'আল-হাযম' বা 'দৃঢ়তা' এর আভিধানিক অর্থ, মানুষের নিজ বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মজবুতভাবে ধরা। 'আল-হাযম অর্থ বাঁধা, মজবুত করা' থেকে এর উৎপত্তি। যেমন বলা হয়: حاز رجل 'দৃঢ় প্রত্যয়ী লোক', যখন লোকটি স্বীয় মতামত ও সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তা থেকে মচকে যায় না। তার আরেকটি অর্থ হল কোন কাজের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আবার 'কুধারণা' বলেও একে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এ সকল অর্থগুলোর মাঝে যোগসূত্র স্পষ্ট। যেহেতু দৃঢ়প্রত্যয়ী লোক সতর্ক ও বিচক্ষণ বলেই প্রসিদ্ধ। ফলে তাকে আপনি এতটা সাদামাটা পাবেন না যে, মন্দাচারীদের ব্যাপারের সর্বদা সাফাই গাইতে থাকবে। বরং সে থাকবে সতর্ক ও জাগ্রত, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কুধারণাও করতে জানে। যাকে প্রতিহত করতে হবে, উপযুক্ত সময়ে তাকে প্রতিহত করতে প্রস্তুত ও সামর্থ্যবান থাকে। অতঃপর তাদের মন্দের মাত্রা অনুযায়ী তাদের উপর কঠোরও হতে পারে। এভাবে সে সর্বদা নিজ বিষয়াদির উপর নিয়ন্ত্রণকারী ও সামর্থবান থাকে।
তার পারিভাষিক অর্থ হল: অপরাধীদের উপর কঠোরতা করার ক্ষেত্রে দৃঢ় হওয়া, তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না করা, তাদের সাফাই না গাওয়া এবং তাদের প্রতি ভুল ধারণা পোষণ না করা। আর তার সীমা হচ্ছে: বন্ধু-শত্রু চিনতে পারা এবং ভুলে অপরাধকারী ও ইচ্ছাকৃত অপরাধে নিমজ্জিতদেরকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারা। একজন নেতার জন্য প্রত্যাশিত গুণগুলোর মধ্যে অন্যতম হল দৃঢ়তার গুণ। এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয়, প্রকৃতগতভাবেই বোঝা যায়। কেননা নেতার জন্য অপাত্রে সব সময় নম্রতা অবলম্বন করা দূষণীয়। তবে এখানে বুঝতে হবে, কাঙ্ক্ষিত দৃঢ়তা হল, উপযুক্ত ক্ষেত্রে দৃঢ় হওয়া। এমনিভাবে কাঙ্ক্ষিত নম্রতাও সেরূপ। কিন্তু দু'টি দল এতে বিভ্রান্ত হয়েছে। একদল শৈথিল্য করেছে। আরেক দল অতি বাড়াবাড়ি করেছে। আর প্রত্যাশিত পন্থা হল মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহর দলিলের উপর আমল করা।
নেতার দৃঢ়তায় মুসলিমদের জন্য বহুবিধ উপকার রয়েছে। শাসকের মাঝে যদি এই গুণের অনুপস্থিতি থাকে, তাহলে তা মুসলিমদের জন্য ধ্বংসাত্মক। আর তিনি যদি উল্লেখিত মহান বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হন, তাহলে তার প্রমাণ হবে তখন, যখন তিনি তার সঠিক মতটিকে বিরোধীদের উপর কার্যকর করতে পারবেন। যদিও বিরোধিতাকারীরা তার নিকটবর্তী হয়, তার থেকে অধিক মর্যাদাবান হয় অথবা তাদের থেকে বিদ্রোহের আশংকা করা হয়। নেতার এরূপ হওয়ার কোন বিকল্প নেই। কারণ তিনি তো এমন হবেন যে, আল্লাহর ব্যাপারে কাউকে ভয় করবেন না, যেকোনো কিছুর উপর উম্মাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। আদর্শ নেতা তিনিই, যিনি প্রতিটি অবস্থায় হকের অনুসন্ধান করেন এবং নিজের ভুল প্রকাশিত হলে হকের দিকে ফিরে আসতে ও তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে কোন আপত্তি থাকে না। যদিওবা তা তার উপর কষ্টকর হয়, সবাই তার পাশ থেকে চলে যায়। তিনিই হলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী নেতা।
রাসূল (সা.) এর দৃঢ়তার একটি উদাহরণ হল কবি আবু ইজ্জার সাথে তার আচরণ। ইমাম মুসলিম রাহি. তার সহীহে বর্ণনা করেন: রাসূল (সা.) আবু ইজ্জাকে বদর যুদ্ধের সময় বন্দী করেন। তারপর তার প্রতি অনুগ্রহ করে তাকে ছেড়ে দেন এবং তার থেকে এই প্রতিশ্রুতি নেন যে, সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিবে না ও তাদের কুৎসা রটনা করবে না। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর সে আপন কওমের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়ে আবার মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে থাকে এবং তাদের কুৎসা রটাতে থাকে। অতঃপর উহুদ যুদ্ধে আবার তাকে বন্দী করা হল। তখন সে অনুগ্রহ করার আবেদন করল। রাসূল (সা.) বললেন: মুমিন এক গর্তে দু'বার দংশিত হয় না।
