীকে বলেছিল, “আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করুন, যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।”  তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের ওপর যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলে তোমরা যুদ্ধ করবে না—এমন হওয়ার আশঙ্কা কি আছে?”  তারা বলল, “আমাদের কী হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব না, অথচ আমরা আমাদের ঘরবাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে বিতাড়িত হয়েছি?”  অতঃপর যখন তাদের ওপর যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলো, তখন তাদের অল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই পিছু হটল।  আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সূরা আল বাকারা, ২৪৬)

কুরআন কারীমের এ আয়াত দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে একজন নবী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা নবীর কাছে এ আবেদন করেনি যে, আপনি আমাদের বাদশা হয়ে যান।  এটা না করে তারা অন্য কাউকে বাদশা নিযুক্ত করে দেয়ার আবেদন করল। 

নবীকে যদি যথেষ্ট মনে করত তাহলে বাদশার আবেদন কেন করল।  যদি বলা হয় যে, নবীকে যথেষ্ট মনে না করে বনী ইসরাঈল ভুল করেছে, তাহলে বলব, নবী তাদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে কেন বললেন না যে, আমিই তো যথেষ্ট।  অধিকন্তু তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নবী একজনকে বাদশা নিযুক্ত করার ব্যবস্থা শুরু করে দিলেন। 

আর যদি কেউ দুঃসাহসিকতা দেখিয়ে বলে ওঠে যে, এটা নবীর পক্ষে ভুল হয়ে গেছে, তাহলে বলব, আল্লাহ তা’আলা কেন নবীর এ ভুলের উপর সতর্ক করলেন না; বরং আল্লাহর কাছে আবেদন জানানো হলে তিনি তা কোনরূপ অস্বীকৃতি ছাড়াই কবুল করে নিলেন।  এ থেকে পরিষ্কার বুঝে আসে যে, প্রত্যেক নবীর জন্যও প্রশাসনিক কাজে পারদর্শী হওয়া অপরিহার্য নয়।  সুতরাং যেখানে নবীর জন্য আবশ্যক নয়, সেখানে আলেমদের ব্যাপারে আর কী বলব। 

বরং মুফাসসিরগণের বর্ণনার আলোকে জানা যায় যে, বনি ইসরাঈলের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার বেশিরভাগ সুন্নত ও রীতি এমনই ছিল যে, সেখানকার প্রশাসনিক ব্যাপারগুলো বাদশাগণ পরিচালনা করতেন।  আর বাদশাগণ নবীদের পরামর্শ ও নির্দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।  তাফসীরে মাজহারীতে اِبْعَثْ لَنَا مَلِكًا -এর ব্যাখ্যায় এমনটিই লেখা রয়েছে।” [আল বাদায়ে-২৫] 

“উপরের আলোচনায় কিছু কিছু অবস্থায় আলেমদেরকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তাতে বর্তমানকালের কতিপয় আলেমের উদ্ভাবিত পন্থাকে বোঝানো হয়নি।  তাদের এ পন্থায় দীনের কোন ফায়দা নেই; বরং শরীয়তের নীতিমালা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তার একটি পদ্ধতি রয়েছে, যা উপকারী হওয়ার প্রবল আশা রয়েছে।  সে পদ্ধতিটি এক প্রিয় ছাত্রের লেখায় দৃষ্টিগোচর হয়েছে।  উপকারী মনে হওয়ায় এখানে তা হুবহু তুলে ধরছি। 

“বর্তমানে একটি পদ্ধতি উপকারী হতে পারে।  তা এই যে, রাজনৈতিক দল ভিন্ন থাকবে এবং ধর্মীয় দল ভিন্ন থাকবে।  ধর্মীয় দলটি তাদের মূল কাজ তথা তাবলীগের কাজ আঞ্জাম দেয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলটিরও তত্ত্বাবধান করবে। 

অর্থাৎ রাজনৈতিক দলটি যেন সরকারের কাছে মুসলমানদের অধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে শরীয়তবিরোধী কোন কাজ না করে।  তাদেরকে উপকারী পরামর্শ প্রদান করবে।  আর যেহেতু বর্তমান যুগে রাজনৈতিক দলের লোকেরা ধর্মীয় ব্যক্তিদের কাছে জিজ্ঞাসা করে কাজ করতে অভ্যস্ত নয়, তাই এজন্য আলেমদের দায়িত্ব ছিল তাদের কাছে গিয়ে উত্তম পন্থায় তাবলীগ করা। 

