يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
‘তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন; আর যাকে প্রজ্ঞা প্রদান করা হলো, তাকে নিশ্চয়ই প্রভূত কল্যাণ দান করা হলো। বস্তুত কেবল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির অধিকারীগণই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।’ (বাকারা: ২৬৯)
‘আল-হিকমাহ’ শব্দটি ‘হাকিম’ (প্রজ্ঞাবান) হতে ব্যুৎপন্ন। অর্থাৎ এমন এক গুণ, যার বদৌলতে মানুষের কর্ম, বাক্য ও চিন্তা সঠিক লক্ষ্য এবং সুক্ষ্ম বিবেচনার অনুকূলে পরিচালিত হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "তুমি যদি প্রজ্ঞার সাথে হুকুমত করতে চাও, তবে তোমার চরম বিদ্বেষী শত্রুর ক্ষেত্রেও ধীরগতি অবলম্বন কর।" এখানে হুকুম করার অভিপ্রায় মূলত একজন ন্যায়পরায়ণ হাকিম বা প্রজ্ঞাবান শাসক হওয়ারই নামান্তর।
পারিভাষিক সংজ্ঞায় ‘হিকমাহ’ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত পরিলক্ষিত হয়। কারো মতে, হিকমাহ হলো নবুয়ত ব্যতিরেকেই সঠিক ও সত্য কথা বলা। কেউ বলেছেন, এটি সেই বিষয় যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু’আয় বর্ণিত হয়েছে: "হে আল্লাহ! আপনি তাকে হিকমাহ শিখিয়ে দিন।" অনেকের মতে তা হচ্ছে দ্বীনের গভীর ইলম কিংবা আল-কুরআনের জ্ঞান। কেউ একে ‘দ্বীনের ফিকহ’ বা আল্লাহর প্রতি সুনিবিড় ভয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। আবার কারো মতে, তা হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুধাবন করার যোগ্যতা। উল্লিখিত সকল অর্থই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে প্রস্ফুটিত হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন: "হিকমাহ হলো ইয়ামানি।" বিশেষত "ফিকহ ইয়ামানি" কথাটি প্রণিধানযোগ্য। এটি মূলত আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত, যা তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অর্পণ করেন, যেমনটি ইতিপূর্বে আয়াতে আলোচিত হয়েছে।
তবে হিকমাহ খোদাপ্রদত্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়; বরং এর নেপথ্যে কিছু অর্জিত মাধ্যম রয়েছে, যার জন্য বান্দাকে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে হয়। যেন মহান মাবুদের করুণায় এর কিঞ্চিৎ অংশ লাভ করা সম্ভব হয়।
ইবনুল কাইয়্যিম রাহি. এর বর্ণনামতে হিকমাহর প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো: ‘ইলম, সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা’। পক্ষান্তরে অজ্ঞতা, অস্থিরতা ও তাড়াহুড়া করা প্রজ্ঞার পথে প্রধান অন্তরায়। সুতরাং যে ব্যক্তি অজ্ঞ, অস্থির ও ত্বরিত প্রবণ, তার মাঝে হিকমাহর লেশমাত্র নেই। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। ক্ষেত্রবিশেষে এই স্তম্ভগুলোর সাথে আরেকটি গুণ যুক্ত করা হয়, তা হলো—প্রসিদ্ধি বা সম্মানের আকাঙ্ক্ষা বর্জন করা।
কখনো অনেককে শয়তান এই প্রবঞ্চনা দেয় যে, সে এমন হিকমতের অধিকারী, যেমনটা অন্য কারো নেই এবং সে-ই তার সঠিক বিবেচনা দ্বারা যেকোনো সম্মানের স্থানে প্রকাশ লাভ করার উপযুক্ত। কখনো তার সামনে বিষয়টি এভাবে সুন্দর করে তোলা হয় যে, সে-ই তো মুসলিম উম্মাহর হিতকামনা, স্বার্থচিন্তা করা ও এ ধরনের কল্যাণের পথে আছে। ফলে সে নিজ জ্ঞান দ্বারা প্রবঞ্চিত হয়। এর কারণে ব্যর্থতা ও বঞ্চনা আসে। কারণ আমরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে জেনেছি, আত্মপ্রবঞ্চিত ব্যক্তির আল্লাহর তাওফিক লাভ হয় না। আর যে ব্যাপকভাবে প্রকাশ লাভ করা ও দুনিয়াবী সম্মান লাভ করা থেকে বেঁচে থাকতে আগ্রহী থাকে, তার সাথে আল্লাহর তাওফিক যুক্ত হয়। যদি সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে সক্ষম হয়ে থাকি, তবে বিষয়টি এমনই।