ইমাম মুসলিম রাহি. রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উপরোক্ত উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন:
"অর্থাৎ সে-ই হল প্রশংসিত মুমিন, দূরদর্শী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী মুমিন, যে এমন উদাসীন হয় না যে, অসচেতনতার কারণে একবারের পর দ্বিতীয় বার ধোঁকা খাবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মুমিন সতর্ক হওয়ার জন্য একবার ধোঁকা খেতে হবে, বরং তাকে অবশ্যই মন্দাচারীদের গতিবিধি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে, তাদের গতিবিধি মন্দ পরিলক্ষিত হলে তাদের ব্যাপারে অনমনীয় হতে হবে। তথাপি যদি একবার ভুল করে ফেলে, তাহলে দ্বিতীয় বার আর অপাত্রে সুধারণা পোষণ করবে না। ফলে একই ব্যক্তি দ্বারা দু'বার প্রতারিত হবে না।"
অনুরূপ, তার আরেকটি দৃষ্টান্ত হল, বনু কুরাইজার ইহুদীদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অনমনীয় আচরণ। ইমাম বুখারী রাহি. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: বনু কুরাইজা সা'দ ইবনে মুআযের ফয়সালার ব্যাপারে সম্মত হল। রাসূলুল্লাহ (সা.) সা'দের নিকট লোক পাঠালেন। সা'দ (রা.) একটি গাধার পিঠে চড়ে আসছিলেন। তিনি মসজিদের নিকটবর্তী হলে রাসূল (সা.) আনসারদের উদ্দেশ্যে বললেন: তোমাদের নেতার (বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির) দিকে এগিয়ে যাও।
অতঃপর তিনি সা’দকে বললেন: এরা তোমার ফয়সালার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। তিনি বললেন: তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে এবং নারী শিশুদেরকে বন্দী করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘তুমি তো আল্লাহর উদ্দিষ্ট ফয়সালা করলে’ বা এরূপ বলেছেন: ‘মালিকের উদ্দিষ্ট ফয়সালাই করলে। আল্লাহর কিতাবে দৃঢ় অবস্থানের একটি উদাহরণ হল: মূসা (আ.) এর কওম ও সামেরীর সাথে মূসা (আ.) এর ঘটনাটি। মূসা (আ.) যখন তুর পর্বতে আল্লাহর সঙ্গে নির্জন আলাপের পর আল্লাহর বাণী সম্বলিত কাষ্ঠ খণ্ড নিয়ে ফিরলেন। আর ইতিমধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানতে পারলেন যে, তার কওম গো-বৎসের ইবাদত শুরু করেছে, তখন তিনি ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখার পর নিজ ভাইয়ের নিকট গেলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, তার ভাই অন্যায়ে বাধা দিতে শৈথিল্য করেছে এবং সে- সামেরী ও তার কওমের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেনি। কারণ তিনি তার প্রভুর নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করার জন্য যাওয়ার সময় তার ভাই হারুনকে তার কওমের উপর তার স্থলাভিষিক্ত করে গিয়েছিলেন। যেমনটা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ َبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً وَقَالَ مُوسَى لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِينَ
‘আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (যে, এ রাতসমূহে তুমি তুর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপরে আরো দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ রাত হয়ে গেলে এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না।’ (আরাফ: ১৪২)