যদি আলেমগণ নিজেদের মূল দায়িত্ব তথা তাবলীগ চালু রাখতেন তাহলে তাদের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি বহুগুণ বেড়ে যেত।  সেই সাথে তাবলীগের সওয়াবও বৃদ্ধি পেত।

বর্তমানকালের প্রচলিত পদ্ধতিতে আলেমগণ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক দলে যোগদান করা আমার দৃষ্টিতে মারাত্মক ক্ষতিকর মনে হচ্ছে।  এটা না করে যদি তারা তাবলীগ করে করে নেতৃবৃন্দকে সংশোধন করতেন এবং তাদেরকে উপকারী পরামর্শ প্রদান করতেন, তাহলে শরয়ীপন্থায় মুসলমানদের অধিকার সংরক্ষণের পথ উন্মুক্ত হত।  সেই সাথে আলেমদের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিও বৃদ্ধি পেত।" [আল বাদায়ে-২৮] 

“হয়ত কেউ বলবেন, আলেমগণ নিজেরা রাজনীতিতে জড়িত হয়ে কাজ করেন না এবং অন্যদেরকেও কাজ করার সুযোগ দেন না; বরং তাদের সমালোচনা করেন। 

এ সংশয়ের নিরসনকল্পে আমি মিরাঠের একটি জলসায় আলোচনা করেছিলাম যে, আমরা স্বীকার করি রাজনৈতিক বিষয়াদিতে এ লাল টুপিওয়ালারা আমাদের ইমাম।  আর ইমামের ভুল হলে মুক্তাদীদের জন্য লোকমা দেয়া আবশ্যক হয়ে যায়।  অন্যথায় সকলের নামায নষ্ট হয়ে যাবে।  সুতরাং ইমামের উচিত হল নামাযের পূর্বেই আমাদের কাছে এসে কুরআন শুদ্ধ করে নেয়া।  অন্যথায় ভুল করলে আমরা নামাযেই লোকমা দিয়ে বসব।  ভুলের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করব। 

উদাহরণস্বরূপ বলছি, আপনারা যদি বলকানের চাঁদা সম্পর্কে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, মুসলমানগণ কুরবানী না দিয়ে সে পয়সা দিয়ে উক্ত চাঁদা পরিশোধ করবে তাহলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করব।  অথবা যদি আপনারা ফরমান জারি করেন যে, যাকাতের টাকা কাউকে মালিক না বানিয়েই আমাদের কাছে প্রেরণ করুন তাহলে আমরা তার বিরোধিতা করব। 

আপনাদের উচিত হল আমাদের সাথে মিলে কাজ করা।  আর মিলে কাজ করার অর্থ এই নয় যে, একটি কাজই সকলে মিলে করব; বরং সকলে মিলে কাজ করার অর্থ হল, দেশের স্বার্থে একজন একেকটি জরুরি কাজ আঞ্জাম দিবে।  যেমন ঘর নির্মাণের সময় কাঠমিস্ত্রী, কামার এবং রাজমিস্ত্রী সকলে মিলে কাজ করে।  তারা সকলে একই কাজ করে না; বরং একজন কাঠের কাজ করে, আরেকজন লোহার কাজ করে, আরেকজন করে ইটের কাজ।  এভাবে একটি ঘর সম্মিলিত চেষ্টায় সুষ্ঠুভাবে নির্মিত হয়। 

অনুরূপভাবে এখানেও মিলে কাজ করার অর্থ এই নয় যে, আলেমগণও ঝান্ডা হাতে নিয়ে ময়দানে লাফঝম্প করবেন; বরং পদ্ধতি এই হবে যে, ঝান্ডা লাল টুপিওয়ালারাই হাতে নিবে। 

কিন্তু যে কোন কাজ করলে কিংবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চাইলে তা প্রকাশ করার পূর্বেই আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা করে নিবে যে, এটি শরীয়তের পরিপন্থী কি-না।  এখন সম্ভবত আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে, আমরা নেতৃবৃন্দকে কাজ করতে বারণ করি কি-না।  তবে এককভাবে কোন কাজ করতে অবশ্যই বারণ করি। 