ইমাম শাফেঈ রাহি. যখন কোনো মাসআলায় কারো সাথে বিতর্ক করতে বাধ্য হতেন, তখন তিনি কামনা করতেন, যাতে প্রতিপক্ষ আল্লাহর তাওফিক ও সাহায্য প্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কথা সঠিক করে দেওয়া হয়। (হিলইয়াতুল আউলিয়া); তিনি বলতেন, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক, কিন্তু ভুলেরও সম্ভাবনা রাখে, আর অন্যদের সিদ্ধান্ত ভুল, কিন্তু সঠিক হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে।
আর এটা শুধু এই প্রয়োজনেই বলতেন, যা এখন স্পষ্ট করলাম। তবে আমার কথার এটা উদ্দেশ্য নয় যে, একজন লোক তার মত গোপন করবে। বিশেষত: যদি সে এমন নেতা হয়, যার বুদ্ধি-বিবেচনার কথা সকলের জানাশোনা। বরং তার জন্য, তিনি যে সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করেন না, সেটার অনুসরণ করা দূষণীয়। তাই মূল বিষয় হচ্ছে, প্রকাশ লাভ করাকে অপছন্দ করা এবং নিজের হিকমতের দ্বারা তুষ্ট না হওয়া। অন্যথায় হিকমতের গুণে গুণান্বিত হওয়া ও সে দাবি মতে কাজ করার জন্য তিনিই অধিক উপযুক্ত। যেহেতু তার জন্য হিকমাহ অনেক বেশি প্রয়োজন। এজন্যই তার জন্য তা অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা আবশ্যক কর্তব্য। যেন যে স্থানে হিকমাহ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে তার ওপর আল্লাহর তাওফিক ও সংশোধন অবতীর্ণ হয়।
যেমনভাবে ইবনুল কাইয়্যিম রাহি. হিকমাহ-এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
“হিকমাহ হচ্ছে, যা যেভাবে করা উচিত, তা সেভাবে সঠিক সময়ে করা। তার ওপর এটা ও কর্তব্য যে, তিনি প্রতিটি জিনিসকে তার সঠিক মাপে পরিমাপ করার জন্য নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুলবেন, দূরদৃষ্টি ও উদার হৃদয়ের অধিকারী হবেন।”
আর সবগুলিই নিজ উম্মাহ ও মায়াময়দের কল্যাণে নিয়োজিত করবেন। তাদের শান্তির জন্য নিজের জীবন ও সময় ব্যয় করবেন। তাঁর একমাত্র চিন্তাই থাকবে উম্মাহ। ফলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে উক্ত হিকমাহ দান করবেন।
বর্ণিত আছে, আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আ.) বলেছেন: “হিকমাহ হচ্ছে প্রত্যেকের অন্তরের নূর।” হ্যাঁ, এটি একটি নূর, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদের অন্তরকে আলোকিত করেন। যাদেরকে তিনি নির্বাচিত করেন এবং সরল পথের দিকনির্দেশনা দেন। সেই সরল পথ, যা এমন জান্নাতে নিয়ে যায়, যার ব্যাপ্তি আসমান ও যমীন। যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। হিকমাহর মাহাত্ম্য ও গুরুত্বের কারণে আল্লাহ তাঁর কিতাবে হিকমাহর কথা ২০ বার উল্লেখ করেছেন। হিকমাহর মাধ্যমে নেতা তার জনগণকে অজ্ঞতা ও বর্বরতার অন্ধকার থেকে ভালোবাসা, সভ্যতা ও ইলমের নূরের দিকে নিয়ে আসেন। আর তিনি কুরআন-সুন্নাহকে স্বীয় দাওয়াতের নীতি নির্ধারক বানান। যেমনটা আল্লাহ তাঁর নিম্নোক্ত আয়াতে বলেছেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ ۖ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
‘তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনো বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সাথে বিতর্ক করবে উৎকৃষ্ট পন্থায়। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যারা তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন আর তিনি তাদের সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞাত, যারা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত।’ (নাহল: ১২৫)
এখন আমি মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলকে হত্যা না করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যে হিকমাহ ছিল, তা নিয়ে আলোচনা করবো। বিভিন্ন ঘটনায় সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কত কষ্ট দিয়েছে! যা স্ব-স্ব স্থানে জ্ঞাতব্য। তার মধ্যে একটি ঘটনা হলো, যা ইমাম বুখারি রাহি. জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন:
