প্রশ্নঃ
আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নকর্তাঃ আমার প্রথম চিঠির উত্তর প্রদানের জন্য জাযাকাল্লাহু খায়ের।
১) আমি আপনাকে একটি পরামর্শ প্রদান করতে চাই, ইন শা আল্লাহ এটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
আমার পরামর্শ হল, আপনি এ বিষয়ে কোন আর্টিকেল কিংবা বই লিখুন যাতে, শরিয়াহ বাস্তবায়ন এবং যেসব সরকার শরিয়াহ বাস্তবায়ন করে না, তাদের প্রতি অবস্থানের দিক থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাবের (রাহিমাহুল্লাহ) সময়কালের প্রাথমিক সৌদি রাষ্ট্র ও বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়।
২) আমার আরও ইচ্ছা যে, আপনি আব্দুল ‘আজিজ বিন সৌদের সেই পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে আপনার অভিমত ব্যক্ত করবেন, যারা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাবের দাওয়াহ আন্দোলনের সাথে সহমত পোষণ করেছিলেন, আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।
৩) এছাড়াও, আশা করি আপনি নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিবেনঃ
-শরিয়াহ বাস্তবায়ন না করার কারনে শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম বিন আব্দুল লতীফ আলুশ-শায়খ রাহিমাহুল্লাহ সৌদি সরকারের বিরোধিতা করেছিলেন।
-শায়খ বিন বায এবং শায়খ বিন উসাইমীন (আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন) কি শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম বিন আব্দুল লতীফ আলুশ-শায়খ রাহিমাহুল্লাহ এর এই অবস্থানের সাথে একমত পোষণ করেছিলেন কিনা?
-আর শায়খ বিন বায এবং শায়খ বিন উসাইমীন (আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন) তারা কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে আলিমের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন?
ধৈর্য্যের সাথে আমার এই চিঠি পড়ার জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
ওয়াসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
উত্তরঃ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং শান্তি বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর।
সম্মানিত ভাই, আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ, আপনার চিঠি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে।
চিঠিতে আপনি বলেছেন, “আমি আপনাকে একটি পরামর্শ প্রদান করতে চাই, ইন শা আল্লাহ এটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – আমার পরামর্শ হল, আপনি এ বিষয়ে কোন আর্টিকেল কিংবা বই লিখুন যাতে, শরিয়াহ বাস্তবায়ন এবং যেসব সরকার শরিয়াহ বাস্তবায়ন করে না, তাদের প্রতি অবস্থানের দিক থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাবের (রাহিমাহুল্লাহ) সময়কালের প্রাথমিক সৌদি রাষ্ট্র ও বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়।”
আপনার এরূপ নাসীহাহর জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। অন্যান্য কাজের সংখ্যাধিক্য ও তীব্রতা সত্ত্বেও আশা করছি আংশিকভাবে হলেও আপনি যা উল্লেখ করেছেন আমি তা সম্পন্ন করতে পারব।
ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে আমরা আমাদের “আল-কাশিফ আল-জালিয়াহ” (“প্রস্ফুটিত আলো”) বইয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেছি যে, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে আলে-সৌদ (সৌদি রাজপরিবার) কিংবা অন্য কোন গোষ্ঠীর কোন ব্যক্তিকে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি না, যতক্ষণ না সে ‘আমলের দ্বারা তার তাওহিদকে বাতিল করে দেয় অথবা কুফরী করে।
সম্মানিত ভাই, আলে-সৌদের প্রতি আমাদের শত্রুতা এবং তাদেরকে কাফের সাব্যস্তকরণে আমরা পূর্বেকার জাহিলী যুগের (প্রাক ইসলামি যুগ যেখানে গোত্র ও দুনিয়াবি স্বার্থপরতা ছাড়া মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতার কোন বালাই ছিল না) কোন নীতির অনুসরণ করি না।
