নিশ্চয়ই তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ্-ই হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য, যাকে সামনে রেখে নবী-রাসূলগণকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে, আসমানী কিতাব নাযিল করা হয়েছে এবং জিহাদের জন্য তরবারী উন্মুক্ত হয়েছে। এবং যার জন্য মানুষ দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, একদল হয়েছে সন্তুষ্ট, অপরদল হয়েছে অসন্তুষ্ট। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই উদ্দেশ্য ব্যতীত একজন নবী বা রাসূলকেও পাঠাননি যে, তিনি সুস্পষ্টরূপে তাওহীদের বাণী মানুষকে জানিয়ে দেবেন, যা হল- একমাত্র আল্লাহ্রই ইবাদাত করা এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করা। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূলকে পাঠিয়েছি (এটা বলার জন্য যে), আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর”। (সূরা আন-নাহল ১৬:৩৬) ইবাদাত বলতে বোঝায় সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও কাজকে যা আল্লাহ্ তা‘আলা ভালোবাসেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। তাঁর কথা ‘তাগুত কে বর্জন কর’ এর অর্থ হচ্ছে, তাগুত থেকে দূরে থাকা, ত্যাগ করা এবং অস্বীকার করা। তাগুত শব্দটি এসেছে তুগইয়ান (সীমালঙ্ঘন) থেকে, এর বহুবচন হচ্ছে তাওয়াগীত। ‘তাগুত (মিথ্যা ইলাহ) কে অস্বীকার করা’র অর্থ সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “গাইরুল্লাহ্র উপাসনা হওয়াকে স্বীকার করে তাকে ঘৃণা করা, তা পরিত্যাগ করা এবং এর সাথে সম্পর্কিত ব্যাক্তিবর্গকে অবিশ্বাস করা এবং তাদেরকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করা”। এই কারণে একজন ব্যক্তির ইসলাম ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না সে তাগুত কে অস্বীকার করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং আল্লাহ ব্যতীত যা কিছুর ইবাদাত করা হয় তাতে অবিশ্বাস করে, তার রক্ত ও সম্পদ হারাম এবং সে পুরষ্কৃত হবে আল্লাহ্র পক্ষ হতে।” হাদীসটি সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘কিতাবুত তাওহীদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “এটিই সবচেয়ে ভালোভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ প্রকাশ করে।” আর তাই একথা বলা হয় নি যে, শুধু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’র স্বীকৃতি দেওয়াই একজন ব্যক্তির রক্ত ও সম্পদকে হারাম করে দেয়, এমনকি সে যদি এর অর্থও জানে এবং একে বিজয়ী করে, এমনকি সে যদি এটা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) মেনেও নেয় এবং বলে “আল্লাহর কোন শরীক নেই” তখনও তার রক্ত ও সম্পদ হারাম হয়ে যায় ন, যতক্ষণ না সে এর সাথে সাথে তাগুতকে অস্বীকার করবে। তাই যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে না, যদি তাকে সন্দেহ করা হয় বা আটক করা হয়, তবে তার রক্ত ও সম্পদ হারাম হবে না। তাই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এবং এটা এমন একটা বিবৃতি ও দলীলস্বরূপ; যা সকল মতপার্থক্যের অবসান ঘটায়। এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নবী-রাসূলগণের নির্দেশিত তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ্ বজায় রাখতে এই কিতাবটিকে (কিতাবুত তাওহীদ) শিক্ষাদানের জন্য বাছাই করা হয়েছে। কারণ যখন তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ্ সম্পর্কে উদাসীন থাকা হয় এবং এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংক্ষেপিত করা হয়, তখন সকল প্রকার শিরকের বিস্তার ঘটে, বিদ’আত ও পাপাচার বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই তাওহীদ থেকে পথভ্রষ্টতা, এ সম্পর্কে না জানা এবং এর হক্ব এবং সম্পূরক বিষয়সমূহ সম্পর্কে উদাসীনতার ফল। এখানে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিষয়টি সম্পর্কে শুধু তার নবুওয়্যাতের শুরুর দিকেই উপদেশ প্রদান করেননি বরং তার জীবনের শেষ পর্যায়েও এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানিয়েছেন। একজন ব্যক্তি যখন ইলমের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছায়, তখন তার জন্য তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ্ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এবং তার জন্য এটা চিন্তা করা উচিত হবে না যে, একজন ব্যক্তির শুধুমাত্র মূর্তিপূজা বা কবরপূজা না করাই তাওহীদে যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য যথেষ্ট। যেমন চিন্তা করে পৃথিবীর সেই নির্বোধ লোকেরা, যারা বলে, যতক্ষণ না আমাদের দেশে কবরপূজা হচ্ছে ততক্ষণ আমরা ঠিক আছি। কুফর বিত তাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার শুধু কবর পূজা ত্যাগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কবরপূজা ত্যাগ করার সাথে সাথে আরো অনেক কাজ ত্যাগ করতে হবে, যার কিছু বড় কুফর আর কিছু ছোট কুফর। যেমন- আল্লাহ্র প্রাপ্য সম্মান-মর্যাদা, অধিকার অন্যদের দেয়া, আলেম-দরবেশদের আনুগত্য করা সেইসব কাজে, যা করতে আল্লাহ্ তা‘আলা নিষেধ করেছেন, আল্লাহ্ যা হালাল করেছেন আর যা হারাম করেছেন তা পরিবর্তন করে ফেলা, আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী শাসন না করা, গাইরুল্লাহ্র দেয়া বিধান দ্বারা শাসন করা, আল্লাহ্ যে ভূমি মুসলিমদের দান করেছেন তা ইহুদী নাসারাদের হাতে তুলে দেয়া, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের বিজয়ের আশা ত্যাগ করা, তার উপর মুসলিম সন্তানদের ইহুদী-খৃস্টান ও মুশরিকদের হাতে তুলে দেয়া। যার ফলে তারা তাদেরকে ঐসকল ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে আর তাদেরকে ইহুদী ও খৃস্টানে পরিণত করে।