তিনি বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম। তাঁর সঙ্গে কিছু মুহাজিরও আসল এবং তাদের সংখ্যা বেশি হয়ে গেল। মুহাজিরদের সাথে হাসি-তামাশাকারি এক ব্যক্তি ছিল। সে জনৈক আনসারীকে আঘাত করল। ফলে আনসারীটি ভীষণ রেগে গেল। অবশেষে উভয়ই নিজেদের লোকজনকে ডাকতে লাগল। আনসারি ডাক দিল, হে আনসারগণ! মুহাজির ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে এসে বললেন: ব্যাপার কি, জাহিলিয়াতের ডাক শুনতে পাচ্ছি? অতঃপর বললেন, তাদের কি হয়েছে? তখন তাকে মুহাজির কর্তৃক আনসারীকে আঘাত করার কথা জানানো হলো। বর্ণনাকারী বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা এগুলো (সাম্প্রদায়িক ডাক) পরিহার কর, কারণ এগুলো নিকৃষ্ট বিষয়। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলল: তারা কি আমাদের বিরুদ্ধে পরস্পরে তাদেরকে ডেকেছে? আমরা মদীনা ফিরে গেলে, অচিরেই সেখানকার সম্মানীতরা নিচুদেরকে বের করে দিবে। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি রাহি.)
এই অভিশপ্তের এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল মুহাজির ও তাদের ভাই আনসারদের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা এবং তাদের মাঝে ফিতনা ও বিভেদ ছড়িয়ে দেওয়া। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তাঁর এ কথা পৌঁছাল, তখন উমর (রা.) তাঁর নিকট ছিলেন। উমর (রা.) বললেন: হে আল্লাহ’র রাসূল! এই মুনাফিককে কি হত্যা করে ফেলব না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পাছে লোকে একথা বলে যে, সে তার সাথীদেরকে হত্যা করত। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি রাহি.)
আরেকটি বর্ণনায় আছে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তখন কি হবে উমর, যখন লোকে বলবে, মুহাম্মদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে? তাই এটা করো না; বরং যাত্রার ঘোষণা দাও। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু তাকে হত্যা ত্যাগ করেই ক্ষান্ত হননি। বরং তার প্রতি কোমল আচরণও করেছেন এবং তাকে উত্তম সাহচর্য দান করেছেন। বিষয়টি স্পষ্ট হয় এ ঘটনা দ্বারা, যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তাঁর পিতাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: বরং সে যতদিন আমাদের মাঝে থাকে, ততদিন আমরা তার সাথে কোমল আচরণ করব এবং উত্তম সাহচর্য দান করব। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তা হচ্ছে, ইবনে উবাইয়ের ব্যাপারে যাদের জানা নেই, তাদের এই ধারণা হতে পারে যে, মুহাম্মদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে। আর এটা তাদেরকে ইসলাম থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেবে। আর তাঁর পক্ষ থেকে উমর (রা.) কে অসময়ে যাত্রার ঘোষণা দেওয়ার আদেশ, অতঃপর ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্রমাগত সফর করার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদেরকে কাজে ব্যস্ত করে ফিতনা থেকে ফিরানো। যে ফিতনা ইবনে উবাই মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ছড়িয়েছিল। আর এর উদ্দেশ্য ছিল মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করা। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্ত হিকমাহ পরে ফল দিয়েছিল। ফলে একসময় মুনাফিকদের ব্যাপারই শেষ হয়ে যায়। ইবনে উবাইয়ের বিষয়ও সকলের সামনে প্রকাশ হয়ে যায়। এমনকি এরপর যখনই সে কোনো নতুন কিছু ঘটাত, তখন তার কওমই তাকে ভর্ৎসনা করত, জবাবদিহি করত ও শাসন করত। যখন তাদের এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পৌঁছাল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর (রা.) কে বলেন: হে উমর! কেমন দেখছো? আল্লাহ’র শপথ! যে সময় তুমি তাকে হত্যা করতে বলেছো, তখন যদি আমি তাকে হত্যা করতাম, তাহলে তার জন্য অনেকেরই মন কেঁদে উঠত। কিন্তু এখন যদি ঐ সকল লোকদেরকেই তাকে হত্যা করতে আদেশ করি, তাহলে তারাই তাকে হত্যা করতে রাজি হবে। উমর (রা.) বলেন: আল্লাহ’র শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাজ আমার কাজ অপেক্ষা অধিক বরকতপূর্ণ। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
