আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ ١٥ وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ١٦
‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নানাভাবে কাফিরদের মুখোমুখি হও, তখন তাদের পিঠ প্রদর্শন করো না। যে ব্যক্তি সেদিন তাদের পিঠ প্রদর্শন করবে যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন অথবা নিজ দলে স্থান গ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রোধ নিয়ে ফিরবে এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর অতি মন্দ ঠিকানা।’ (আনফাল: ১৫, ১৬)
অন্য স্থানে বলেন:الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
‘যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। আর যারা কুফরি অবলম্বন করেছে, তারা যুদ্ধ করে তাগুতের পথে। সুতরাং হে মুসলিমগণ! তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। স্মরণ রেখ, শয়তানের কৌশল অতি দুর্বল।’ (সুরা নিসা, ৪: ৭৬)
قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
‘যারা আল্লাহকে ভয় করত, তাদের মধ্যে দু’জন লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন, বলল, তোমরা তাদের ওপর চড়াও হয়ে নগরের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর। তোমরা যখন তাতে প্রবেশ করবে, তখনই তোমরা বিজয়ী হবে। আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা রেখ, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।’ (সুরা মায়িদাহ: ২৩)
তবে এ সব হবে দুটি মূলনীতির অধীন। এক: তা হবে আল্লাহ তা‘আলার পথে। দুই: ইলমের সীমা দ্বারা তার সীমা নির্ধারিত থাকবে। এই দ্বিতীয় মূলনীতির প্রতি খুব গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। কারণ বর্তমানে অন্যায়ভাবে রক্তপাতের যে দুঃসাহসিকতা চলছে, যা কারো নিকটই অস্পষ্ট নয়, তা জিহাদ, মুজাহিদ ও খেলাফতে রাশেদার জন্য মেহনতকারীদেরও দুর্নাম করে ফেলেছে। ঐ সকল অজ্ঞরা তাদের জানা অজানা সব ভাবে ইসলামের দুর্নাম করেছে।
এখানে আরেকটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া প্রয়োজন: তা হচ্ছে বীরত্ব সব সময় শুধু কঠোরতার মধ্যে নয়, যা সর্বাগ্রে সবার চিন্তায় চলে আসে। তাই অন্যায়কারীকে ক্ষমা করে দেওয়াও একপ্রকার বীরত্ব, চাই উক্ত অন্যায়কারী অমুসলিম শত্রু হোক বা অন্য কেউ হোক- যদি তা উপযুক্ত ক্ষেত্রে হয়। বরং এতে আল্লাহ সঙ্গী হন এবং তাঁর সাহায্য ও সন্তোষ সাথে থাকে। আমরা এর একটি উদাহরণ গ্রহণ করি, জনৈক মুসলিম আমী্র কোনো এক যুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৈন্যদেরকে এমন একজন লোকটিকে বন্দি করার সুযোগ করে দিলেন, যার স্বীয় কওমের মাঝে উচ্চ অবস্থান ছিল। উক্ত শত্রুর বিষয়টি তাঁর পর্যন্ত অতিক্রম করল। তখন শত্রুটি আমীরের নিকট ক্ষমার আবেদন করতে লাগল এবং মুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য না করার প্রতিশ্রুতি দিল...।
এখন যদি আমাদের যামানার কোনো অজ্ঞ এরকম একটি অবস্থার কথা চিন্তা করে, তাহলে সে গাদ্দারি অজুহাতে ক্ষমা ও মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে করবে। আপনাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি: বলুন তো, আপনাদের দৃষ্টিতে কে অধিক বাহাদুরি ও দৃঢ়? নিশ্চয়ই সে ব্যক্তিই, যার বীরত্বের সাথে দয়াও মিশ্রিত আছে, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ও তিনি যেটিকে ভুলে যায় নি। সুতরাং তিনি মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করার সেই মূল লক্ষ্যকে ভুলে যাননি, যার কারণে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরবর্তী সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ এবং দ্বীনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ বুঝ ও ইলমের সাথে ছিলেন। হ্যা, শুধু একারণেই তিনি তার আবেদন গ্রহণ করেছিলেন আর সচরাচর যে গাদ্দারি আশঙ্কা মনে চলে আসে, সেটিকে দূর করেছিলেন। আর এটা শুধু আল্লাহর পথে বিনিময় প্রাপ্তির আশা, আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা এবং তাঁর সাহায্যের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। বরং এক্ষেত্রে যদি শত্রু প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করার নিয়তও করে, তথাপি আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, যদি তার মাঝে এসব বিষয়গুলো পাওয়া যায়, তথা পরিপূর্ণ দ্বীন বুঝে করে, এর দ্বারা শুধু আল্লাহর সন্তোষ কামনা করে এবং ইসলামকে সুন্দর আকৃতিতে ফুটিয়ে তোলে। তখন সে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারবে যে, আল্লাহই একমাত্র কর্তা, তিনিই সব পরিচালনা করেন, তিনিই সাহায্যকারী, তিনি শত্রুদেরকে দেখছেন এবং তাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন। তিনিই তাকে আদেশ করেছেন মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্ধারিত পথে চলতে, অতঃপর তাঁর ওপরই ভরসা করতে। তাই অবশ্যম্ভাবীরূপে তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَإِنْ يُرِيدُوا أَنْ يَخْدَعُوكَ فَإِنَّ حَسْبَكَ اللَّهُ هুوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ
‘তারা যদি তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তবে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তিশালী করেছেন নিজ সাহায্যে এবং মুমিনদের দ্বারা।’ (আনফাল: ৬২)
তাহলে আপনাদের দৃষ্টিতে কি এ ব্যক্তি বড় বীর, মহান, প্রিয় ও সম্মানযোগ্য? নাকি যে নেতা ধারণার ভিত্তিতে চলে? সতর্কতা ও সচেতনতার দোহাই দিয়ে মানুষদেরকে হত্যা করে? অথচ সে জানে না যে, ধারণার ভিত্তিতে বিধান কার্যকর করা যায় না। এত সতর্ক হলে সে কেন তার অন্তর ফেড়ে দেখে না যে, সে সত্য বলেছে, না গাদ্দারি নিয়ত করেছে? সে কি তার এই হত্যার দ্বারা দয়াবান রাসূল (সা.)-এর আদর্শের বিরোধিতা, ইসলামের রূপ বিকৃত করা এবং মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করা ছাড়া কোনো ফলাফল বয়ে আনতে পারবে? আল্লাহর কসম! আমি এটাকে তার ইমানের দুর্বলতা এবং তাওয়াক্কুল, বিশ্বাস ও আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ঘাটতি ছাড়া কিছুই মনে করি না।
এজন্যই প্রিয় ভাইয়েরা! আমি এ ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি যে, আপনারা এমন একজন নেতা মনোনীত করবেন, যিনি এসব গুণগুলোতে গুণান্বিত হবেন। যাতে আপনারা নিজেদের অজান্তেই আপনাদের দ্বীনকে ধ্বংস করে না ফেলেন। আমি আপনাদেরকে আরও বলছি যে, আপনাদের বন্ধুত্ব হবে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের জন্য; কোনো ব্যক্তি বা নামের জন্য নয়। আপনারা বিভিন্ন প্রতীক দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত এমন একজন নেতার আবির্ভাব না হয়, যার সততা ও সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে আপনারা সন্তুষ্ট থাকবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত সবর করুন। অতি উদ্দীপনা ও মুসলমানদের ওপর আপতিত বিপদের ঘনঘটা যেন আপনাদেরকে এমন কারো সাথে যুক্ত হতে প্ররোচিত না করে, যে দ্বীনের পতাকা উত্তোলণ করেছে, অথচ দ্বীন তার থেকে মুক্ত। আপনাদের দ্বীন বুঝুন। নিজেদেরকে ফিতনায় নিপতিত করবেন না। দ্বীনের সাহায্য করছেন, এই ধারণায় দ্বীনের ক্ষতি করবেন না। আর আমি নেতৃবৃন্দদের উদ্দেশ্যে বলব, আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন, আপনাদের আদর্শ হোক আল্লাহর রাসূল (সা.), যিনি কোমলতাকে ভালোবাসতেন। যেমন আমাদের মাতা আয়িশা (রা.) বলেছেন: যখনই রাসূল (সা.)-কে দুটি বিষয়ের একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হতো, তখন রাসূল (সা.) দুটির মধ্যে তুলনামূলক সহজটি গ্রহণ করতেন, যতক্ষণ না তা গুনাহ হতো। আর যদি গুনাহ হতো, তখন তিনি তাঁর থেকে সর্বাধিক দূরে থাকতেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ.)
আয়িশা (রা.) আরও বলেন, রাসূল (সা.) কখনো নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেননি। কোনো স্ত্রীকে-ই নয়; কোনো খাদিমকেও নয়। তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে এলে ভিন্ন কথা। কখনো তাকে কোনো কষ্ট দেওয়ার কারণে তিনি কষ্ট দানকারী থেকে তাঁর প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর কোনো বিধানের অমর্যাদা করা হলে তিনি মহান আল্লাহর জন্য তাঁর প্রতিশোধ নিতেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রাহি.)
সুতরাং আমাদের নবী (সা.) যেখানে বীরত্ব দেখানো উচিত, সেখানে কঠিন বীর ছিলেন আর যে স্থানে বীরত্ব দেখানো আবশ্যক নয়, সেখানে ছিলেন দয়াবান, কোমল ও বিনম্র। তাই শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং চিন্তা করুন। বীরত্বের সীমারেখার ব্যাপারে যা কিছু বলা আবশ্যক মনে হয়েছিল, তা আলোচনা করার পর এখন আমি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বীরত্বের একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করব, যে বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে বড় ও পূর্ণ অংশটুকু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাঝে বিদ্যমান ছিল। আর তা তো থাকবেই, কারণ তিনি হলেন আদম সন্তানের সর্দার।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে জিহাদে যখন যুদ্ধের আগুন অতি উত্তপ্ত হতো, তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে আত্মরক্ষা করতেন। তিনি শত্রুর সর্বাধিক নিকটবর্তী থাকতেন। দৃঢ়পদ থাকতেন। নিজ সাথীদেরকে দৃঢ়পদ রাখতেন এবং তাদের সাহস ও উদ্যমতা বাড়িয়ে তুলতেন। শত্রুর বিশালতা ও সংখ্যাধিক্য তাঁকে প্রভাবিত করত না। আর তিনি তাঁর সাহাবাদের মাঝেও এই গুণ সৃষ্টি করেন। রাসূল (সা.)-এর সকল বীরত্বের ঘটনাগুলো উল্লেখ করতে চাইলে কয়েক খণ্ড কিতাবের প্রয়োজন হবে, তাই আমি শুধু উপদেশ গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বীরত্বের ঘটনাবলি থেকে দুটি ঘটনা বর্ণনা করব।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: এক রাতে মদিনাবাসী ভীষণ ভয় পেল। সকল মানুষ একটি আওয়াজের দিকে ছুটল। কিন্তু তারা দেখতে পেল, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখান থেকে ফিরছেন। তিনি সবার আগেই আওয়াজের দিকে চলে গিয়েছিলেন। তিনি আবু তালহা ইবনে আরির ঘোড়ার ওপর আরোহণ ছিলেন আর তাঁর গর্দানে ছিল তরবারি। তিনি বলেছিলেন: কোনো ভয় নেই, কোনো ভয় নেই। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ.)