তিনি যখন ফিরে দেখলেন, তার কওম কি সব আবিষ্কার করেছে, তখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত হলেন, যেহেতু তার ধারণা ছিল, সে অন্যায়ে বাধা দিতে শৈথিল্য করেছে। আর কেউ কেউ বলেছেন তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, তার পক্ষ থেকে শুধু মৌখিক বাধা দিয়ে ক্ষান্ত থাকার কারণে, কার্যকরী বাধা দেওয়ার ব্যাপারে ত্রুটি করার কারণে। সম্ভবত প্রথম কথাটি অগ্রগণ্য। এর দলিল হল: তিনি তার ভাইয়ের নিকট এই ওযর পেশ করেছিলেন যে, তার কওমের কাছে সে অসহায় পড়েছিল এবং তারা তাকে হত্যা করার উপক্রম ছিল। অর্থাৎ তিনি তাদের এত কঠিন ভাবেই প্রতিবাদ করেছিলেন যে, তারা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। আর কেউ কেউ বলেন: তিনি কোমল ছিলেন অর্থাৎ কঠোর সংকল্প, দৃঢ় ইচ্ছা ও আত্মপ্রত্যয়ের ক্ষেত্রে মূসার চেয়ে কম ছিলেন। একারণেই কওম তার কথা শোনেনি; বরং তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে।
এখান থেকে এই শিক্ষাটি অর্জন হয় যে, নেতার অবশ্যই অধীনস্তদের ব্যাপারে দৃঢ় হতে হবে। তবে ন্যায়ানুগ দৃঢ়তা। যে দৃঢ়তা উপযুক্ত স্থানে হয়। অনুরূপ এখানে ফিতনার হোতা সামেরীর সাথে তার দৃঢ়তা ও কঠোরতার চিত্রও কয়েক দিক থেকে ফুটে ওঠে: প্রথমত: তার ক্রোধ ও কঠিন ভাষা। কারণ তিনি ‘মা খাতবুক’ বলে তার কাজের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। যেহেতু ‘খাতব’ শব্দটির অর্থ হল ভয়াবহ বা গুরুতর বিষয়। সামেরী তার জবাবে বলেছিল, যা কুরআন বর্ণনা করেছে:
قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضْتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَذْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي
‘সে বলল, আমি এমন একটি জিনিস দেখেছিলাম, যা অন্যদের নজরে পড়েনি। তাই আমি রাসূলের পদচিহ্ন থেকে এক মুঠো তুলে নিয়েছিলাম। সেটা আমি (বাছুরের মুখে) ফেলে দেই। আমার মন আমাকে এমন কিছু বুঝিয়েছিল।’
অর্থাৎ আমার প্রভুর নির্দেশেই নয় অথবা কোন বর্ণনামূলক বা যৌক্তিক প্রমাণের দ্বারাও নয়। সে যখন এরূপ কথা বলল: তখন দ্বিতীয় পদক্ষেপে নবি মূসা (আ.) তাকে পরিত্যাগ করার এবং কেউ তার সাথে কথাবার্তা না বলা এবং তার সাথে মেলামেশা না করার আদেশ জারি করলেন। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
فَاذْهَبْ فَإِنَّ لَكَ فِي الْحَيَاةِ أَنْ تَقُولَ لَا مِس
‘মূসা বলল, তুমি চলে যাও। জীবনভর তোমার কাজ হবে মানুষকে এ বলতে থাকা যে, আমাকে ছুঁয়ো না।’
এটাকেই বর্তমানে আমাদের যামানায় ‘নগর নির্বাসন’ বলা হয়। তৃতীয়ত: তারপরে তিনি তাকে কিয়ামতের কঠিন আযাবের ধমকি দেন فَإِنَّ لَكَ مَوْعِدًا لَنْ تُخْلَفَهُ ‘আর তোমার জন্য আছে একটি প্রতিশ্রুতি কাল, যা তোমার থেকে টলানো যাবে না।’
আর যেহেতু তার এই বিদআতের ক্ষতিটা শুধু তার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বনী ইসরাইলীদের মাঝেও ছড়িয়েছে, এজন্য তাদের সামনেই তার এই সংশয়টির মূলউৎপাটন করা জরুরি ছিল। আর তা তিনি এভাবে করেছেন: চতুর্থত: গো-বৎসকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে উড়িয়ে দেওয়া। তিনি তা এমনভাবে জ্বালিয়ে দিলেন যে, তার কোন আকৃতিই বাকি রাখলেন না, তাকে সমুদ্রে উড়িয়ে দিলেন, যাতে তার এমন কোন চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে, যার দ্বারা আবার তা সূচনা হতে পারে। মূসা (আ.) গুঁড়ো করে উড়িয়ে দেওয়ার কথাটি খুব জোর দিয়ে বলেছেন, বনী ইসরাইলের মন থেকে এর উপাস্য হওয়ার সংশয় সমূলে দূর করার জন্য।