জাহিলী যুগের মানুষের ন্যায় আমরা কোন জাহিলী হিসেব-নিকেশের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ, গোত্রপ্রীতি কিংবা ইহলৌকিক সুখ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে শত্রুতার মাপকাঠি নির্ধারণ করি না।
এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান রাফেজি এবং তাদের ন্যায় অন্যান্যদের মতোও না; যারা আলে-সৌদ পরিবারের প্রথমদিককার সদস্য, অর্থাৎ যারা শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ও তার অনুসারীদের দাওয়াহ ও আন্দোলনে সাড়া প্রদান করেছিলেন এবং এবং আলে-সৌদের পরবর্তী সদস্য যারা মানব রচিত আইনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, মানব রচিত আইনের পশ্চিমা রবদের প্রতি আনুগত্য স্থাপন করেছে ও মুসলিমদের বিপক্ষে কাফিরদের সাথে সহযোগিতার হাত মিলিয়েছিল – তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করে না।
আমরা তাদের মত নই এবং আমরা যেন কখনোই তাদের মত না হই।
বরং, আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারের পর এই বিষয়ে অগ্রসর হই এবং স্পষ্টভাবে ঐসব কুফরি আমলের কথা উল্লেখ করি যা কাউকে কাফিরে পরিণত করে। যাতে করে বর্তমান সময়ে আলে-সৌদের যেসব সদস্যের ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য না, তারা এই (কুফরের) হুকুমের আওতা বহির্ভূত হতে পারে।
আমরা নিশ্চিত যে, আলে-সৌদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে এমন মুসলিমকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে যিনি সত্য তাওহিদের অনুসারী।
তাই, যখনই আমরা আলে-সৌদের বর্তমান কিংবা পূর্ববর্তী কাউকে নিয়ে কথা বলব, কিংবা অন্য যেকোন গোষ্ঠীকে নিয়ে কথা বলবো; আমরা খারেজী কিংবা মূর্খদের মত ঢালাওভাবে কুফরের কথা বলবো না।
“আল-কাশিফ আল-জালিয়াহ”তে এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা একেবারে স্পষ্ট ছিল। এবং আমাদের আলোচনার লক্ষ্যবস্তু ছিল আলে-সৌদের ঐসমস্ত সদস্য, যারা স্থানীয়, রাষ্ট্রীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যেকোন স্তরে গায়রুল্লাহর আইন জারি করেছে, কাফিরদের প্রতি আনুগত্যে আবদ্ধ হয়েছে কিংবা আহলুত তাওহিদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য-সহায়তা করেছে, বিশুদ্ধ তাওহিদ ও এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে অথবা কোন সুস্পষ্ট ও সংশয়াতীত কুফরি আমল সম্পাদন করেছে।
এরা ছাড়া যারা ইসলামের ভিত্তি ও মূল আঁকড়ে ধরে আছেন, তারা সৌদ পরিবারের কেউ হোক বা না হোক, তারা আমাদের ভাই হিসেবে গণ্য হবেন। এবং দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকারের দিক থেকে আমাদের ন্যায় সমমর্যাদার অধিকারী হবেন।
কেননা মুসলিম হিসেবে আমাদের নিয়্যাত, বুঝ, সিদ্ধান্ত এবং ফাতওয়া- সবকিছুর মূলভিত্তি হচ্ছে শরিয়াহ, জাহেলিয়্যাত নয়। নিঃসন্দেহে, ঈমানের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তিগুলো হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর রাহে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা এবং একমাত্র আল্লাহর রাহে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা স্থাপন করা।
আমরা প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তিকে ভালোবাসি এবং তার সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করি; যদিও বা বংশ কিংবা জন্মভূমির দিক দিয়ে তারা আমাদের চেয়ে বহুদূরে অবস্থান করে। এবং কাফের ব্যক্তি বংশ, দেশ কিংবা এলাকার দিক থেকে আমাদের যতই নিকটবর্তী হোক না কেন; আমরা তাদের ঘৃণা করি, এবং তাদের সাথে চিরশত্রুতা ও সম্পর্কছেদের ঘোষণা দিই।
আপনি আরো বলেছেন – আশা করি আপনি নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিবেনঃ
-শরিয়াহ বাস্তবায়ন না করার কারনে শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম বিন আব্দুল লতীফ আলুশ-শায়খ রাহিমাহুল্লাহ সৌদি সরকারের বিরোধিতা করেছিলেন।
-শায়খ বিন বায এবং শায়খ বিন উসাইমীন (আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন) কি শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম বিন আব্দুল লতীফ আলুশ-শায়খ রাহিমাহুল্লাহ এর এই অবস্থানের সাথে একমত পোষণ করেছিলেন কিনা?
-আর শায়খ বিন বায এবং শায়খ বিন উসাইমীন (আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন) তারা কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে আলিমের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন?
আমার উত্তর হল – নিশ্চয়ই তারা তাত্ত্বিকভাবে বা নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেন। শায়খ বিন বায কিংবা শায়খ বিন উসাইমীন, তারা কেউই আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে শাসন করাকে সমর্থন করেন না। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তারা আ’মভাবে সরকার কর্তৃক শরিয়াহ বাস্তবায়ন না করার বিরোধিতা করেন।
কিন্তু যখন সৌদি সরকারের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শরিয়াহ বাস্তবায়ন না করার কারনে তাদের বিরোধীতার ব্যাপারে শায়খদের অবস্থান আমার কাছে স্পষ্ট না।
বরং আমরা তাদেরকে দেখি তাদের সর্বশক্তি এই সরকারের সমর্থনে নিয়োজিত করতে। আমি নিজ খেয়াল-খুশিমতো তাদের উপর এই কথাগুলো আরোপ করছি না।
কারণ একদিন তাদের সাথে আমাকেও আমাদের রবের সামনে দাঁড়াতে হবে (এবং আমি সেদিন এজন্য কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকব) – বরং তাদের নিজেদের দেওয়া ফাতওয়া(দ্বীনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের মাসআলা) ও বক্তব্য থেকেই এটি প্রকাশিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, শায়খ বিন বাযের এই বক্তব্যের দিকে লক্ষ্য করুন-
“এবং এই সৌদি সরকার একটি বরকতময় সরকার এবং এর শাসকরা হক্ব ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়, মাজলুমের সহায়তায়, যালিমের প্রতিরোধে, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রসার ও প্রতিষ্ঠায়, এবং জনগণের সম্মান ও সম্পদ রক্ষায় সর্বদা আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে।”
আমি মনে করি সৌদি সরকারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি সম্যক অবগত আছেন। এবং আমরা আমাদের বই “আল-কাশিফ” বইতে ওইসব আলোচনা উপস্থাপন করেছি যা তার এই উপরোক্ত বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করে।
যারা সৌদি সরকারের প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত নন কিংবা দেখেও না দেখার ভান করে আছেন অথবা একে উপেক্ষা করছেন আমি তাদের সকলকে এ বইটি পড়ার পরামর্শ দেব।
আপনারা শায়খ বিন বাযের ঐ লেখাটিও দেখতে পারেন, যা তিনি স্থায়ী কমিটির (আল লাজনাহ) নেতৃত্বস্থানীয় ‘উলামাদের সাথে সই করেছেন যেটিতে মুজাহিদ ভাইদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল (আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন)।
তাদের উপর অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হল কাফির হত্যার কারনে এই মুসলিম ভাইদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। যদিও স্বাক্ষরকারীরা তা স্বীকার করে না।
এই ভাইয়েরা আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরুদ্ধে না বরং আমেরিকা ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষালম্বনে যুদ্ধ করছিলেন।
উক্ত বিবৃতিতে আপনি সৌদি সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন এবং জিহাদ ও মুজাহিদিনদের বিপক্ষে তাদের সুস্পষ্ট বিরুদ্ধাচরণ দেখতে পাবেন।
তাদের এরূপ অবস্থানের আরেকটি উদাহরন হল শায়খ বিন বাযসহ স্থায়ী কমিটির অন্যান্যদের লিখিত একটি বিবৃতি যেখানে জুহাইমানের (জুহাইমান আল-উতায়বি) লেখাগুলোর ব্যাপারে সাধারন মুসলিমদের সতর্ক করা হয়েছে।