আবু ইসহাক বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি বারা’কে শুনেছি, জনৈক লোক তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আবু উমারা! তোমরা কি হুনায়নের যুদ্ধের দিন পলায়ন করেছিলে? তিনি বললেন: না, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা.) পলায়ন করেননি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কিছু যুবক ও কম বয়স্ক সাহাবী খালি হাতে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় বের হলো। তারা হাওয়াযিন ও বনু নাসর-এর একটি তীরন্দাজ বাহিনীর কাছে এসে পড়ল, যাদের প্রায় একটি তীর-ই লক্ষ্যভ্রষ্ট না হতো। ফলে তারা প্রায় অব্যর্থভাবে তাদের নিশানা বানাতে লাগল। তখন রাসূল (সা.) সেখানে এলেন, তিনি তাঁর সাদা খচ্চরে আরোহণ ছিলেন। তাঁর চাচাত ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব তা টেনে নিচ্ছিল। তারপরে তিনি নিচে নেমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করলেন এবং এই কবিতা আবৃত্তি করলেন: ‘আমি নবী; মিথ্যাবাদী নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।’ তারপরে তাঁর সাথীদেরকে কাতারবদ্ধ করলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)
এখানে সেই বীরের কথা ও আলোচনা করা আবশ্যক, যে বীর আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবী ও উম্মতের আলিমদের মাঝে রোপণ করেছেন। প্রথমে শুরু করছি রিবঈ ইবনে আমের (রা.)-কে দিয়ে।
রিবঈ ইবনে আমের (রা.)
সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) রিবঈ ইবনে আমের (রা.)-কে কাদিসিয়ায় পারস্য সৈন্যবাহিনীর সেনাপতি ও আমীর রুস্তমের নিকট দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি রুস্তমের দরবারে প্রবেশ করলেন। পারস্যরা তাঁর মজলিসকে স্বর্ণখচিত গদি ও রেশমের গালিচা দিয়ে সুসজ্জিত করল। দামি দামি মণি মুক্তা ও সাজ-সজ্জার প্রদর্শনী আয়োজন করল আর তাঁর মাথায় শোভা পাচ্ছিল রাজ মুকুট। এছাড়াও আরও দামি দামি বস্তুরাজি ছিল। সে তার সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল।
রিবঈ ইবনে আমের (রা.) মোটা কাপড়, ঢাল, তলোয়ার ও ক্ষীণকায় অশ্ব নিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি তাতে আরোহণ অবস্থায় গালিচার ওপর দিয়ে চলতে লাগলেন। অতঃপর সওয়ারি থেকে অবতরণ করে সিংহাসনের একটি খুঁটির সাথে তা বাঁধলেন। তিনি সামনে এগোতে লাগলেন। তাঁর গায়ে যুদ্ধের পোশাক ও অস্ত্র। মাথায় শিরস্ত্রাণ। তারা বলল, অস্ত্র খুলুন।
তিনি বললেন, আমি নিজে তোমাদের নিকট আসিনি; তোমাদের আহ্বানের কারণে এসেছি। তাই যদি এভাবে আসতে দাও, তাহলে আসতে পারি, অন্যথায় আমি ফিরে যাই। তখন রুস্তম বলল, তাকে আসতে দাও। তারপরে তিনি বর্শার ওপর ভর দিয়ে কার্পেটের গায়ে খোঁচা দিতে দিতে অগ্রসর হলেন। এভাবে কার্পেটের অধিকাংশটাই ফোড়া করে দিলেন। অতঃপর তারা জিজ্ঞেস করল: তোমরা কীজন্য এসেছ? তিনি বললেন: আল্লাহ আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন, যেন আমরা আল্লাহ যাদের চান তাদেরকে বান্দাদের ইবাদত থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদতের দিকে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে এবং বহু ধর্মের জুলুম থেকে ইসলামের ইনসাফের দিকে নিয়ে আসি। তাই তিনি আমাদেরকে তাঁর দ্বীন দিয়ে তাঁর সৃষ্টির নিকট প্রেরণ করেছেন, যেন আমরা তাদেরকে তাঁর দিকে আহ্বান করি। অতঃপর যে তা কবুল করে, আমরা তার থেকে তা গ্রহণ করি আর যে অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ চালিয়ে যাই। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া লি ইবনে কাসির)
এটিই সেই বীরত্ব, যার ফলে তিনি ক্ষমতা, রাজত্ব ও শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীকে ভয় পাননি। এটি হচ্ছে সত্য বীরত্ব ও শক্তি, যা আল্লাহ প্রদত্ত ও তাঁর সাহায্যপ্রাপ্ত।
আবু বকর (রা.)
আবু বকর (রা.) মুরতাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধসমূহে আল্লাহর ওপর ভরসা করে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের খুঁটিগুলো দৃঢ় করেন, তাকে সুরক্ষিত করেন এবং তাকে ফাটল ও বিভক্তি থেকে রক্ষা করেন। এমনকি কিছু মুসলিম তাঁকে বলেছিল: হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! সমগ্র আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি আপনার নেই। আপনি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকুন আর মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত আপনার রবের ইবাদতে নিয়োজিত থাকুন। কিন্তু সদা ক্রন্দনকারী, নম্র, মহানুভব ও কোমল হৃদয়ের লোকটি এক মুহূর্তের মধ্যে তেজস্বী সিংহে পরিণত হয়ে গেলেন। উমর ইবনুল খাত্তাবের ব্যাপারে বজ্রকণ্ঠে বললেন: জহিলিয়াতের সময় দাপটশালী আর ইসলামের মধ্যে ভীরু হয়ে গেলে? নিশ্চয় ওহী পরিপূর্ণ ও শেষ হয়ে গিয়েছে... তাই কীভাবে আমি জীবিত থাকতে দ্বীনের ক্ষতি হতে পারে? আল্লাহর কসম! তারা রাসূলুল্লাহর যামানায় যে উটের রশি যাকাত দিত, আজ যদি তা থেকেও বিরত থাকে, তাহলে আমি এর জন্যও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।
মুহাম্মাদ ইবনে আকিলে ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) আমাদের মাঝে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন: হে লোক সকল! আপনারা বলুন তো, মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বীর কে? তারা বলল: আমরা জানি না, কে? তিনি বললেন: আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। আমরা বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য একটি মাচা বানিয়েছিলাম। অতঃপর আমরা ঘোষণা দিলাম: কে আছ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-সাথে থাকবে, যেন কোনো মুশরিক তাঁর কাছে ঘেঁষতে না পারে। আল্লাহর কসম! তখন আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর নিকট এগিয়ে আসেনি; একমাত্র আবু বকর এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি কাউকে আঘাত করেন, কাউকে ঠেকিয়ে দেন এবং কাউকে পাল্টা আক্রমণ করেন। আর তিনি বলতে থাকেন, ধ্বংস তোমাদের জন্য! তোমরা একজন লোককে এর জন্য হত্যা করতে চেয়েছ যে, সে বলে, আমার রব আল্লাহ। তারপরে আলী (রা.) তাঁর গায়ে থাকা চাদরটি উপড়ে উঠান। তারপরে তিনি কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দাড়ি ভিজিয়ে ফেলেন। তারপরে আলী (রা.) বলেন: আমি আপনাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি: আপনারা বলুন তো, ফেরাউন বংশের সেই মুমিন ব্যক্তি উত্তম, না আবু বকর (রা.) উত্তম? বর্ণনাকারী বলেন: সবাই চুপ থাকলেন। তারপরে তিনি বললেন: আপনারা কি আমাকে উত্তর দেবে না? আল্লাহর কসম! আবু বকরের একটি মুহূর্ত ফেরাউন বংশের সেই মুমিনের চেয়ে দুনিয়া ভরা লোকের চেয়ে উত্তম। সেই ব্যক্তি তাঁর ঈমান গোপন করত আর তিনি তাঁর ঈমানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন। (মুসনাদে বাজ্জার)
উমর ফারুক (রা.)