এখানে মূসা (আ.) কল্পিত উপাস্যের ক্রোধের আশংকা করেননি। একারণেই তাকে গুঁড়ো করে উড়িয়ে দিতে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করেননি। তাদের অন্তরে যে সংশয় স্থান করে নিয়েছিল, তা উৎখাত করতে সম্ভবত এটাই ছিল সম্ভাব্য চূড়ান্ত কর্মপন্থা। আর প্রতিটি যুগেই সামেরীর মত বিদআতী ও অন্যান্য ভ্রান্ত লোকদের সাথে এমনটাই করা উচিত।
ইমাম কুরতুবী রাহি. বলেন: বিদআতী ও পাপিষ্ঠদেরকে নির্বাসন দেওয়া, পরিত্যাগ করা এবং তাদের সাথে মেলামেশা না করার ব্যাপারে এই আয়াতটিই দলিল। এটা হচ্ছে এমন বিদআতী যে, আপন বিদআতের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে।
কুরআন কারীম এই নীতিটি অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা পাঠককে এই দীক্ষা দেয় যে, এসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তারপরে ফিতনার শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে হবে অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে, যেন কোন অলসতা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না থাকে। এই বিষয়টিটিকে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে মূসা (আ.) এর কর্মপন্থা ছিল অটুট ও সুস্পষ্ট। এটাই দৃঢ়তার অর্থ, যার ব্যাপারে আমাদের আলোচনা।
খলিফায়ে রাশেদ আবু বকর (রা.) এর দৃঢ়তার উদাহরণ হল: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মৃত্যুর পর মুরতাদদের সাথে তার যুদ্ধ করা। বিভিন্ন রূপক মুরতাদদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। কেউ নবুওয়াত দাবি করেছে, কেউ যাকাত অস্বীকার করেছে, কেউ নামায বাতিল করে দিয়েছে। তখন এই নেতার পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল দৃঢ় পদক্ষেপ। পক্ষান্তরে হযরত উমর (রা.) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সংকোচবোধ করছিলেন। কারণ তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে। তাই আবু বকর (রা.) কে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) তো বলেছেন...
‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে আমি যেন লোকদের সাথে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারা একথার সাক্ষ্য দেয়: আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। যে তা বলল, সে আমার থেকে তার সম্পদ ও রক্ত নিরাপদ করে নিল। তবে আল্লাহর হকের কথা আলাদা। আর তার হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে।’ তাহলে আপনি কিভাবে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন? আবু বকর (রা.) বললেন: আল্লাহর শপথ! যে নামায ও যাকাতের মাঝে কোন পার্থক্য করে, আমি তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করবো। কারণ যাকাত হল সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ! তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যামানায় যে বকরির বাচ্চার যাকাত দিত, এখন যদি তাও দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আমি তা না দেওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)
মুরতাদদের সাথে আবু বকর (রা.) এর এই অনমনীয় আচরণের মধ্যে দ্বীন ও উম্মাহর অশেষ কল্যাণ নিহিত ছিল। তিনিই ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিগুলো দৃঢ় করেছিলেন, ইসলামি রাষ্ট্রকে সকল অভ্যন্তরীণ শত্রুদের থেকে ও যারা নিজ প্রবৃত্তিকেই উপাস্য বানাতে চেয়েছিল, তাদের থেকে মুক্ত করেছিলেন। আর একারণেই বহিঃশত্রুদের সাথে লড়াই করার জন্য তিনি অবসর হতে পেরেছিলেন। আমরা এই কর্মপন্থাগুলোর প্রতি তাকালে তাতে এমন হিকমাহ ও দৃঢ়তা দেখতে পাই, যা মুসলমানদের অনেক নেতার মাঝে পাওয়া যাওয়া দুষ্কর।
সুতরাং উমর (রা.) ও যারা তার সমচিন্তা পোষণ করত, তাদের সবাইকে থামিয়ে দেওয়ার মধ্যেই ছিল হিকমত। নিশ্চয়ই মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও প্রবৃত্তি পূজার সমাপ্তি ঘটানোর মধ্যে দিয়েই ছিল দৃঢ়তা। অন্যথায় হয়তো এটা রাষ্ট্রের ঐক্যকে চুরমার করে দিত, তার ভিত নড়বড়ে করে দিত। আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) এর দৃঢ়তার একটি উদাহরণ হল: তিনি ইসলামে প্রবেশ করার সর্বপ্রথম মুহূর্তেই যা করেছিলেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উমরকে জিজ্ঞাসা করলাম: আপনাকে কেন ‘ফারুক’ বলে নাম দেওয়া হয়েছে? তিনি বললেন: হামযা আমার তিন দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর আল্লাহ আমার অন্তরকেও ইসলামের জন্য প্রসারিত করে দেন। আমি বললাম: আল্লাহ ছাড়া কোন্ উপাস্য নেই, তার রয়েছে সুন্দর নামসমূহ। তখন আমার নিকট রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ব্যক্তিত্ব থেকে প্রিয় ব্যক্তিত্ব আর কেউ রইল না। আমি বললাম: আল্লাহর রাসূল কোথায়? আমার বোন বলল: তিনি সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী আরকাম ইবনে আরকামের বাড়িতে আছেন। আমি উক্ত বাড়িতে আসলাম। হামযা তার সঙ্গীদের সাথে উক্ত বাড়িতে বসা ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে ছিলেন। আমি দরজায় আঘাত করলে সকলে জমা হয়ে গেল। হামযা সকলকে বলল: তোমাদের কি হয়েছে? সকলে বলল: উমর এসেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কাপড়ের গুচ্ছ ধরে তাকে ঝাড়া দিলেন। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হাঁটুর উপরে পড়ে গেলেন। তারপর রাসূল (সা.) বললেন: হে উমর! তুমি কি বিরত হবে না? তিনি বললেন: তখন আমি বললাম: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তিনি একক, তার সাথে কোন শরীক নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসূল। তিনি বললেন: তখন পুরো বাড়ি তাকবীর ধ্বনিতে কেঁপে উঠল, যা মসজিদের অবস্থিত লোকেরাও শুনতে পেল। তিনি বললেন: তখন আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি জীবনে-মরণে সত্যের উপর নই? রাসূল (সা.) বললেন: নিশ্চয়ই, সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ। নিশ্চয়ই তোমরা জীবনে-মরণে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছো। তিনি বললেন, তখন আমি বললাম- তাহলে কেন আমরা লুকিয়ে থাকব? সেই আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরিত করেছেন, আপনি অবশ্যই বের হবেন।
অতঃপর আমরা তাকে দু'টি দলে সারিবদ্ধভাবে বের করলাম। এক সারিতে হামযা আর অপর সারিতে আমি। আমাদের পদচারণায় সেখানে পেষণের ঘোড়ার ন্যায় ধূলি উড়ছিল। অবশেষে আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন- তখন কুরাইশরা আমার দিকে ও হামযার দিকে তাকালো। ফলে তারা এতটা লজ্জা পেল, যা ইতিপূর্বে কখনো তারা পায়নি। তখন সেদিনই রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে নাম দিলেন ‘ফারুক’ বলে। আল্লাহ তা’আলা হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করে দিলেন। (হিলইয়াতুল আউলিয়া - আসবাহানী)
তাই উম্মাহর আজ কত প্রয়োজন এমন একজন লোকের, যে শত্রুর মুখোমুখি এরূপ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে, প্রকাশ্যে হকের দাওয়াত দিবে, উম্মাহর নেতৃত্বেরই বিকাশ ঘটাবে এবং উম্মাহর দ্বীন, রক্ত ও সম্মান, যা পৃথিবীর দিকে দিকে পদদলিত হচ্ছে, তার পক্ষে প্রতিরোধ করবে। বিশেষ করে বর্তমানে যখন উম্মাহ নেতৃত্বের লাগামে আটক আছে, তখন আমাদের এমন একটি আদর্শ নেতৃত্বেরই বড়ই প্রয়োজন, যিনি আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবেন, আমাদের কাতারসমূহ এক করবেন, শত্রুদের সাথে আমাদের অবস্থান দৃঢ় করবেন এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃরাজনীতিকে ঢেলে সাজাবেন।