যদি তারা আমাদের কাছে কুরআন-হাদীস জিজ্ঞাসা করে ‘ইমামতি’ করে, তাহলে আমরা তাদের ‘মুক্তাদী’ হতে প্রস্তুত রয়েছি।  কিন্তু কুরআন ভুল পড়ে ইমামতি করলে নিঃসন্দেহে আমরা নিজেরাও তাদের পিছনে নামায পড়ব না এবং অন্যদেরকেও পড়তে নিষেধ করব; বরং তাদের নামায নষ্ট হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে দিব।”

[আত তাবলীগ, আসবাবুল ফিতনা-৫/১৬৭] 

(মাওলানা থানভির উদ্ধৃতি সমাপ্ত)


আলহামদুলিল্লাহ।  আশা করি চক্ষুষ্মান ও সত্যানুসন্ধানী দেওবন্দি তালেবে ইলম ভাইদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

ইতিপূর্বে আমরা আমাদের উলামায়ে কেরামের অবস্থান তুলে ধরেছি।  প্রসঙ্গক্রমে এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের অবস্থান পুনরায় তুলে ধরা হলো।

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) সুন্দর বলেছেন, 

“আমীর-উমারাদের উচিৎ শারঈ অভিভাবকদের থেকে উপকৃত হওয়া।”

তিনি আরো বলেন,

وَأُولُو الْأَمْرِ صِنْفَانِ: الْعُلَمَاءُ وَالْأُمَرَاءُ، فَإِذَا صَلَحُوا صَلَحَ النَّاسُ، وَإِذَا فَسَدُوا فَسَدَ النَّاسُ.

“উলিল-আমর দুই শ্রেণির, উলামা ও উমারা।  তারা সংশোধিত হলে মানুষ সংশোধিত হয়, আর তারা নষ্ট হলে মানুষও নষ্ট হয়।”

(মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া, খণ্ড-২৮, পৃ. ১৭০–১৭১)

শায়খ উমার মাহমুদ উসমান বলেন,

“তবে দ্বীনি অভিভাবকেরা যেন আমীর-উমারাদের আজ্ঞাবাহী না হয়ে ওঠেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।  কেননা, তা কোনোভাবেই উত্তম ফলাফল আনবে না। 

মানুষের মাঝে সম্পর্ক দুই প্রকার হয়ে থাকে; দ্বীনি সম্পর্ক এবং জাগতিক সম্পর্ক।  আর মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা এই যে, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কের ব্যাপারে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না।  তাই নেতৃবৃন্দ ও উলামাদের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া জরুরি।”

ইসলামপন্থীদের ও উলামায়ে কেরামের মাঝে যথাযথ সমন্বয় ঘটলেই ইসলামের উত্থান সম্ভব হবে।  উপর্যুপরি ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ, স্থবির চিন্তাধারা এবং প্রায়োগিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না থাকায়, উলামায়ে কেরাম ও নেতৃবর্গের সমন্বিত সম্পর্ক অত্যাবশ্যক।

শায়খ উমার মাহমুদ উসমান এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,

بالنسبة للأخ السائل عن خياره بين طلب العلم في كلية الشريعة وبين الهجرة في سبيل الله تعالى فأقول وبالله التوفيق:

طلب العلم في الجملة أفضل الأعمال وهو أفضل من الجهاد في سبيل الله تعالى، لكن قد يكون في موطن الجهاد متعينا فلا يسع المرء أن يتركه لا للعلم ولا لغيره.

وبالنسبة لواقعنا فإن المجاهدين وغيرهم من المسلمين ينقصهم العلم وهو سبب الفساد في الأرض، أعني نقص العلم وانتشار الجهل،

ولو خير واحد مُجِّد في العلم بين طلب العلم والتفرغ له وبين أن يذهب للجهاد لكان خيرا لدينه ودين الأمة أن يتفرغ للعلم.