অথচ এই সবগুলো লেখা জুহাইমানের অনুসারী কিছু তালিবুল ‘ইলম শায়খ বিন বাযকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। তার অনুমোদন ও সম্মতি লাভের জন্য। এবং শায়খ বিন বাযের অনুমোদন ও সম্মতির পরই কেবল এই লেখাগুলো প্রকাশ করা হয়।
বুদ্ধি ও বিবেচনা বোধসম্পন্ন যেকোন মানুষ এই লেখাগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে সেগুলোতে যা কিছু বলা হয়েছে তা সঠিক না ভুল তা যাচাই করে দেখতে পারেন। উল্লেখ্য, এর অর্থ এই না যে আমি তাদের (জুহাইমান ও তার অনুসারী, আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন) সব লেখাকে সমর্থন করি।
জুহাইমান ও তার অনুসারীরা নিজেরা সৌদি সরকার এবং এর সমর্থকদের মুরতাদ গণ্য করতেন না, এবং যারা এমন অবস্থান রাখতেন তাদের সাথে জুহাইমানদের মতপার্থক্য ছিল।
এ বিষয়টিতে আমি জুহাইমান ও তার অনুসারীদের সাথে দ্বিমত পোষণ করি এবং তাদের অবস্থানকে সঠিক ও সমর্থনযোগ্য বলে মনে করি না। কিন্তু স্থায়ী কমিটি ও শায়খ বিন বায তো তাদের বিবৃতিতে এই বিষয়টির ব্যাপারে সাধারন মানুষকে সতর্ক করছেন না।
স্থায়ী কমিটি ও শায়খ বিন বায জুহাইমান ও তার অনুসারীদের কোন বিষয়টির ব্যাপারে সতর্ক করছেন? তাদের নেতা ও শাসকের (সৌদি বাদশাহ) প্রতি তাদের বাইয়্যাতকে (আনুগত্যের অঙ্গীকার) জুহাইমান বাতিল ঘোষণা করেছিলেন।
জুহাইমান ও তার সমর্থকদের এই অবস্থানকে স্থায়ী কমিটি ভুল ব্যাখ্যাপ্রসূত ও অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। যারা জুহাইমান ও তার অনুসারীদের লেখা এবং সেসময়কার ঘটনাপ্রবাহের সময় উপস্থিত ছিলেন তারা সকলেই এ বিষয়ে ভালোভাবে অবগত আছেন।
স্থায়ী কমিটি তাদের বিবৃতিতে বলেছিলঃ
“কমিটির বিবেচনায় এটি একটি অন্যায়ে লিপ্ত সংগঠন। এর লেখাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বানোয়াট ও উস্কানিমূলক; যা বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার বীজ বপন করে এবং এর ফলে সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা, এবং দেশ ও সম্পদ ক্ষতি ও হুমকির মুখে।
মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে এটি সরলপ্রাণ জনগণকে বোকা বানাচ্ছে যাতে, তারা এর অন্তর্নিহিত হীন উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়।
এবং কমিটি এ ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে ও এর প্রতি তীব্র আপত্তি জানাচ্ছে, এবং মুসলিমদেরকে এধরণের উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বানোয়াট ও উস্কানিমূলক লেখা থেকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিচ্ছে।
পাশাপাশি, কমিটি মহান বাদশাহ খালিদ বিন ‘আব্দুল ‘আজিজ (আল্লাহ তাকে নিরাপত্তা দান করুন, তাকে সত্যের উপর বহাল রাখুন এবং তাকে সকল প্রকার কল্যাণ প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য করুন) ও তার সরকার কর্তৃক তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দরুণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছে যে, তিনি একে সম্ভবপর করেছেন এবং সেই সাথে আল্লাহর নিকট দু’আ করছেন, তিনি যেন আমাদের ও পৃথিবীর সকল দেশের মুসলিমদের সব ধরণের বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন, তাদের হক্বের ঝাণ্ডাতলে সমবেত করেন, তাদের শাসকদের সহায়তা করেন, ইসলামের মাধ্যমে তাদের শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করেন এবং তাদের মাধ্যমে ইসলামকে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করেন।
আমরা আল্লাহর নিকট আরো দু’আ করছি, তিনি যেন তাদেরকে উত্তম সাহায্যকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রদানের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করেন, যারা ভালো কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করবে, এর দিকে তাদের আহবান করবে ও স্মরণ করিয়ে দেবে।
আমরা চাইছি, তিনি যেন হক্বকে সমুন্নত করেন এবং মিথ্যা, অন্যায়, ঘৃণা, কপটতা ও বিদ্বেষকে দূরীভূত করেন, এমনকি যদিও তা অন্যায়কারীদের অপছন্দনীয়।
কমিটি সেনাবাহিনী, বুদ্ধি ও দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে এই রাষ্ট্রদ্রোহিতার মূলোৎপাটনে সরকারের মহান প্রচেষ্টার তারিফ করছে এবং এতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে, যারা প্রত্যক্ষভাবে কিংবা শ্রম ও লেখনীর মাধ্যমে সহায়তা করেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
এ তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছেন তাদের মহান বাদশাহ ও তার যুবরাজ, তার অনুগত প্রজা এবং সেনাবাহিনীর সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
আমরা আল্লাহর নিকট তাদের মৃতদের জন্য মাগফিরাত, রহমত ও মহাপুরস্কার কামনা করছি এবং তাদের জীবিতদেরকে আল্লাহ মহাপুরস্কার প্রদান করুন, পথপ্রদর্শন করুন এবং হক্বের উপর অবিচল রাখুন।
আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয়েছি। কেননা তিনিই সর্বোত্তম সাহায্যকারী। দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তার পরিবার এবং সাহাবাদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) উপর।”
কাজেই, সৌদি প্রশাসনের বিপক্ষে দণ্ডায়মান শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম বিন ‘আব্দুল লতিফ আলুশ-শায়খের অবস্থান এবং সুস্পষ্ট বিরোধিতা, যা তার সমগ্র ফাতওয়া ব্যাপী প্রকাশিত হয়েছে, এর সাথে সৌদি সরকারের প্রতি শায়খ বিন বাযদের সাহায্য সমর্থন, আনুগত্য প্রদর্শন এবং প্রশংসা জ্ঞাপনের এই অতিরঞ্জনের সাথে, আমি কোন মিল খুঁজে পাই না।
এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ “আল-কাশিফ” এ আমরা উল্লেখ করেছি। আর মনে রাখবেন যে, শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিমের সময় ‘আব্দুল ‘আজিজের দ্বারা কৃত কুফরের তুলনায় বর্তমানে তার বংশধরদের দ্বারা সংঘটিত দ্বীনবিরোধী কর্মকাণ্ড আরো ব্যাপক ও অতুলনীয় আকার ধারণ করেছে।
শায়খ বিন উসাইমীনের নিন্মোক্ত বক্তব্য ইনসাফ করার জন্য উল্লেখ করা হল। যেহেতু নীতিবান লোকেরা তাদের মতামতের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে উভয়দিকের যুক্তিই তুলে ধরে।
তিনি বলেনঃ
“এবং একথা প্রমাণিত যে, সৌদি রাজ্য শরিয়াহ প্রতিষ্ঠায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। আমরা বলছি না যে, এখানে শতভাগ শরিয়াহ দ্বারা শাসন করা হয়। এতে অবশ্যই অসংখ্য ত্রুটিবিচ্যুতি এবং কিছু অন্যায় রয়েছে, যদিও সুবিচারের তুলনায় অন্যায়ের পরিমাণ অতি নগণ্য।
এবং এটা মোটেও শোভনীয় নয় যে, আমরা কেবলমাত্র দোষত্রুটিগুলো দেখবো এবং ভালো দিকগুলো একেবারে এড়িয়ে যাব।
প্রত্যেকের উচিত ন্যায়পরায়ণ হওয়া, যেমনটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেনঃ
“হে মুমিনগণ ! আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাক। এমনকি যদি তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা, কিংবা তোমাদের আত্মীয়-স্বজনের ক্ষতির কারণ হয় তবুও।” (৪:১৩৫)
এবং তিনি বলেনঃ
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকবে। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ের প্রতি প্ররোচিত না করে। ন্যায় বিচার কর, এটা তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় কর।” (৫:৮)”