আরেকটি ঘটনায় হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জিররিনায় বনু হাওয়াযিনের গনিমতের মাল বণ্টন করলেন, তখন বনু তামীমের এক ব্যক্তি বলল, হে মুহাম্মদ! ইনসাফ কর! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: হে হতভাগা! আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে কে ইনসাফ করবে? আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে তো আমি ব্যর্থ ও ধ্বংস! তখন উমর (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উঠে এই মুনাফিককে হত্যা করে ফেলব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর পানাহ! অন্যান্য জাতি শুনতে পাবে যে, মুহাম্মদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: এই ব্যক্তি ও তার কতিপয় সাথী এমন যে, তারা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে না। (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ রাহি.)
মোট কথা মুনাফিককে হত্যা করা বা তার ওপর হদ প্রয়োগ করা কয়েকটি কারণে নিষিদ্ধ, যা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহি. সংক্ষেপে বলেছেন এভাবে: ১. তার হদ বা হত্যার বিষয়টি এমন শারঈ প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত না হওয়া, যা বিশেষ-সাধারণ সবাই বোঝে। ২. বা তার ওপর তা কায়েম করতে গেলে সাধারণ লোকজন ইসলামে প্রবেশ করার ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠবে বা অনেকে মুরতাদ হয়ে যাবে বা কোনো কওম এমন যুদ্ধ বা ফিতনা সৃষ্টি করবে, যা মুনাফিককে হত্যা না করার ফাসাদ থেকে আরও বেশি। যার ফলে তার ওপর হদ কায়েম করা সম্ভব হয় না।
অতঃপর শায়খ ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: উপরোক্ত দু’টি কারণ এখনো জ্ঞাতব্য। তবে একটি কারণ এখন নেই, তা হলো: কখনো এই আশঙ্কা করা হয় যে, মানুষ ধারণা করবে, সে তার সাথীদেরকে অপরাপর রাজা-বাদশাহদের মত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যা করে। এটা বর্তমানে নেই। তবে বর্তমান কালের অনেক অজ্ঞরা যা করে, তা নয়…লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ… তারা এমন এমন অজুহাতে সাধারণ মুসলমানদেরকে মুনাফিক ও কাফির সাব্যস্ত করে, যার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। ফলে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এমনকি মুসলমানদেরকেও দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারে অনাগ্রহী করে তোলে। তারা কি তাদের নবীর অনুসরণ করতে পারে না? ইবনে উবাইকে হত্যা না করার ক্ষেত্রে তিনি যে হিকমত অবলম্বন করেছিলেন তারা কি তা চিন্তা করে না? অথচ তার কপটতা সাধারণ মুসলমানদের মাঝে প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল! তারা কি জানে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ অমুসলিমরা-বিশেষত: যারা দারুল ইসলামের বাইরে, তারা-ফিতনা ও মুনাফিক সম্পর্কে কিছু না জানবে এবং যেকোনো ইসলামের নামধারীকেই প্রকৃত মুসলিম বলে মনে করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুনাফিককেও হত্যা করা উচিত নয়, যদিও তার ফিতনা মুসলিমদের জানা শোনা থাকে, যতক্ষণ না উক্ত ফিতনা সকল মানুষের সামনে প্রকাশ্য ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অতএব যদি এমন ব্যক্তি স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতিরক্ষায় থাকে, আর তার ফিতনা তাদের মাঝে বা অন্যান্য মুসলমানদের মাঝে পরিচিত নয়, তাহলে তার ব্যাপারে সবর করতে হবে, যতক্ষণ না তার বিষয়টি তার নিজের থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়ে অথবা তার সম্প্রদায়ের মাঝে ও সকল মানুষের মাঝে তার ফিতনা প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর তখনই কেবল নবীর ধর্মের ব্যাপারে ঐ সকল সংশয়গুলো সৃষ্টি হবে না, যা সাধারণত: মানুষের মনে এসে থাকে এবং অন্তর ও বিবেক তাতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। বিষয়টি সহজ নয়, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের থেকে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। তাদের সাথে হিকমতের সাথে কাজ করেছেন, যেমনটা বর্ণনা করেছি। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ শত্রুকে এবং কাফিরদের নেতাদেরকে এমন সুযোগ দিয়েছেন যে, তারা ঈমানদারদের নেতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু তুমি যাদেরকে আহ্বান করছ, তারা তো প্রাণহীন! কারণ এরা তো মুনাফিকদেরও নয়; মুসলমানদেরকে হত্যা করছে! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!! তবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ ভিন্নটা চেয়েছেন তারা ব্যতীত।
মুসলমানদেরকে উন্নত চরিত্রের দিকে আহ্বান করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হিকমত পন্থা ছিল, যা ইমাম আহমাদ (রাহি.) তার মুসনাদে আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন: একজন যুবক রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট আসার পর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে যিনার অনুমতি দিন! তখন সবাই তার দিকে তাকাল। তাকে ধমকাল। তারা বলল, আশ্চর্য! আশ্চর্য! রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: কাছে এসো। লোকটি কাছে এসে বসল। তারপরে তিনি তাকে বললেন, তুমি কি তোমার মায়ের ব্যাপারে এটা পছন্দ কর? সে বলল: আল্লাহর শপথ! না, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! সে আরও বলল: কোনো মানুষই তো তার মায়ের ব্যাপারে এটা পছন্দ করে না। রাসূল (সা.) বললেন: তাহলে তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল, আল্লাহর শপথ! না, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! সে আরও বলল, কোনো মানুষই তো তার মেয়ের জন্য এমনটা পছন্দ করে না। রাসূল (সা.) বললেন: তাহলে তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল: না হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! সে আরও বলল, কোনো মানুষই তো তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করে না। রাসূল (সা.) বললেন: তাহলে কি তুমি তোমার ফুফুর জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল, আল্লাহর শপথ! না, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! তিনি বললেন, তাহলে কি তুমি তোমার খালার জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল: না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! সে আরও বলল, কোনো মানুষই তো তার খালার জন্য এটা পছন্দ করে না। বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন: অতঃপর রাসূল (সা.) তার ওপর তার হাত রেখে বললেন: হে আল্লাহ! তার গুনাহ ক্ষমা কর! তার অন্তর পবিত্র করে দাও! তার লজ্জাস্থান হিফাযত কর! তারপরে থেকে এ যুবক আর কোনো দিকে তাকাতো না। (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ ও তাবারানি)
আরেকটি হাদিসে, ইমাম মুসলিম মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামি থেকে বর্ণনা করেন: আমি রাসূল (সা.) এর সাথে নামায পড়ছিলাম। ইত্যবসরে লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি তার উত্তরে বললাম: ইয়ারহামুকাল্লাহ! তখন লোকজন আমার প্রতি তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আমি বললাম: ধ্বংস তাদের! তোমাদের কি হয়েছে, আমার দিকে দেখছো! তখন তারা তাদের হাত রানে মারতে লাগল। আমি যখন দেখলাম, তারা আমাকে চুপ করতে বলছে, তখন আমি চুপ করলাম। অতঃপর যখন রাসূল (সা.) নামায শেষ করলেন: আমার পিতা-মাতা তার জন্য উৎসর্গ! আমি তার পূর্বে বা পরে তার থেকে উত্তম শিক্ষক কখনো দেখিনি। তিনি আমাকে ধমকিও দিলেন না, মারলেনও না, ভর্ৎসনাও করলেন না। তিনি বললেন: এ হলো নামায, এর মধ্যে মানুষের কথার মত কথাবার্তা বলা যায় না। এতে শুধু তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন পাঠ করতে হয়। তাঁর হিকমতের আরেকটি চিত্র হলো, হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ের ঘটনা। দাওয়াতের নতুন একটি পর্যায়ের ভিত্তি স্থাপন করতে, দলে দলে মানুষের ইসলামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে, বহু দেশ বিজয় করতে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে বান্দাদের রবের ইবাদতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এর যে বিরাট ফলাফল ছিল তা-ও এর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের নেতারা কবে তাদের নবী (সা.) এর হিকমত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে? তারা কবে তাঁর আদর্শের ওপর চলবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
‘বস্তুত রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।’ (আহযাব: ২১)
আল্লাহর কসম! আমি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনবোধ করছি এমন একজন নেতার, যার চিন্তা-চেতনায় মৌলিকভাবে এ গুণগুলো বিদ্যমান থাকবে। আমাদের কত বড় হঠকারিতা ও দুঃসাহসিকতা যে, আমরা এমন কাজে লিপ্ত হই, যা আল্লাহর দ্বীনকে কলঙ্কিত করে! আমি জানি, তাদের মধ্যে অনেক এমন মুসলিম আছে, যারা নম্র অবস্থানকে দুর্বলতা ও শৈথিল্য মনে করে। অনেক সময় একনিষ্ঠ ও দ্বীনের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল লোকেরাই এমন হয়, যেমন ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবাগণ।
ইমাম বুখারী রাহি. বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় আলী (রা.) কে দিয়ে লিখাচ্ছিলেন এবং তাকে বললেন, লিখ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, তখন সুহাইল বলল, রহমান কে! তাকে তো আমরা চিনি না। বরং এভাবে লিখ: বিসমিকা আল্লাহুম্মা। তখন মুসলিমরা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা কিছুতেই বিসমিল্লাহ ছাড়া লিখবো না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: লিখ, বিসমিকা আল্লাহুম্মা। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: লিখ, ‘নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সন্ধি করছে’। তখন সুহাইল বলল: আল্লাহর কসম! আমরা যদি বিশ্বাস করতাম, তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে তো আমরা তোমাকে বায়তুল্লাহ হতে বাধাই দিতাম না, তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধই করতাম না। তাই লিখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল, যদিও তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কর। লিখ: মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ’।
কিন্তু এই হিকমতই আল্লাহর বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। আজকের আমাদের কত প্রয়োজন এমন একজন নেতার, যিনি এক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শের অনুসরণ করবেন। তার থাকবে বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি এবং সে দ্রুতপ্রবণ হবে না। কারণ যে সময় আসার পূর্বেই কোন কিছু লাভ করতে চায়, তাকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা হয়। নিশ্চয়ই মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়া কোন সহজ বিষয় নয়। এটা কোন সম্মান বা সম্পদের দ্বারা সম্ভব হয় না। বরং এমন প্রজ্ঞাবান লোকদের দ্বারা হয়, যারা নিজেদের কথা ও কাজের পরিণাম বোঝেন। তারা জানবেন, কখন সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