ولذلك أنصح هذا الأخ أن يتفرغ لطلب العلم إن كان يرى في نفسه الأهلية لطلبه وله ذهن متوقد يلائم هذا العلم الشريف

“যে ভাই শরিয়াহ কলেজে ইলম অর্জন করা এবং আল্লাহর পথে হিজরত করার মধ্য থেকে কোনটি বেছে নেবে—এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন, তাঁর ব্যাপারে বলছি; তাওফিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই,

একবাক্যে বলতে গেলে, ইলম অর্জন করা সর্বোত্তম আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত।  এমনকি এটি আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়েও উত্তম।  তবে কখনো এমন হতে পারে যে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে জিহাদ করা ব্যক্তির ওপর অপরিহার্য হয়ে যায়।  তখন ইলম অর্জন কিংবা অন্য কোনো কারণে সেখান থেকে বিরত থাকার সুযোগ তার থাকে না।

আমাদের বর্তমান বাস্তবতার ক্ষেত্রে, মুজাহিদসহ অন্যান্য মুসলিমদেরও ইলমের ঘাটতি রয়েছে।  আর এর ফলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, ইলমের ঘাটতি এবং অজ্ঞতার বিস্তারের কারণে জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি হয়।

যদি এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি ইলমে গভীরভাবে পারদর্শী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, ইলম অর্জন ও তার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা এবং (ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে) জিহাদকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়া হয়- তাহলে তার দ্বীন এবং উম্মাহর দ্বীনের জন্য ইলম অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করাই উত্তম হবে। 

এ কারণে আমি এই ভাইকে পরামর্শ দিচ্ছি, যদি তিনি নিজের মধ্যে ইলম অর্জনের যোগ্যতা দেখতে পান এবং তাঁর মেধা ও চিন্তাশক্তি এই সম্মানিত ইলমের উপযোগী হয়, তাহলে তিনি যেন ইলম অর্জনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন।”

অর্থাৎ,  যে সকল তালিবুল ইলম ও উলামাদের মূল ক্ষেত্র ও দক্ষতা শরঈ ইলমের গভীরতা অর্জন করা; তাদের জন্য ইলমের খেদমতে মনোনিবেশ করা উত্তম।  আর এমন ব্যক্তিদের কাছেই ইসলামপন্থী ও হকপন্থী সংগঠনকে যেতে হয় রায় ও ফাতওয়ার জন্য। 

আর যে সকল আলেম বা তালিবুল ইলম মনে করেন ইলমি গভীরতা অর্জনের চেয়ে সাংগঠনিক মেহনত উপযুক্ত, তাদের কথা ভিন্ন।

শায়খ উমার মাহমুদ উসমান একই প্রশ্নের জবাবে আরো বলেন,

وأنبه الأخ أنه لو وجد في نفسه الاستعداد للإعداد والجهاد ولم يجد في نفسه الرغبة في العلم أن يتوجه للإعداد فهو أفضل لأمثاله من المسلمين.

“আর আমি ভাইকে সতর্ক করে দিচ্ছি—যদি তিনি নিজেকে মধ্যে ই’দাদ ও জিহাদের জন্য সামর্থ্যবান মনে করেন, এবং নিজের মধ্যে ইলম অর্জনের প্রতি আগ্রহ না পান- তবে তিনি ই’দাদের দিকে মনোনিবেশ করবেন।  তার মতো মুসলিমদের জন্য এটিই উত্তম।”

পরিশেষে কথা হলো- ইসলামপন্থী সংগঠনের জন্য জরুরি হলো- তাঁরা তাদের দাওয়াতি, সাংগঠনিক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক দায়িত্ব আদায় করতে গিয়ে ইসলামি মূলনীতিকে আঁকড়ে ধরবে।  শরিয়াহ’র সীমালঙ্ঘন হচ্ছে কি না তা যাচাই করে নিবে।

সংগঠনের জন্য উচিৎ হকপন্থী ও প্রাজ্ঞ উলামাদের দ্বারস্থ হয়ে তাদের মত, ফাতওয়া ও দিকনির্দেশনার আলোকে সাংগঠনিক মেহনত জারি রাখা।  কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যে আলেমই হক কথা বলবেন, তা জানা ও মানা হকপন্থীদের জন্য ওয়াজিব।  আমাদের শায়খ হানি আস-সিবাঈ (হাফিজাহুল্লাহ) তাকফিরিদের বিচ্যুতির সমালোচনা করতে গিয়ে এই মূলনীতি খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছিলেন। 