শায়খ বিন উসাইমীন এখানে সরকারের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এটি একটি দুর্লভ ঘটনা যা আমরা অস্বীকার বা এড়িয়ে যেতে পারি না। তারপরও, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিমের অবস্থানের সাথে এর বিরাট ব্যবধান রয়ে যায়।
কেননা শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নানা আঙ্গিকে মানব রচিত আইন প্রতিষ্ঠায় সরকারের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
অন্যদিকে শায়খ বিন উসাইমীনের বক্তব্যে বিষয়টিকে কিছু সাধারন ত্রুটিবিচ্যুতি, ভুল ও যুলুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যেন এবং একে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে তার পরে আগত মুসলিম শাসকদের ব্যাপারে যে ফিতনার কথা বলে গেছেন আজকের অবস্থা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি।
এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমতাবস্থায় আনসারদেরকে ধৈর্য্যাবলম্বনের আদেশ দিয়েছিলেন (আর তাই আমাদেরও ধৈর্য্যাবলম্বন করা উচিৎ)।
আর একারণেই শায়খ তার বিভিন্ন পুস্তক ও ফাতওয়াতে বর্তমান যুগের শাসকদের দ্বারা সংঘটিত যেকোন প্রকারের ফিতনায় জনগণকে ধৈর্য্য অবলম্বন করতে ও তাদের বিরুদ্ধাচরণ হতে বিরত থাকার আদেশ করেছেন।
এছাড়াও তিনি তাদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করা কিংবা তাদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের লক্ষ্যে সাধিত সর্বপ্রকার চেষ্টাকে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন এবং একে বিপদজনক আখ্যা দিয়েছেন।
চিঠির শেষ অংশে আপনি জানতে চেয়েছেন, “আর শায়খ বিন বাজ ও শায়খ বিন উসাইমীন (আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন) তারা কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে আলিমের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন?”
আমি এ ধরণের কোন অভিযোগ আরোপ করব না এবং কেউ যদি তাদের ‘ইলমের পরিধি (শাসকশ্রেণী সম্পর্কে তাদের মতামত এবং রাষ্ট্র ও নিজ দেশের শাসকশ্রেণীর প্রতি তাদের আনুগত্য ও বিরোধীদের প্রতি তাদের অবস্থান ব্যতীত) পর্যবেক্ষণ করেন, তবে তারা তাদেরকে শরিয়াহ’র ‘আলিম এবং সঠিক সালাফী ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাবেন।
বহু মানুষ তাদের ‘ইলম থেকে উপকৃত হয়েছেন (উপরে উল্লিখিত বিষয় বাদে) এবং আজকের বহু ‘আলিম তাদের কাছ থেকে ‘ইলম অর্জন করছেন এবং করেছেন, আমি নিজেও তাদের মাঝে একজন।
তবে তার অর্থ এই নয় যে, আমরা উপরের উল্লেখিত বিষয়ে তাদের ভ্রান্ত ধ্যানধারণার সাথে একমত পোষণ করব কিংবা তাদের এই ভ্রান্তিগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত হবে।
বরং, আমরা প্রত্যেক ভ্রান্ত অবস্থানকে তার তীব্রতা ও গুরুত্ব অনুসারে অস্বীকার ও বাতিল ঘোষণা করি।
যারা একে অত্যন্ত গর্হিত কাজ কিংবা বিপদজনক মনে করে এবং এই অজুহাতে আমাদের উপর ব্যক্তি আক্রমণ করে ও লোকদেরকে আমাদের লেখনী থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করে, কিংবা এর মাধ্যমে তাগুতকে ও তাগুতের অনুসারীদের সন্তুষ্ট করতে চায় তাদের কথা ও প্রচেষ্টাতে আমরা বিচলিত নই।
কেননা আমরা আমাদের রব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদল ও ইনসাফের উপর সন্তুষ্ট, নিশ্চয়ই তিনি আমাদের অন্তরে লুকায়িত গোপন বিষয়সমূহ সম্পর্কে সম্যক অবগত।
শীঘ্রই এক নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর আমরা সকলে আমাদের রবের সামনে সমবেত হব, আর সেদিন আমাদের মধ্যকার সমস্ত দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত অবসান ঘটবে।
দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তার পরিবার এবং সাহাবাদের রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উপর।