তিনি ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই তাঁর বীরত্ব ও বাহাদুরি প্রকাশ করেন। তাঁর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল মক্কায় ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে এবং মুশরিকদের মুখোমুখি হতে। অথচ ইতিপূর্বে মুসলিমগণ মানুষের কাছে যেত গোপনে গোপনে। তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কেন আমাদের দ্বীনকে গোপন করব, অথচ আমরা হকের ওপর আছি, আর তারা হল বাতিল? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: আমরা সংখ্যায় স্বল্প আর আমরা কি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি তা তো তুমি দেখেছ। তখন উমর (রা.) বললেন: সেই প্রভুর কসম! যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যত মজলিসে আমি কুফরি নিয়ে বসেছিলাম, এখন আমি প্রতিটি মজলিসে ঈমান নিয়ে বসব। তারপরে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদেরকে দুটি কাতারবদ্ধ করে কাবা’র দিকে রওয়ানা দিলেন। এক কাতারে হামজা, অন্য কাতারে উমর। (ঘটনাটি আবু নুয়াইম, ইবনে আসাকির ও ইবনুল জাওযি উল্লেখ করেছেন)
তিনি যখন হিজরত করার ইচ্ছা করলেন, তখন কুরাইশের একটি সভার মধ্যে ঘোষণা দিলেন: যে তার মাকে সন্তানহারা করতে চায়, নিজ সন্তানকে ইয়াতীম করতে চায়, সে যেন এই উপত্যকার অপর পাশে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তখন কেউ তাঁর পেছনে যেতে সাহস করেনি।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: যখন থেকে উমর ইসলাম গ্রহণ করল, তখন আমরা সর্বদা দাপটশালী থেকেছি। (ঘটনাটি ইবনে আসাকির ও ইবনুল আছির উল্লেখ করেছেন)
যুন নুরাইন উসমান ইবনে আফফান (রা.)
উসমান (রা.)-কে সাহাবাদের মধ্যে সবচেয়ে বাহাদুর হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি সবগুলো যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। মুসলিমদের কোনো যুদ্ধ থেকেই পিছিয়ে থাকেননি। একমাত্র বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা রুকাইয়া (রা.)-এর পাশে থাকতে বলেন। কারণ তিনি (রুকাইয়া রা.) অসুস্থ ছিলেন।
আমীরুল মুমিনীন উসমান (রা.)-এর চূড়ান্ত বীরত্ব প্রকাশ পায় যে সময় তাকে তার নিজ ঘরে অবরুদ্ধ করা হয়। তিনি দুচোখের সামনে মৃত্যু দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি জানতেন যে, তিনি একটি মাত্র কথার মাধ্যমে এই মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পারেন। আর তা হচ্ছে তিনি মুসলিমদের খিলাফত থেকে সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু তিনি এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ তিনি জানেন, মৃত্যু তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করারও কেউ নেই। তাঁর কোনো প্রহরী বা গোয়েন্দা বাহিনীও নেই। তিনি এমন একটি বিষয় ছাড়তে অস্বীকার করেন, যেটা আল্লাহর আদেশ নয় অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোনো বিষয়ও নয়।
তিনি নিজ জীবন ও নিজ খিলাফত বহাল রাখার জন্য বা শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য কৌশল অবলম্বন করেননি। তাকে মৃত্যুর পূর্বে মারা হয়েছে, জখম করা হয়েছে, কিন্তু তিনি সামান্যই নমনীয় হননি। একই সময়ে মৃত্যু ও পিপাসা তাঁকে হাতছানি দিতে থাকে, কিন্তু তিনি নমনীয় হননি। তাকে আকস্মিকও হত্যা করা হয়নি; বরং স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে: হয় মৃত্যু অথবা খিলাফত ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু তিনি নিজের থেকে বাইয়াত তুলে নেননি। কাউকে আহ্বানও করেননি তাঁর পক্ষে লড়াই করার জন্য। শুধু মাত্র মুসলিমদের রক্তের হিফাযতের জন্য তিনি নিজেকে কুরবানি করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন।
আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)
খায়বার যুদ্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন। খায়বার যুদ্ধে আলী (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন না। তাঁর চোখ উঠেছিল। কিন্তু তিনি বললেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পেছন থেকে যাব? তাই তিন দিন পরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মিলিত হন। অতঃপর যখন সেই রাত্রি আসল, যে রাত্রির পরবর্তী সকাল বেলা আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করেছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: আমি আগামীকাল এমন একজন ব্যক্তিকে পতাকা দিব (বা এমন ব্যক্তি পতাকা হাতে নেবে), যাকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ভালোবাসেন। অথবা বলেছিলেন, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দান করবেন। তারপরে আমরা দেখতে পেলাম ‘আলী’কে। আমরা তাকে ধারণা করেছিলাম না। সবাই বলল- এ তো আলী। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাতে পতাকা দিলেন।
কাফির পক্ষের মারহাব বেরিয়ে এসে বলতে লাগল: ‘খায়বার জেনে গেছে আমি হলাম মারহাব। সেই সময়ের বাহাদুরি, সম্পূর্ণ সশস্ত্র ও যুদ্ধ অভিজ্ঞ, যখন যুদ্ধের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে।’ তখন আলী (রা.) বললেন: ‘আমি হলাম সেই ব্যক্তি, আমার মা আমার নাম রেখেছে হায়দার (সিংহ)। বনের সিংহের ন্যায়, যা দেখতে সুন্দর। আমি তাদের-কে ‘সানদাওরা’র মাপ বুঝিয়ে দেব।’ বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর আলী (রা.) মারহাবের মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলেন এবং বিজয় তাঁর হাতেই হয়। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রাহি.)
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)
সর্বপ্রথম মুতার যুদ্ধেই হযরত খালিদ (রা.) অংশগ্রহণ করেন। মুতার যুদ্ধের তিন সেনাপতি, যায়েদ ইবনে হারিসা, জাফর ইবনে আবি তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শহীদ হয়ে যান। তখন সাবিত ইবনে আকরাম (রা.) দৌড়ে এসে পতাকা উঁচু করে ধরেন। অতঃপর খালিদ (রা.)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে বলেন: হে আবু সুলাইমান! আপনি পতাকা ধারণ করুন। খালিদ (রা.) নিজেকে এটা গ্রহণ করার অধিকারী মনে করলেন না। তাই তিনি এই বলে ওযর পেশ করলেন: আমি এই পতাকা নেব না, আপনি এর যোগ্যতম অধিকারী। আপনার বয়সও বেশি এবং আপনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সাবিত (রা.) তাকে উত্তর দেন: আপনি আমার চেয়ে যুদ্ধ অভিজ্ঞ। আর আল্লাহর কসম! আমি এটা আপনার জন্যই গ্রহণ করেছি। অতঃপর তিনি মুসলিমদের মাঝে ঘোষণা দিলেন: আপনারা কি খালিদের নেতৃত্বে সন্তুষ্ট? সকলে বলল: হ্যাঁ। তখন খালিদ (রা.) পতাকা হাতে নিয়ে মুসলিমদেরকে উদ্ধার করলেন। খালিদ (রা.) বলেন: মুতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারী ভেঙে গেছে। তারপরে আমার নিকট আমার ইয়ামানী তরবারীটি ছাড়া কিছু বাকি রইল না। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রহ.)
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাহাবাদেরকে এই যুদ্ধের সংবাদ দিচ্ছেন, তখন তিনি বললেন, এখন পতাকা হাতে নিয়েছে যায়েদ, সে নিহত হয়েছে। তারপরে পতাকা হাতে নিয়েছে জাফর, সে-ও নিহত হয়েছে। তারপরে পতাকা হাতে নিয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, সে-ও নিহত হয়েছে। সবশেষে তরবারী হাতে নিয়েছে আল্লাহর তরবারীগুলোর মধ্যে একটি তরবারী। আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দান করেছেন। সেই দিন থেকে খালিদ (রা.)-কে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারী) বলে নামকরণ করা হয়। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)
রিদ্দার যুদ্ধসমূহে হযরত খালিদ (রা.)-এর অবদান: তিনি মক্কা বিজয় ও রিদ্দার যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেন। বনু তামীম ও অন্যান্য গোত্রসমূহের বিদ্রোহ দমন করেন। মালেক ইবনে নুয়াইরাকে হত্যা করেন। অতঃপর বুজখাবাসীদের ওপর আঘাত হানেন। এটাই খালিদ ও তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদের মধ্যেরকার যুদ্ধ। তিনি বুজখাবাসীদের আগুনে পোড়ান। কারণ তাদের ব্যাপারে তাঁর নিকট এই মন্দ সংবাদ পৌঁছেছিল যে, তারা নবী (সা.)-কে গালি দান করেছে এবং নিজেদের ধর্মত্যাগের ওপর বহাল রয়েছে। তারপরে ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হন এবং মুসায়লামাতুল কাযযাব ও তাঁর সহযোগী বনু হানিফার ঔদ্ধত্যের সমাপ্তি ঘটনা। এই বাহাদুরি সিপাহসালারের কৃতিত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল ইয়ামামাহর যুদ্ধে, যখন আবু বকর (রা.) মুসলিম সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্বের ভার অর্পণ করেছিলেন খালিদ (রা.)-এর হাতে, দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার রোমক বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য।
খালিদ (রা.) মুসলিম সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন: নিশ্চয় এটি আল্লাহর দিনসমূহ হতে একটি দিন। আজকের দিনে কোনো গৌরব বা ঔদ্ধত্য করা শোভনীয় নয়। আপনারা আপনাদের জিহাদের মধ্যে ইখলাস আনয়ন করুন এবং আপনাদের কাজের মাধ্যমে শুধু আল্লাহর সন্তোষ কামনা করুন। আর আসুন, আমরা পালাক্রমে নেতৃত্ব দেই। আজ একজন নেতৃত্ব দিবে, আগামীকাল আরেকজন দিবে, আরেকজন তারপরের দিন নেতৃত্ব দিবে। এভাবে আপনাদের সবাই নেতৃত্ব দিবে। তাঁর শক্তিশালী ভাষণ ক্ষমতা ছিল। ভাষণের মাধ্যমে নিজ সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে তুলতেন, উদ্যমতা সৃষ্টি করতেন এবং তাদের অন্তরে দায়িত্বভার বহন করার যোগ্যতা সৃষ্টি করতেন। এই ভাষণের মাঝে তিনি সৈন্যদের মাঝে এই ধারণা দেন যে, নেতৃত্ব পালাক্রমে সকলের কাছেই আসবে। যেন সকলে-ই এই জাতীয় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। ঠিক এভাবে মুসলিম শিশু ও যুবকদেরকে ছোট থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা দেওয়া উচিত। কারণ তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দানকারী। তারাই ভবিষ্যতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন, তাঁর শরীয়ত প্রতিষ্ঠা ও তাঁর দ্বীন প্রসারের দায়িত্ব পালন করবে।
যুদ্ধ শুরুর পূর্বে রোমের সেনাপতি খালিদ (রা.)-এর সাথে তাঁর সঙ্গে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানাল। খালিদ (রা.) দুই বাহিনীর মধ্যবর্তী খালি জায়গায় তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। তখন রোমের সেনাপতি মাহান বলল: আমরা জেনেছি, কষ্ট ও ক্ষুধাই তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। তাই তোমরা যদি চাও, তাহলে আমরা তোমাদের প্রত্যেককে দশ দিনার এবং অন্ন-বস্ত্র দান করতে পারি, তোমরা তোমাদের দেশে ফিরে যাও। আর সামনের বছরও তোমাদের জন্য এই পরিমাণ পাঠিয়ে দেব।
খালিদ (রা.) রোমকদের এই কথায় অশিষ্টতা লক্ষ্য করলেন। তাই তিনি এই বলে উত্তর দিলেন: ক্ষুধা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে নিয়ে আসেনি, যেমনটা তুমি উল্লেখ করলে। বরং আমরা এমন এক সম্প্রদায়, আমরা রক্ত পান করি। আর আমরা জানতে পেরেছি, রোমকদের রক্ত থেকে মনোরম ও উৎকষ্ট মানের রক্ত আর কারো নেই। তাই আমরা রক্তপানের এসেছি।
নিশ্চয় এই উত্তরটি এই সিপাহসালারের অসাধারণ ক্ষিপ্রতা এবং কাফিরদের ওপর বীরত্ব ও বাহাদুরির সাক্ষ্য দেয়। তিনি তাদের সংখ্যাধিক্যের পরোয়া করেননি। বরং তাঁর দৃঢ় কঠিন উত্তরের মাধ্যমে তাদেরই অটুট মনোবল নড়বড়ে করে দিয়েছেন। তারপরে তিনি তাঁর অশ্ব নিয়ে মূল বাহিনীর সাথে এসে মিলিত হন এবং পতাকা উঁচু করে আল্লাহু আকবার বলে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। বয়ে যাও হে জান্নাতের বাতাস! আর এই অসাধারণ নেতৃত্ব, অসীম দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞাবান নেতার বীরত্বের কারণেই আল্লাহর অনুগ্রহে বিজয় লাভ হয়েছিল।
অনুরূপ যখন আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদ পৌঁছল এবং তারপরে উমর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে খালিদ (রা.)-এর পরিবর্তনে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-কে সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব প্রদান করলেন, তখন আরেকবার খালিদ (রা.)-এর বীরত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন। নিজের ব্যাপারে এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হলেন না যে, আমি তো বিজয় এনেছি, আমিই তো নেতৃত্বের অধিক যোগ্য। বরং তিনি সন্তোষচিত্তে সরে পড়লেন। কারণ তিনি একমাত্র আল্লাহর জন্যই যুদ্ধ করছিলেন। এছাড়াও অন্য কোনো দুনিয়াবি বিষয়াদির প্রত্যাশা তাঁর ছিল না। তিনি যুদ্ধ করতেন, যেন এক আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠিত হয়, তাঁর শরীয়তের শাসন বাস্তবায়িত হয়।
এটাই ঐ সকল নেতাদের বৈশিষ্ট্য, যারা তাদের আমীরদের আদেশ নিষেধ মনে প্রাণে মেনে চলতেন এবং আল্লাহর সন্তোষের মধ্যে তাদের আনুগত্য করতেন। কিন্তু বর্তমানে আফসোসের বিষয় হচ্ছে, আমরা অনেক মানুষ পাই, যারা সালাফদের পদাঙ্ক ওপরে থাকার দাবি করে, অথচ আমীরের অবাধ্যতা করে, মুসলিমদের দলে বিভক্তি সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয়; নেতৃত্বের লোভে উম্মাহর মাঝে বিভিন্ন ক্ষুদ্র দল সৃষ্টি করা ও মুসলিম জামাতকে বিভক্ত করার দিকে আহ্বান করে। এ কথা ভুলে যায় যে, এটা কিয়ামতের দিন অনুতাপ ও অনুশোচনার কারণ হবে। নিশ্চয় খালিদ (রা.)-এর বীরত্ব ছিল ইতিহাসের বিরল নমুনা। বর্তমান বিশ্বও তাদের সমরনীতিতে তাঁর সমরকৌশলসমূহ থেকে পাঠ গ্রহণ করে।
বালক সাহাবীগণ ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বলেন: বদর যুদ্ধের দিন আমি যুদ্ধের সারিতে। আমি আমার ডানে ও বামে তাকিয়ে দেখি, অল্প বয়সী দু’জন বালক। আমার পাশে তাদের অবস্থানের কারণে আমি যেন অনিরাপত্তা অনুভব করছিলাম। ইত্যবসরে তাদের একজন অপরজন থেকে লুকিয়ে আমাকে বলল: চাচা! আমাকে আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিন। আমি বললাম, ভাতিজা! তুমি তাকে দিয়ে কি করবে? সে বলল: আমি আল্লাহর সাথে শপথ করেছি, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তাহলে হয় সে তাকে হত্যা করবে অথবা আমি নিহত হবো। তারপরে তার অপর সাথীও তার থেকে লুকিয়ে আমাকে অনুরূপ কথাই বলল। তখন আমার নিকট মনে হলো, তাদের স্থানে দু’জন পুরুষ থাকলেও আমি এতটা খুশি হতাম না। আমি তাদেরকে আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিলাম। তৎক্ষণাৎ তারা বাজপাখির মত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করে ফেলল। তারা ছিল আফরা’র দু’ ছেলে। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)
আমাদেরও উচিত, আমাদের সন্তানদেরকে এভাবে প্রতিপালিত করা। আমরা তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলব নিজেদের দ্বীনের জন্য, তাদের নবীর জন্য এবং মুমিনদের জন্য। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য ভালোবাসার বীজ বপন করব। আল্লাহ তা‘আলা এই প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যাপারেই নিম্নোক্ত আয়াতে আমাদেরকে আদেশ করেছেন:
وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ
‘তোমরা তাদের (বিরুদ্ধে যুদ্ধের) জন্য তোমাদের সামর্থ্যমতো শক্তি প্রস্তুত কর।’
‘তোমরা তাদের জন্য তোমাদের সাধ্যমতো শক্তি প্রস্তুত কর’- জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা। জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা। জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা।
তবে রাসূল (সা.)-এর এ কথা দ্বারা আয়াতে বর্ণিত যেকোনো প্রকার শক্তিকে বিশেষ প্রকারের সাথে শর্তযুক্ত করা বোঝায় না। বরং হাদিসের অর্থ হচ্ছে: নিক্ষেপ করা নিজ সকল শক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বড়। আর সে সময়ের ধনুকের সাহায্যে তীর নিক্ষেপের হুকুমটি বর্তমানে প্রযোজ্য হবে বিভিন্ন আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে নিক্ষেপ করার ওপর। যেগুলোর জন্য সাধারণত: দীর্ঘ নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। যা অনিবার্যভাবে ব্যাপক আকারে প্রস্তুতি গ্রহণকে দাবি করে। যেমনভাবে ধনুকের সাহায্যে তীর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতো। বর্তমানে আমরা এরই লক্ষ্যে আছি এবং এটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ উম্মাহ তাদের বর্তমান দুর্দশা থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই উত্তরণের পথ পাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের পথে ফিরে না আসবে। আর সাহাবায়ে কেরামের এই ভূমিকা একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উন্নত দীক্ষার কারণেই হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাধ্যমে দ্বীনকে হিফাযত করেছেন এবং অসংখ্য দেশ বিজয় করেছেন।
কতক উলামায়ে কিরামের ভূমিকা
উম্মাহর ইতিহাস এমন অসংখ্য বীর উলামায়ে কিরামের দ্বারা পরিপূর্ণ, যারা বাতিলের ব্যাপারে নীরব থাকার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। তাই তারা এমন অজস্র অবদান রেখে গেছেন, যে অবদানগুলো আজ আমাদের প্রয়োজন। বাতিলকে ধ্বংস করার জন্য, হককে মানুষের সামনে প্রকাশ করার জন্য এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য। সেই অন্ধকার, যুগের তাগুত স্বৈরাচারী শাসকরা যে অন্ধকারে মানুষকে নিমজ্জিত করেছে, যে অন্ধকার ঘোর অমানিশার রজনীতে সাগরের অন্ধকার থেকেও ভয়ঙ্কর। তারা তাদেরকে সেই নূর থেকে মুক্ত করে ফেলে গেছেন, যে নূর নিয়ে মুহাম্মাদ (সা.) পৃথিবীতে এসেছেন। আমরা এসকল উলামায়ে কিরাম থেকে কয়েকজনের আলোচনা করছি:
আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহি.)- তাকে নির্যাতন করা হয়, কারারুদ্ধ করা হয়, যেটা ইতিহাসে খালকে কুরআন ফিতনা হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু তিনি আপন অবস্থায় অটল থাকেন। তার থেকে সামান্যও নড়েননি। বাতিলের মোকাবেলায় তার বীরত্ব ও দৃঢ়তার কারণে উম্মাহর ওপর আজই তার মহান অনুগ্রহ রয়ে গেছে। ফলে উম্মাহ আজও বিশুদ্ধ আকীদার ওপর অটল আছে। আল্লাহ তাকে আমাদের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহি.)- কতিপয় মাসআলায় নিজস্ব ইজতিহাদের কারণে তিনি তার সমকালীন ফকীহদের বিরোধিতায় পতিত হন। ফলে তারা সুলতানের নিকট তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করলে সুলতান তাকে কারারুদ্ধ করেন। তিনি কারারুদ্ধ থেকেই স্বীয় মাযহাবের সমর্থনে এবং প্রতিপক্ষের দলিল খণ্ডন করে অসংখ্য পুস্তিকা লিখতে থাকেন।
ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম (রাহি.)- তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা, যার কারণে বাদশাহ আইয়্যুবের সাথে তার সংঘাত হয়েছিল তা হচ্ছে: তিনি যখন মিশরে বসবাস করছিলেন, তখন প্রকাশ পেল যে, দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও বড় বড় পদে ব্যক্তিরা সকলেই গোলাম। পূর্বে মালিক নাজমুদ্দীন আইয়্যুব তাদেরকে ক্রয় করেছিল। একারণেই তাদের ওপর গোলাম বা দাসের বিধান কার্যকর হবে। স্বাধীনদের ওপর তাদের নেতৃত্ব বৈধ নয়। তাই তিনি স্পষ্টভাবে তার ফাতওয়া প্রকাশ করেন যে, তাদের নেতৃত্ব জায়েয হবে না; কারণ তারা গোলাম। সমগ্র মিশর সেই সকল আমীরদের ক্রোধে জ্বলে উঠল, যারা প্রতিটি উঁচু উঁচু পদে সমাসীন ছিল। এমনকি সরাসরি সুলতানের নায়েবও দাসদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তারা শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালামের নিকট আসল। তারা তাকে এই ফাতওয়া থেকে বিরত করার চেষ্টা করল। তারপরে তাকে হুমকি ধমকি দিল। কিন্তু তিনি এসকল হুমকি ধমকি প্রত্যাখ্যান করলেন। অথচ তিনি দামেস্ক থেকে ভীষণ নিপীড়ন সহ্য করে এখানে মিশরে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তার জীবনে হক কালিমা ছাড়া কিছু খুঁজে পাননি। তাই বিষয়টি মালিক আইয়্যুবের নিকট উত্থাপন করা হয়। বাদশাহ শায়খের কথাকে অসম্ভব মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করল। আর বলে দিল, এ ব্যাপারে কথা বললে তা ক্ষমাহীন হবে। তাই শায়খ বুঝতে পারলেন যে, তার কথা শোনা হবে না। এজন্য তিনি বিচারকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি শুধুমাত্র ফাতওয়া প্রদানকারী হয়ে বসে থাকলেন না; কারণ তিনি জানেন যে, যেভাবে আল্লাহ তাআলা তাকে তার কথা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন, সেভাবেই তার নীরবতা সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করবেন।
এখানে শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালামের বীরত্ব প্রকাশ পায়। অতঃপর এই আল্লাহভীরু আলিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, তিনি সকল সামাজিক অবস্থান, সম্পদ, নিরাপত্তা, বরং পুরো দুনিয়াকে কুরবানি করে উঁচু পদ থেকে সরে পড়বেন। শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম তার গাধায় আরোহণ করলেন এবং তার পরিবারবর্গকে আরেকটি গাধায় আরোহণ করালেন। অম্লান বদনে কায়রো থেকে চিরতরে বেরিয়ে যাওয়ার এবং কোনো অজ্ঞাত জনপদে বসবাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। যেহেতু তার ফাতওয়া শোনা হচ্ছে না, তাই তিনি সকলের থেকে পৃথক হয়ে যাবেন।
কিন্তু উলামাদের মূল্য অনুধাবনকারী মিশরের জনগণ এ বিষয়টি মানতে পারল না। শায়খের পেছনে পেছনে মিশরের হাজার হাজার আলিম, নেককার, ব্যবসায়ী, নারী-পুরুষ ও শিশুরা বেরিয়ে পড়ল। শায়খের সমর্থনে এবং তার বিরোধীদের প্রত্যাখ্যান করে। বাদশাহ নাজমুদ্দীন আইয়্যুবের নিকট অসংখ্য সংবাদ পৌঁছাতে লাগল। বাদশাহ দৌড়ে এল শায়খ ইযযুদ্দীন পিছু পিছু তাকে সন্তুষ্ট করাতে। কিন্তু শায়খ তো তার ফাতওয়া কার্যকর করার আগে রাজি হবেন না। তিনি বললেন: “তুমি যদি চাও, এই সকল আমীররা স্ব-স্ব পদের অধিকারী হবে, তাহলে অবশ্যই প্রথমে এদেরকে বিক্রি করবে। অতঃপর যে এদেরকে ক্রয় করবে, সে আযাদ করবে। আর যেহেতু পূর্বে এসকল আমীরদের মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে মুসলমানদের বায়তুল মাল থেকে, তাই এখন এদের বিক্রয় মূল্যও মুসলমানদের বায়তুল মালে ফেরত দিতে হবে।” নাজমুদ্দীন আইয়্যুব শায়খের কথায় একমত হল এবং এই বাহাদুর শায়খের কথার প্রতি নত হল, যিনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করেননি। শায়খ নিজেই সরাসরি আমীরদের বিক্রয়ের দায়িত্ব নিলেন, যাতে কোনো ধরনের তামাশা না হয়। শায়খ আমীরদেরকে একজনের পর একজন নিলামে তুলতে লাগলেন এবং তাদের মূল্য বাড়াতে লাগলেন। জনগণও নিলামে অংশগ্রহণ করল। অবশেষে যখন মূল্য অনেক বেড়ে গেল, তখন বাদশাহ নাজমুদ্দীন তার ব্যক্তিগত মাল থেকে আমীরদেরকে ক্রয় করলেন। অতঃপর আযাদ করে দিলেন। আর উক্ত মাল বায়তুল মালে জমা করলেন। এভাবে এসকল আমীরদেরকে বিক্রি করা হলো, যারা মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, সামরিক বিভাগ ও অন্যান্য বিভাগে নেতৃত্ব দিত। সেই দিন থেকেই শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম আমীরদের বিক্রয়কারী নামে খ্যাতি লাভ করেন।
সাইয়্যেদ কুতুব (রাহি.)- শাসক জামাল আবদুন নাসিরের যখন তাকে তার সেই মত থেকে ফেরাতে চেষ্টা করল, যা তিনি তার বিরুদ্ধে পোষণ করতেন, তখন তিনি তার সেই প্রসিদ্ধ উক্তিটি করেছিলেন: “যে শাহাদাত আঙুল নামাজের মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়েছে, তা এমন একটি অক্ষরও লিখতে পারবে না, যাতে তাগুতি শাসনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।” আমাদের যামানায় কত শায়খ ও আলিম এই হক কথাটির কারণে তাগুতদের কারাগারে বন্দী হয়ে আছেন!
আবু আব্দুল্লাহ উসামা (রাহি.)- যিনি সেই সকল কুফরি জাতি ও তাগুতি শাসনব্যবস্থাসমূহের একমাত্র টার্গেট ও লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিলেন, যারা হোয়াইট হাউসের ‘পাহাড়াদার কুকু্রের’ ভূমিকা পালন করছে। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাকে শহীদদের সাথে কবুল করুন।
যুগে যুগে যত মহান পুরুষরা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যের জন্য কারারুদ্ধ হয়েছেন, হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের সকলের কথা যদি লিখতে যাই, তাহলে আমার মনে হয় না যে, আমি তাদের গুণে শেষ করতে পারব। কারণ তাদের সংখ্যা কয়েকটি বই বা কয়েকটি খণ্ডে লিখে শেষ করার চেয়েও বেশি। আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, আল্লাহ আমাদেরকেও এবং আপনাদেরকেও সেই সকল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থেকেছেন এবং হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তার পথে ডেকেছেন।
পরিশেষে আমি বলব: নিশ্চয় শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মুমিন অপেক্ষা প্রিয় ও উত্তম। আর বীরত্ব এমনই একটি বৈশিষ্ট্য, একমাত্র সেই সকল শক্তিশালী লোকেরা এতে অলঙ্কৃত হতে পারে, যারা স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল। কাপুরুষতা ও ভীরুতা যাদের পেশা নয় এবং ধ্বংসশীল দুনিয়ার প্রতি যারা ঝুঁকে পড়েনি। তাই বীরত্ব মানুষের সাথে উদ্ভিদের ন্যায় বেড়ে ওঠে, বৃদ্ধি পায়। যখন একজন ব্যক্তি তার প্রতি গুরুত্ব দেয়, তার যত্ন নেয় এবং তার হক যথাযথভাবে আদায় করে, তখন তা তার সাথে সাথে বেড়ে ওঠে, বড় হয় এবং উক্ত ব্যক্তির মর্যাদা উঁচু হয়।