অবশ্যই কোনো সংগঠনে তালিবুল ইলম ও বিজ্ঞ আলেমের অন্তর্ভুক্তি উক্ত সংগঠনের ব্যাপারে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।  এবং প্রত্যেক সংগঠনেই ন্যূনতম এমন কিছু ব্যক্তি থাকা চাই, যারা বিশেষ সাংগঠনিক বাস্তবতার আলোকে ইলমের প্রয়োগে সক্ষম হবেন।

তবে সাধারণ অবস্থা হলো- শরীয়াহ’র যে দাবি; সেটা মেনে নিতে পারছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার জন্য উচিৎ উম্মাহর গ্রহণযোগ্য আলেমদের নিকটবর্তী হওয়া।  কিন্তু আলেমদেরকে সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার যে ব্যাপক প্রবণতা আমরা দেখি তা আমাদের উলামায়ে কিরাম সঠিক মনে করেন না। 

অবশ্যই আলেমগণ, তালিবুল ইলম ভাইয়েরা কোনো না কোনো সংগঠন করতেই পারেন।  কিন্তু যখন তাঁরা কোন সংগঠনে যোগ দেন, তখন ঐ সংগঠনের লক্ষ্য–উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিতে অনেকটা দায়বদ্ধ থাকেন।  এটাও সমস্যা না।  সমস্যা হলো, এই দায়বদ্ধতার চাপে দলের চিয়ারলিডারে পরিণত হওয়া।

হকপন্থী আলেম ও সংগঠনের মাঝে গভীর সমন্বয়, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উপস্থিতি অপরিহার্য।  যে প্রক্রিয়ায় এমনটা নিশ্চিত হ,  তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।

যে সংগঠন হক্বের সর্বাধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে, তাদেরকে গোপন ও প্রকাশ্যে নসীহাহ দেয়া, ভুল হলে ধরিয়ে দেয়া, প্রয়োজনে সমালোচনা করা; এটা প্রাজ্ঞ আলেমদের অন্যতম দায়িত্ব।  এবং সংগঠনেরও দায়িত্ব গভীর ইলম ও অভিজ্ঞতার অধিকারী আলেমদের থেকে সঠিক মতটি জেনে নেয়া। 

তিনি আরবের না আযমের এটিও যেমন দেখা সঠিক নয় এবং একইভাবে তিনি কোন মাসলাকের, দলের বা মাযহাবের - তাও দেখা উচিৎ নয়।  তিনি জনপ্রিয় না অখ্যাত- তাও দেখাও সঠিক নয়। 

বরং কোনো আলেম যে রায়, ফাতওয়া বা দিকনির্দেশনা দেন, তা কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মাহর মাসলাহাত-কে সামনে রেখে দেয়া হয়েছে কি না- সেটাই মূল বিষয়।  

মূলত যেসকল আলেম রায় দেন, উম্মাহর মাসলাহাত, বাস্তবতা ভালো বোঝেন এবং ইলমের গভীরতা অর্জন করেছেন, তাদের পক্ষ থেকেই সংগঠনের উর্ধ্বে গিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া সহজ হয়।  আর কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি এমন আলেমদেরকে  জনপ্রিয়তা, মাসলাক বা দলের লেন্স দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন- তবে তাদের ব্যর্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। 

মোটকথা, কোনো সংগঠন সঠিক পথের উপর আছে কিনা, এটা বিবেচ্য হবে শরীয়াহ’র মূলনীতির আলোকে বিচার করে।  এজন্য সংগঠনের জন্য জরুরি আলেমদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা, আলেমদের নসীহার আলোকে সাংগঠনিক কার্যাবলি পরিচালিত করা। 

কোনো সংগঠন হক্বের উপর চলার মাধ্যমেই প্রমাণ করতে সক্ষম হয় ইলম ও আহলে ইলমের মর্যাদা উক্ত সংগঠনের কাছে কেমন।  তাই, স্রেফ কোনো মাসলাকি মানদন্ডে বা পাগড়ি/পাঞ্জাবির রঙ দিয়ে কোনো সংগঠনকে ঢালাওভাবে ওজন করাটা ইনসাফপূর্ণ নাও হতে পারে।