যেমন আবু বকর (রা.) এর হিকমত ফুটে উঠেছিল, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবু বকর (রা.) বের হলেন, তখন উমর (রা.) লোকদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। আবু বকর (রা.) বললেন: বসুন, তিনি বসলেন না। তখন আবু বকর (রা.) শাহাদাত পাঠ করলেন। ফলে সমস্ত মানুষ তার দিকে ঝুঁকে পড়লো। আর উমরকে পরিত্যাগ করল। তারপরে তিনি বললেন: আম্মা বাদ, তোমাদের মধ্যে যে মুহাম্মাদ এর ইবাদত করত, তার মুহাম্মাদ তো মারা গেছে। আর যে আল্লাহর ইবাদত করত, তার আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মরেন না। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلاَّ رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مََّ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللّهَ شَيْئاً وَسَيَجْزِي اللّهُ الشَّاكِرِينَ
‘আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন রাসূল বৈ তো নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। তাঁর যদি মৃত্যু হয়ে যায় কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলা হয়, তবে কি তোমরা উল্টো দিকে ফিরে যাবে? যে-কেউ উল্টো দিকে ফিরে যাবে, সে কখনো আল্লাহর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কার দান করবেন।’ (আল ইমরান: ১৪৪)
আল্লাহর কসম! তাদের অবস্থা এমন হলো, যেন আবু বকরের তিলাওয়াতের পূর্বে তারা জানতই না যে, আল্লাহ তায়ালা এটা নাযিল করেছিলেন। তখন সমস্ত মানুষ তার থেকে এটা লুফে নিল এবং প্রত্যেককেই এটা তিলাওয়াত করতে শোনা গেল। নিশ্চয়ই এই কঠিন পরিস্থিতি, যা ইসলামী রাষ্ট্রের ভীত কাঁপিয়ে তুলেছিল এবং আদম (আ.) এর সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের উপর আপতিত বিপদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল, এ সময় মুসলমানদের হাল ধরার এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আবু বকর (রা.) এর অবলম্বনকৃত হিকমতই ছিল সর্বাধিক কার্যকর। ইসলামি রাষ্ট্রকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এবং ইসলাম বর্তমান যামানায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
প্রজ্ঞাবান নেতা সে-ই, যে মূখ্য সময়ে উম্মাহর জন্য বের হয়ে তার প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব প্রকাশ করে। যে নেতৃত্ব সাহায্য করবে সমাজের সমস্যাবলি সমাধানে, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করণে, সকলকে এক সূত্রে আবদ্ধ করণে এবং সেই শত্রুদের মোকাবেলায় মুসলমানদের কাতারসমূহ সুদৃঢ় করণে, যারা সর্বদা মুসলিমদেরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, এবং মুসলিমদের থেকে ও মুসলিমদের একমাত্র রক্ষাকবচ দ্বীনে ইসলাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রজ্ঞাময় অবস্থান ও আদর্শ রাজনীতির উদাহরণ হচ্ছে, তিনি মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কষ্ট সহ্য করেছেন, তবু তাকে হত্যা করেননি। হযরত উমর (রা.) এর হিকমতের নমুনা হচ্ছে, তিনি তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে কঠিন ছিলেন। একারণে যখন তিনি মুসলমানদেরকে কোন কল্যাণ, সফলতা ও সংশোধনের বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করতে চাইতেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে তা আরম্ভ করতেন, তাদেরকে প্রথমে উপদেশ দিতেন এবং বিপরীত করলে প্রথমে তাদেরকে শাস্তির ধমকি শুনাতেন। যেমন- সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উমর (রা.) যখন মিম্বারে উঠতেন এবং মুসলমানদেরকে কোন বিষয়ে নিষেধ করতেন, তখন তিনি তার পরিবারবর্গকে জমা করে বলতেন, আমি মানুষকে এই এই বিষয় থেকে নিষেধ করেছি, আর মানুষ তোমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেমন পাখি গোশতের দিকে তাকিয়ে থাকে। আল্লাহর কসম! আমি যদি তোমাদের কাউকে এটা করতে দেখি, তাহলে দ্বিগুণ শাস্তি দেব।
এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হিকমতপূর্ণ অবস্থান। কেননা মানুষ নেতা ও শাসকদের প্রতি লক্ষ্য করে। তাদের নীতি, প্রজাদের পূর্বে নিজ পরিবারের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এবং তারা যার প্রতি আহ্বান করে, তার কার্যকর ও মৌখিক বাস্তবায়নের প্রতি লক্ষ্য করে। অনুরূপ স্বীয় পরিবার ও অধীনস্থদের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখে।