সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ভূখন্ডে যেসকল শক্তিশালী ইসলামী আন্দোলন দাঁড়িয়েছে, সেদিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, পশ্চিমা বিশ্বের সাথে লিয়াজোঁ কিংবা বৈশ্বিক কুফরি গোষ্ঠীর বেঁধে দেওয়া নিয়ম-কানুন ও রাজনৈতিক প্রলোভনসহ বহুবিধ চাকচিক্যময় আহ্বানকে উপেক্ষা করে অগ্রসর হওয়া বিপ্লবী জামাআতগুলোকে সর্বপ্রকার মুসিবত ও বাধা-বিপত্তির বেড়াজাল ছিন্ন করতে হয়েছে।

হত্যা, বন্দিত্ব, নিপীড়ন কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও বর্তমান সময়ের আপসহীন ও কার্যকর ইসলামী আন্দোলনগুলো নিজেদের দাওয়াত ও পথের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। আপসহীন ও দূরদর্শী এই আন্দোলনের নেতারা কোনো নতুন পথ আবিষ্কার করেননি। বরং পূর্ববর্তী নেককার ইমামদের বিবৃত মূলনীতির আলোকেই তারা সঠিক কৌশল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দিগভ্রান্ত ও প্রতারিত উম্মাহকে সম্মান ও গৌরবের পথে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। যখনই কোনো জামাআতে এই মানহাজ পরিত্যাগ করা হয়েছে, সেই জামাআত মুখ থুবড়ে পড়েছে। যেমনটা আমরা কিছুটা দেখেছি ইরাক ও সিরিয়ায়। মিশর ও তিউনিসিয়ায়।

বিগত শতাব্দীর শুরুতে জমিনের বুক থেকে ইসলামি কর্তৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারিত হওয়ার পর থেকে, তামকিন ফিরিয়ে আনার প্রায়োগিক মেহনত ও আন্দোলন মূলত দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে আছে:

১. গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা

২. বিপ্লবী-জিহাদী চিন্তাধারা

গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার অনুসারীদের নানামুখী ব্যর্থ চেষ্টা ও প্রক্রিয়াগুলোর বাস্তবতা ও নেতিবাচক ফলাফল আমাদের কাছে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট বিধায় এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।

আর একসময় ইসলামের অধীনে থাকা ভূমিগুলোতে শরীয়াহ’র কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিপ্লবী রাজনৈতিক কৌশল প্রণয়নের আগে জরুরি ছিল পরাশক্তির হস্তক্ষেপ থেকে মুসলিমদের ভূমিগুলোকে নিরাপদ করা। 

এ লক্ষ্যে ভৌগোলিক গভীরতা ও উপযোগী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিদ্যমান দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি জনযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন করা হবে। পাশাপাশি আমেরিকা, ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিকে নিজ খোলসে ফিরিয়ে দেওয়া। যেন আমেরিকা বা অন্য কোনো আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইসলামের ভূমিগুলোতে হস্তক্ষেপের চিন্তাও না করে। যেমনটা আফগানিস্তানে দেখা গেছে। এছাড়াও, মালি, সোমালিয়া, ফিলিস্তিনের মত দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের তাবেদার সেক্যুলার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীরা লড়াই করে যাচ্ছেন।

অনুমেয় ছিল, দীর্ঘ যুদ্ধে পর্যুদস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন ও দুনিয়াব্যাপী ইসলামি জাগরণের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে মিশর, তিউনিসিয়া, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে থাকা ইসলামী সংগঠনগুলো গণআন্দোলনের পথ ধরে নিজেদের দেশগুলো সেক্যুলারদের করায়ত্ত থেকে স্বাধীন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কলোনিয়াল ইউরোপীয় শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায়, উপনিবেশগুলোর জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজেদের ভূমিকে গণআন্দোলনের মাধ্যমে ‘মুক্ত’ করে নিয়েছিল। এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো গণআন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের মুক্ত করেছিল।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, এ-ধরনের ভূমিগুলোতে ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে তো নয়ই, আদর্শিকভাবেও সঠিক অবস্থানে ছিল না। ছিল না প্রয়োজনীয় আত্মত্যাগে প্রস্তুত। আসন্ন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতও ছিল না। যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তাও সরলমনা, অপ্রস্তুত ইসলামপন্থীরা হারিয়েছে সুবিধাবাদী সেক্যুলারদের কাছে। আবার, সামর্থ্য ও সুযোগের অভাবে এ জাতীয় দেশগুলোতে নববী মানহাজের আলোকে আন্দোলনও আগে থেকে গড়ে ওঠেনি। যার ফলে আরব বসন্তের অভূতপূর্ব আন্দোলনের পরেও ইসলামপন্থীরা ফসল ঘরে তুলতে পারেনি।

বিদেশী আগ্রাসন বা স্থানীয় সেক্যুলার প্রশাসনের দমনপীড়নের মুখে গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের উপযোগী ভূমিগুলোতে ইসলামি কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার বাস্তবতা কিছুটা দৃশ্যমান। কিন্তু আমাদের দেশের মতো ভূমিতে -যেখানে শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী এবং সমাজ সেক্যুলার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্বীকার- ইসলামী আন্দোলনের সঠিক তরিকার বিষয়ে বেশ অস্পষ্টতা রয়ে যায়! 

জিহাদি আন্দোলনের ব্যানারে যারা নানামুখী তত্ত্ব ও কর্মসূচি হাজির করেছেন, তারা বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন যে, ইসলামি বিপ্লবের জন্য সামরিক শক্তিরও আগে প্রয়োজন সাংগঠনিক ভিত্তি ও গণশক্তি, যা ব্যতীত দীর্ঘমেয়াদি বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনাই সম্ভব না। আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া বা মালিতে ইসলামী আন্দোলন গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল- সেখানে মুসলিমদের বিদ্যমান সামাজিক শক্তি। প্রাচীন গোত্রীয় সমাজব্যবস্থা এবং গৃহযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা ইত্যাদি নানা কারণে এদেশগুলোতে জনসাধারণের মাঝে কেন্দ্রীভূত সেক্যুলার শাসনের প্রভাব হয়ে ছিল অত্যন্ত দুর্বল; যার সুযোগে  সঠিক মানহাজের আলোকে ইসলামপন্থীরা তীব্র জিহাদি আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। 

অন্যদিকে আরব বসন্ত পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু ভূমিতে একই বাস্তবতা উপস্থিত হলেও, যথাযথ প্রস্তুতি ও উপযুক্ত সাংগঠনিক শক্তির অনুপস্থিতি মিশর, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও লিবিয়াতে সফলতা এনে দিতে পারেনি। যদি এসব ভূমিতে আফগানিস্তান, ইয়েমেন বা মালির মতো পূর্ব থেকেই নেতৃত্ব, মানহাজ ও কার্যকর আল্লাহওয়ালাদের জামাআত প্রস্তুত থাকত, তবে এমনটা হতো না। 

শায়খ সালাহউদ্দিন জায়দান বলেন,

“আরব বিপ্লবগুলো উত্তেজনা, দ্রুততা ও স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল, তবে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল; তাই এ আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি। আমরা যেসব সমালোচনাযোগ্য কাজে পতিত হয়েছিলাম তা হলো—

ক) এতদঞ্চলে (অর্থাৎ, পশ্চিম আফ্রিকা ও আরব রাষ্ট্রগুলোতে) আন্দোলনের জোয়ার ও (অন্যান্য) ইসলামী দলগুলোর ওপর নির্ভর করা।

খ) পরিবর্তনের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব এবং কর্মসূচির কাঠামোকে সঠিকভাবে ধারণ করতে না পারা।

গ) ইসলামী দলগুলোর কাতারে সেক্যুলারদের জায়গা পাওয়া এবং হঠকারী স্বভাবের লোকজনকে একীভূত করা।

আমরা এই গণজাগরণ এবং এতে অংশ নেওয়া জামাআতগুলোর মাঝে যথাযথ সমন্বয় সাধন করতে পারিনি। জনগণের সামনে এই আন্দোলনের রুপরেখা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এবং ভবিষ্যৎ আন্দোলনের জন্য জনগণকে যথাযথ উদ্বুদ্ধ করতে পারিনি।

তদ্রূপ আমাদের এ পর্যায়ে পৌঁছানো এবং আমাদের কার্যক্রম নিয়েও এ দলগুলোর যথেষ্ট সংশয় ছিল। তাই তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। বরং আমাদের আক্রমণ করে বসেছে, সমালোচনা ও অবজ্ঞা করেছে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ওপর ভরসা করার পর আমাদের জন্য আবশ্যক হলো, চতুর্দিকে বিপ্লবী আন্দোলন সুবিন্যস্ত করা। আর জনগণ বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, তার থেকে উন্নত অবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয়ে যাবে, এমন পরিস্থিতির জন্য বসে না থাকা।

কেন আমরা সর্বত্র (মিশর, তিউনিসিয়া ইত্যাদি দেশে) ইসলামী আন্দোলনের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম? কেন ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে আমরা নিজস্ব জামাআত তৈরি করতে পারিনি?

এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সক্ষমতার অভাব।

আমাদের চিন্তাভাবনায় এ কথা চেপে বসেছিল যে, ইসলামী তেহরিক ও জামাআতগুলো সময়ের চাকায় পিষ্ট হয়ে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। তারা তাদের কর্মীদেরকে যথাযথ তারবিয়াহ’র মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। এই কর্মীরা উম্মতের গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নে যেকোনো সুযোগকে কাজে লাগাতে পরিপক্ক হয়েছে।

এটাই আমাদের বড় একটি ভুল, যা সময়ই প্রমাণ করে দিয়েছে। আমরা ভুলের মধ্যে ছিলাম। আমরা বাস্তবতাকে ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম ঘটনাপ্রবাহ এবং সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রীতিনীতিকে।”

(কিছুটা পরিমার্জিত)

গভীরভাবে চিন্তা করলে এ বাস্তবতাও স্বীকার্য যে, পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমির ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে কোথাও ইসলামি আন্দোলন দ্রুত ও ব্যাপকতার সাথে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার কোথাও তা প্রাথমিক পর্যায়েই স্থির হয়ে আছে। উপযোগী প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হওয়া ছাড়া আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়। আর উপযোগী পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে বিপ্লবী সংগঠন, দাওয়াত ও রাজনৈতিক মেহনতের কোনো বিকল্প নেই। জাতির মাঝে ব্যাপকভাবে ইসলামের বিজয়ে বিশ্বাস এবং কুফরের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞার অনুভূতি সঞ্চারণ ব্যতীত জিহাদী আন্দোলন দাঁড়াতে পারে না। ইসলামপন্থীদের বিরোধিতাকারীর তুলনায় সহানুভূতিশীলদের অংশ যদি ভারী না হয়, তাহলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান এমন দেশে ব্যাপক বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা বিশেষ প্রেক্ষাপট কাজে লাগানো প্রায় অসম্ভবই বটে।

তাই আমাদের দেশে সুসংগঠিত কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ঘটানো অনেক জরুরি। বাস্তবতা হচ্ছে, জাতির মাঝে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ-মানহাজের দাওয়াতের বিস্তৃতি ছাড়া বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়া সম্ভব না। যদি তাওহীদ ও নববী মানহাজের দাওয়াতের ব্যাপকতা না থাকত, তবে অন্যান্য দেশেও বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হতো না, কিংবা সফলতার সাথে চলমান থাকতে সক্ষম হতো না। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

তাই, সংগঠনগুলোর পাশাপাশি আলিম, সংগঠক ও দাঈদের জন্য আবশ্যক, পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্র বিশুদ্ধ আক্বীদাহ ও মানহাজের দাওয়াহ সরল ও বলিষ্ঠভাবে প্রচার-প্রসারে সময় ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু ব্যয় করা।

স্মর্তব্য যে, আপামর জনসাধারণের মাঝে বিপ্লবীদের কেন্দ্রীয় দাওয়াত হচ্ছে, তাওহীদ, ইসলামী শাসনব্যবস্থা, আল ওয়ালা ওয়াল বারা’র আক্বীদাহ’র ভিত্তিতে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা। এবং এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়াও জরুরি যে, জাতীয় ও আর্থ-সামাজিক সকল সমস্যার সমাধান ইসলামের শাসন ও বিধান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। দেশের প্রতিটি প্রান্তে এই দাওয়াহ’কে প্রবল করার চেষ্টা জারি রাখতে হবে।

এই মেহনতের উদ্দেশ্য জনমানুষকে আম্বিয়ায়ে কেরামদের (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরণের উদ্দেশ্যের সাথে একাত্ম করা, তথা জমিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনসাফ ফিরিয়ে আনা। 

لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنٰتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

“নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।” (সুরা হাদিদ, ৫৭:২৫)

জনসাধারণকে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনে যোগ দিতে বা সক্রিয় সমর্থন আদায়েই প্রভাবিত করতে হবে, এটা জরুরি না। বরং ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ যেন আল্লাহর হুকুম জানামাত্র মেনে নেওয়ার মানসিকতা অর্জন করে, আল্লাহ তা’আলার বড়ত্ব উপলব্ধি করে, ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে আখিরাতমুখী হয়ে অল্পে তুষ্টির জীবনে আগ্রহী হয়, প্রচলিত রাজনীতির মোহ কাটিয়ে শরীয়াহ’র অনুগমনে অভ্যস্ত হয়। 

জীবন ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের দাবিই হচ্ছে, সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুমের সামনে সকল কিছুকে অবনত, অনুগত করা। বিশেষত এই সময়ে, মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের শত্রু আমেরিকা-ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন যায়নবাদী চক্র এবং উপমহাদেশে কুফরের ইমাম ভারত ও তাদের তাবেদার গোষ্ঠীর ব্যাপারেও জাতির সচেতনতা, সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে জোরদার প্রচেষ্টা জারি রাখতে হবে।

শায়খ আইমান আল মিসরি বলেন,

“দাওয়াতি কাজের মাকসাদ হচ্ছে, আগ্রাসী ক্রুসেডার (এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসী প্রশাসন) এর হুমকির বিষয়ে উম্মাহকে সচেতন করে তোলা, তাওহীদের সঠিক ব্যাখ্যা তাদের নিকট পরিষ্কার করে দেওয়া যে, বিধান প্রণয়ন এবং সার্বভৌমত্ব কেবল একমাত্র আল্লাহ তা’আলার-ই অধিকারভুক্ত। এবং ইসলামভিত্তিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সকল স্থানের মুসলিমদের ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা। আল্লাহর ইচ্ছায় এটা হবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পদ্ধতি অনুসারে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন। এ পর্যায়ে দাওয়াতি কর্মকাণ্ড দুটি স্তরে সম্পন্ন হবে, যার একটি হচ্ছে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, তাদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে এর ওপর ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কঠিন চেষ্টা করা, যেন তারা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধাচারণ করে ইসলামের পক্ষাবলম্বন করে এবং ইসলামের জন্য কাজ করে।”

সুতরাং, দাওয়াতি ও তরবিয়তি মেহনত চলবে প্রথমত জাতির উত্তম অংশটির মাঝে, যেন বিপ্লবের নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন তার উপযোগী লোক পেয়ে যায় এবং বিশুদ্ধ আন্দোলনের ধারা জারি রাখা সম্ভব হয়। এছাড়াও, জাতির মাঝে সুসংগঠিত দাওয়াতি ও তরবিয়তি মেহনত জারি রাখা প্রয়োজন হবে, যেন উপযোগী পরিস্থিতি ও উপকরণ সাপেক্ষে বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্বে জাতি ইসলামী বিপ্লবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারে।

যারা কেবল সামরিক শক্তির পেছনে সময় দেওয়ার মতো অপরিণামদর্শী মানহাজ আঁকড়ে ধরেছে; তাদেরকে বলা হবে, সামরিক উপাদান অন্যান্য উপাদানকে পূর্ণতা দিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পথ সুগম করে। অপূর্ণাঙ্গ মানহাজের আলোকে পথ চলে, নিজেদের সমাজে অপ্রাসঙ্গিক করে এবং স্থবিরতার শিকার হওয়ার ফলাফল জানার জন্য বিগত ত্রিশ বছরের ইসলামী সশস্ত্র আন্দোলনগুলোর ব্যর্থতার ইতিহাস অধ্যয়নই যথেষ্ট হবে।

আর যারা সব ধরনের সংঘাতের রাস্তা এড়িয়ে নরম, গৎবাঁধা ও আরামদায়ক মানহাজ আঁকড়ে ধরেছেন, তাদের জেনে রাখা উচিৎ, সংঘর্ষ ও আত্মত্যাগ অনিবার্য। জিহাদ, কুরবানি ও শাহাদাতের পথ ধরে-ই কেবল লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব।

যদি সংঘর্ষের আগেই শুধু দাওয়াহ ও ই’দাদের মাধ্যমে, তামকিন (কর্তৃত্ব) অর্জন হয়, তাহলে পরবর্তীতে দীর্ঘ ও তীব্র সংঘর্ষের প্রয়োজন হয়। যেমন, মদীনায় প্রয়োজন ছিল। আর যদি তীব্র সংঘর্ষের পর তামকিন আসে, সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে শুধুমাত্র দাওয়াহ ও ই’দাদ চলমান থাকাই যথেষ্ট হয়। যেমন, আফগানিস্তান।

তাই, ইসলামী শাসনব্যবস্থা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মারহালা হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের উচিৎ এক আল্লাহর দাসত্বের অপরিহার্যতার ভিত্তিতে সমাজে মেরুকরণ সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া। যেন সেক্যুলার কুফরি শাসনের অধীন থেকে মুসলিমদের অন্তত ঐ পরিমাণ অংশ তাওহীদের পতাকাতলে চলে আসে, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনে যাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এজন্য অবশ্যই ইসলামী আন্দোলনকে উপযোগী পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রতিবিধান, এমনকি প্রয়োজনে তীব্র ও সরাসরি সংঘাতের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। এই দুই স্তরেই নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) উত্তরসূরিদের আত্মত্যাগ ও সুউচ্চ হিম্মতের পাশাপাশি ঈমানী সংহতি ও ফিকরি পরিকপক্কতার প্রয়োজন পড়বে।

উস্তাদ আবুল আ’লা মওদুদির অনেক বিষয়ের সাথে একমত হবার সুযোগ নেই, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট। তবে উনার কিছু আলোচনা থেকে দিকনির্দেশনা লাভেরও প্রয়োজন রয়েছে। আধুনিক সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্র সংক্রান্ত কিছু সুন্দর এবং জরুরি আলোচনা তিনি করেছেন। যেহেতু বাংলাদেশ বর্তমানে একটি সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্র (nation-state), আর আমরা চাচ্ছি এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিলোপ করে ইসলামের শাসন ফিরিয়ে আনতে। তাই আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা সম্পর্কে ধারণা পেতে উস্তাদ মওদুদি (রহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য তুলে ধরছি—

“আমরা যে রাষ্ট্রকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ বলে আখ্যায়িত করেছি, তার প্রকৃত রূপটা কী? কী তার প্রকৃতি? কী তার ধরন? কী তার বৈশিষ্ট্য ও আসল পরিচয়? – তা আমাদের ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্য হলো, জাতীয়তাবাদের নামগন্ধও এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এ জিনিসটিই ইসলামী রাষ্ট্রকে অন্য সব ধরনের রাষ্ট্র থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। এ হচ্ছে নিছক একটি আদর্শিক রাষ্ট্র। এ ধরনের রাষ্ট্রকে আমি ইংরেজিতে ‘Ideological State’ বলব। এমন আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের সাথে মানুষ সবসময় পরিচিত ছিল না। আজও পৃথিবীতে এ-ধরনের কোনো আদর্শিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত নেই। প্রাচীনকালে মানুষ বংশীয় বা শ্রেণিগত রাষ্ট্রের সাথে পরিচিত ছিল। অতঃপর গোত্রীয় এবং জাতীয় রাষ্ট্রের সাথে পরিচিত হয়। এমন একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের কথা মানুষ তার সংকীর্ণ মানসিকতায় কখনো স্থান দেয়নি, যার আদর্শ গ্রহণ করে নিলে বংশ, গোত্র, জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার হয়ে যাবে।

খ্রিষ্টবাদ এর একটি অস্পষ্ট নকশা লাভ করেছিল। কিন্তু সেই পূর্ণাঙ্গ চিন্তাকাঠামো তারা লাভ করেনি, যার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফরাসি বিপ্লবে আদর্শিক রাষ্ট্রের একটি ক্ষীণ রশ্মি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল বটে, কিন্তু তা অচিরেই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের অন্ধগহ্বরে তলিয়ে যায়। কমিউনিজম আদর্শিক রাষ্ট্রের ধারণা বিশেষভাবে প্রচার করে। এমনকি এ মতবাদের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রের বুনিয়াদ স্থাপনেরও কোশেশ করে। এর ফলে বিশ্ববাসীর মনে আদর্শিক রাষ্ট্রের ক্ষীণ ধারণাও জন্ম নিতে থাকে। কিন্তু অবশেষে এর ধমনীতেও ঢুকে পড়ল জাতীয়তাবাদের যাবতীয় তীর্যক ভাবধারা। জাতীয়তাবাদ কমিউনিজমের আদর্শিক ধারণাকে ভাসিয়ে নিয়ে ডুবিয়ে দিল সমুদ্রের তলদেশে।

পৃথিবীর প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত একমাত্র ইসলামই হচ্ছে সেই আদর্শ নীতি, যা জাতীয়তাবাদের যাবতীয় সংকীর্ণ ভাবধারা থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিরেট আদর্শিক বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। আর একমাত্র ইসলামই হচ্ছে সেই মহান আদর্শ, যা গোটা মানবজাতিকে তার এই আদর্শ গ্রহণ করে অ-জাতীয়তাবাদী বিশ্বজনীন রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানায়।

বর্তমান বিশ্বে যেহেতু এমন একটি রাষ্ট্রের ধারণা অপরিচিত এবং যেহেতু বিশ্বের সবগুলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবস্থা এ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, তাই কেবল অমুসলিমরাই নয়, স্বয়ং মুসলমানরা পর্যন্ত এমন একটি রাষ্ট্র এবং এর অন্তর্নিহিত ভাবধারা (implications) অনুধাবন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। যারা মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছে বটে, কিন্তু সমাজব্যবস্থার ধারণা গ্রহণ করেছে পুরোপুরিভাবে ইউরোপীয় ইতিহাস, রাজনীতি, ও সমাজবিজ্ঞান (Social science) থেকে, তাদের মন-মস্তিষ্কে এ-ধরনের আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা কিছুতেই স্থান পায় না। উপমহাদেশের বাইরেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ যেসব দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেসব দেশেও এ-ধরনের লোকদের হাতেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এসেছে। জাতীয় রাষ্ট্র (National State) ছাড়া আর কোনো ধরনের রাষ্ট্রের কথা কল্পনাও করতে পারে না। কারণ, তাদের মন-মস্তিষ্ক তো ইসলামের জ্ঞান, চেতনা এবং আদর্শিক রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এই উপমহাদেশেও যারা সে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা লাভ করেছে, তারাও এ জটিল সমস্যায় জর্জরিত।

ইসলামী রাষ্ট্রের নাম মুখে এরা উচ্চারণ করে বটে, কিন্তু যে শিক্ষাদীক্ষায় বেচারাদের মস্তিষ্ক গঠিত হয়েছে, তা থেকে ঘুরে ফিরে কেবল সেই ‘জাতীয় রাষ্ট্রের’ চিত্রই বারবার তাদের সামনে ভেসে উঠে। জ্ঞানত কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ এরা কেবল জাতিপূজার (Nationalistic Ideology) বেড়াজালেই ফেঁসে যায়। তারা যে পরিকল্পনা ও কর্মসূচির কথাই চিন্তা করুক না কেন, তা করে থাকে জাতীয়তাবাদেরই ভাবধারার ভিত্তিতে। ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ গতানুগতিক ধারণা পোষণ করে।

তারা মনে করে, ‘মুসলমান’ নামের যে ‘জাতিটি’ রয়েছে, তার হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিংবা অন্তত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এলেই তা ইসলামী রাষ্ট্র হবে। আর এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা যতই চিন্তাভাবনা করে, অন্যান্য জাতির অবলম্বিত কর্মপন্থা ছাড়া নিজেদের সেই জাতিটির জন্য অন্য কোনো কর্মপন্থাই তাদের নজরে পড়ে না। এই ধারণাই তাদের মগজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, পৃথিবীর অন্যান্য জাতি যেসব উপায়-উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে, তারাও ওসব উপায়-উপাদানের সমন্বয়েই তাদের জাতিটিকে গঠন করবে। তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করে দেওয়া হবে। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সৃষ্টি করা হবে। জাতীয় গার্ডবাহিনী সংগঠিত করা হবে। গঠন করা হবে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী। যেখানে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, সেখানে গণতন্ত্রের স্বীকৃত নীতি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন’ (Majority Rule) এর ভিত্তিতে তাদের জাতীয় রাষ্ট্র সংগঠিত হবে। আর যেখানে তারা সংখ্যালঘু, সেখানে তাদের ‘অধিকার’ সংরক্ষিত হবে।

তারা মনে করে, তাদের স্বাতন্ত্র্য ঠিক সেভাবে সংরক্ষিত হওয়া উচিত, যেভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রতিটি সংখ্যালঘু জাতি (National Minority) নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে চায়। তারা চায়, শিক্ষা, চাকুরি এবং নির্বাচনী সংস্থাসমূহে নিজেদের কোটা নির্ধারিত হবে। নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরা নির্বাচন করবে; ইত্যাদি জাতীয়তাবাদী চিন্তা তাদের চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করে রেখেছে। এসব জাতীয়তাবাদী চিন্তা প্রকাশ করার সময় তারা উম্মাহ, জামাআত, মিল্লাত, আমীর, ইতায়াত প্রভৃতি ইসলামী পরিভাষাই মুখে উচ্চারণ করে। কিন্তু এই শব্দগুলো তাদের কাছে জাতীয় ধর্মবাদের জন্যে ব্যবহৃত শব্দাবলিরই সমার্থক। সৌভাগ্যবশতঃ তারা এ শব্দগুলো পুরোনো ভান্ডারে তৈরি করাই পেয়ে গেছে এবং এগুলো দিয়ে তাম্রমুদ্রার ওপর স্বর্ণমুদ্রার মোহরাংকিত করার সুবিধে পাচ্ছে।

আপনারা যদি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের সঠিক পরিচয় উপলব্ধি করে নিতে পারেন, তাহলে এ কথাটি বুঝতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে না যে, এ-ধরনের জাতীয়তাবাদী চিন্তাপদ্ধতি, কার্যসূচি তো দূরের কথা, বরঞ্চ এ মহান কাজের সূচনাই হতে পারে না। সত্য কথা বলতে কী, জাতীয়তাবাদের প্রতিটি অঙ্গ একেকটি তীক্ষ্মধার কুঠারের মতো, যা আদর্শিক রাষ্ট্রের মূলে কুঠারাঘাত করে, তাকে বিনাশ করে দেয়।

আদর্শবাদী রাষ্ট্র যে ধারণা (idea) পেশ করে, তার মূলকথাই হচ্ছে, আমাদের সামনে ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তাবাদের’ কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের সামনে রয়েছে শুধু মানুষ বা মানবজাতি। তাদের কাছে আমরা এক মহান আদর্শ এ উদ্দেশ্যে পেশ ও প্রচার করব যে, এ আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠিত ও প্রতিষ্ঠিত হবার মধ্যেই তাদের সকলের কল্যাণ ও সাফল্য নিহিত রয়েছে। এই আদর্শ গ্রহণকারী সকল মানুষ ঐ আদর্শিক রাষ্ট্রটি পরিচালনায় সমান অংশীদার।

এবার একটু চিন্তা করে দেখুন, যে ব্যক্তির মনমগজ, ভাষা-বক্তব্য, কাজকর্ম, তৎপরতা প্রভৃতি প্রতিটি জিনিসের ওপর সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও জাতিপূজা মোহরাংকিত হয়ে আছে, সে কী করে এই মহান বিশ্বজনীন আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে সক্ষম হবে? সংকীর্ণ জাতিপূজায় অন্ধ বিভোর হয়ে সে নিজের হাতেই তো বিশ্বমানবতাকে আহ্বান জানাবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথম কদমেই তো সে নিজের পজিশনকে ভ্রান্তির বেড়াজালে নিমজ্জিত করেছে। বিশ্বের যেসব জাতি জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে আছে, জাতিপূজা এবং জাতীয় রাষ্ট্রই যাদের সমস্ত ঝগড়া লড়াইয়ের মূল কারণ, তাদের পক্ষে বিশ্বমানবতাকে কল্যাণের আদর্শের প্রতি আহ্বান করা সম্ভব নয়। যারা নিজেদের জাতীয় রাষ্ট্র এবং নিজ জাতির অধিকারের জন্যে ঝগড়ায় নিমজ্জিত, তারা কি বিশ্বমানবতার কল্যাণের কথা চিন্তা করতে পারে? লোকদেরকে মামলাবাজী থেকে ফেরানোর আন্দোলন আদালতে মামলা দায়ের করার মাধ্যমে আরম্ভ করা কি যুক্তিসংগত কাজ হতে পারে?

ইসলামী রাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, তার গোটা অট্টালিকা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ধারণার মূলকথা হলো, বিশ্ব সাম্রাজ্য আল্লাহর। তিনিই এ বিশ্বের সার্বভৌম শাসক। কোনো ব্যক্তি, বংশ, শ্রেণি, জাতি, এমনকি গোটা মানবজাতিরও সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। আইনপ্রণয়ন এবং নির্দেশ দানের অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।

(…) এই শাসন পরিচালনার কাজে এমন সব লোকই অংশীদার হবে, যারা এই আইন ও বিধানের প্রতি ঈমান আনবে এবং তা অনুসরণ ও কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। তাদেরকে এরূপ স্থায়ী অনুভূতির সাথে এ মহান কাজ পরিচালনা করতে হবে যে, সামষ্টিকভাবে আমাদের সকলকে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেককে এর জন্য সেই মহান আল্লাহ তা’আলার সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে, গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই যার অবগতিতে রয়েছে। যার জ্ঞানের বাইরে কোনোকিছুই নেই।

এই চিন্তা প্রতিটি মুহূর্তে তাদের এ অনুভূতিকে জাগ্রত রাখবে যে, মানুষের ওপর নিজেদের হুকুম ও কর্তৃত্ব চালানোর জন্য, জনগণকে নিজেদের গোলাম বানানোর জন্য, তাদেরকে নিজেদের সম্মুখে মাথা নত করতে বাধ্য করার জন্য, তাদের থেকে ট্যাক্স আদায় করে নিজেদের জন্য বিলাসবহুল আট্টালিকা নির্মাণ করার জন্য, আর স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিলাসিতা, আত্মপূজা এবং হঠকারিতার সামগ্রী পূঞ্জিভূত করার জন্য আমাদের ওপর খিলাফতের এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়নি। বরঞ্চ এই বিরাট দায়িত্ব আমাদের ওপর এই জন্য অর্পিত হয়েছে, যেন আমরা আল্লাহর বান্দাদের ওপর তাঁরই দেওয়া ইনসাফভিত্তিক আইন ও বিধান কার্যকর করি এবং নিজেরা নিজেদের জীবনে তা পুরোপুরি অনুসরণ ও কার্যকর করি। এই বিধানের অনুসরণ এবং তা কার্যকর করার ব্যাপারে আমরা যদি বিন্দুমাত্র ত্রুটি করি, এ কাজে যদি অণু পরিমাণ স্বার্থপরতা, স্বেচ্ছাচারিতা, বিদ্বেষ, পক্ষপাতিত্ব, কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার অনুপ্রবেশ ঘটাই, তাহলে আল্লাহর আদালতে এর শাস্তি অবশ্যই আমাদেরকে ভোগ করতে হবে, দুনিয়ার জীবনে শাস্তি ভোগ থেকে যতই মুক্ত থাকি না কেন।

এই মহান আদর্শের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় অট্টালিকা তার মূল ও কাণ্ড থেকে আরম্ভ করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে ধর্মহীন রাষ্ট্র (Secular States) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়ে থাকে। তার গঠনপ্রক্রিয়া, স্বভাব-প্রকৃতি সবকিছুই সেক্যুলার রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ ধরনের মানসিকতা। এক স্বাতন্ত্রধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এক অনুপম কর্মনৈপূণ্য। এ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, কোর্ট কাচারি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, আইন-কানুন, কর ও খাজনা পরিচালনা পদ্ধতি, পররাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ, সন্ধি প্রভৃতি সব বিষয়ই ধর্মহীন রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ইসলামী রাষ্ট্রের কেরানি, এমনকি চাপরাশি হবারও যোগ্য নয়।

মোটকথা, ধর্মহীন সেক্যুলার রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী করে যেসব লোক তৈরি করা হয়েছে এবং সে ধরনের রাষ্ট্রের স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ অযোগ্য। ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের প্রতিটি বিভাগ, পরিচালনা যন্ত্রের প্রতিটি অংশ সম্পূর্ণ নতুনভাবে নিজস্ব আদর্শের ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে।

এ রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন এমন সব লোকের, যাদের অন্তরে রয়েছে আল্লাহর ভয়। যারা আল্লাহর সম্মুখে নিজেদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে বলে তীব্র অনুভূতি রাখে। যারা দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়। যাদের দৃষ্টিতে নৈতিক লাভ-ক্ষতি পার্থিব লাভ-ক্ষতির চাইতে অধিক মূল্যবান। যারা সর্বাবস্থায় সেইসব আইন-কানুন, নিয়মনীতি ও কর্মপন্থার অনুসরণ করবে, যা তাদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত হয়েছে। তাদের যাবতীয় চেষ্টা-তৎপরতার একমাত্র লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ব্যক্তিগত আর জাতিগত স্বার্থের দাসত্ব আর কামনা-বাসনার গোলামির জিঞ্জির থেকে তাদের গর্দান হবে সম্পূর্ণ মুক্ত। হিংসা-বিদ্বেষ আর দৃষ্টির সংকীর্ণতা থেকে তাদের মন-মানসিকতা সম্পূর্ণ পবিত্র। ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার নেশায় যারা উন্মাদ হবার নয়। ধনদৌলতের লালসা আর ক্ষমতার লিপ্সায় যারা কাতর হবার নয়।

এইরূপ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এমন নৈতিক বলিষ্ঠতার অধিকারী একদল লোক প্রয়োজন, পৃথিবীর ধনভান্ডার হস্তগত হলেও, যারা নিখাদ আমানতদার প্রমাণিত হবে। ক্ষমতা হস্তগত হলে জনগণের কল্যাণচিন্তায় যারা বিনিদ্র রজনী কাটাবে। আর জনগণও যাদের সুতীব্র দায়িত্বানুভূতিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণাধীনে নিজেদের জানমাল, ইজ্জত-আবরুসহ যাবতীয় ব্যাপারে থাকবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন।

ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এমন একদল লোকের, যারা কোনো দেশে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলে সেখানকার লোকেরা গণহত্যা, জনপদের ধ্বংসলীলা, জুলুম-নির্যাতন, গুণ্ডামি-বদমায়েশী এবং ব্যভিচারের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হবে না। বরঞ্চ বিজিত দেশের অধিবাসীরা এদের প্রতিটি সিপাহীকে পাবে তাদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু ও নারীদের সতীত্বের পূর্ণ হিফাজতকারী।

এ-ধরনের এবং কেবলমাত্র এ-ধরনের লোকদের দ্বারাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কেবলমাত্র এরূপ লোকেরাই ইসলামী হুকুমত পরিচালনা করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে বস্তুবাদী স্বার্থান্বেষী (Utilitarian Mentality) লোকদের দ্বারা কিছুতেই একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হতে পারে না। 

বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এরূপ লোকদের অস্তিত্ব অট্টালিকার অভ্যন্তরে উইপোকার অস্তিত্বের মতোই বিপজ্জনক। এরা পার্থিব স্বার্থ এবং ব্যক্তি ও জাতির স্বার্থে নিত্যনতুন নীতিমালা তৈরি করে। এদের মগজে না আছে আল্লাহর ভয়, না পরকালের। বরঞ্চ তাদের সমগ্র চেষ্টা-তৎপরতার এবং নিত্যনতুন পলিসির মূলকথা হচ্ছে কেবলমাত্র পার্থিব লাভ লোকসানের ‘ধান্দা’।”

এখন, বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণের আলোকে এ জমিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দিকটি দেখা প্রয়োজন। 

তীব্র সংঘাত ছাড়া ইসলাম ও কুফরের দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না। তবে মানুষের সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, মিথ্যার বিরুদ্ধে তীব্র ও শক্তিশালী অবস্থানের ভিত্তিতে যোগ্য, আত্মত্যাগী, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সংগঠিত শক্তির ধারাবাহিক ও যথাযথ আন্দোলন-সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্ন সংঘাত-সহিংসতা চূড়ান্ত ফলাফল এনে দেবে না। তাই এ পথ কোনো ত্বরাপ্রবণ, অতি আবেগীর পথ নয়। তাওহীদের আক্বীদাহ, নববী সুন্নাহ ও সালাফদের মানহাজের ওপর প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও অনুসারীদের সমন্বয়ে অগ্রসরমান সংগঠন ব্যতীত দ্বীন কায়েমের আশা করা ভুল। ধারাবাহিক দাওয়াহ, তারবিয়াহ, সংগ্রাম ও সংশোধনের পথ ধরেই আদর্শিক দৃঢ়তা, বৈপ্লবিক চেতনা ও রাজনৈতিক জ্ঞান-প্রজ্ঞা অর্জনে সক্ষম সংগঠিত শক্তি গড়ে ওঠে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্রেফ ক্ষমতা, অর্থ ও প্রতিপত্তি কামানোকে উদ্দেশ্য বানানো সুস্থ চিন্তার কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব না। একজন মুসলিমের জন্য তো নয়ই। আমরা মুসলিমরা আমাদের আদর্শকে বিজয়ী দেখতে চাই। শাসক হবার উদগ্র বাসনার চেয়ে, শরীয়াহ দ্বারা শাসিত হবার আগ্রহই আমাদের বেশি। অর্থাৎ, কেবল ক্ষমতা ও ব্যবস্থার পালাবদল নিজেদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হতে পারে না। বরং যেহেতু সফল বিপ্লব ব্যতীত মানুষ ও সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তন সম্ভব না, সেহেতু আমরা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার কথা বলছি মাধ্যম হিসেবে।


বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ

ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে, রাষ্ট্র একটি জাগতিক বিষয়, যা সর্বজনীন। পার্থক্য শুধু মূল্যবোধের। একটি ইসলামী রাষ্ট্র ইসলামী শরীয়াহ’র ভিত্তিতে পরিচালিত, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কমিউনিজমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও সুনির্দিষ্ট। আর শরীয়াহ সেদিকেই আহ্বান করে, যাতে আছে দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ ও মর্যাদা। (জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, কাঠামো এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার ধারণা ও কাঠামোর মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষা করে বলা হয়নি।)

তাই, বাস্তবতা উপলব্ধি করে শরীয়াহ’র পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান অন্যদের তুলনায় সহজ ও দ্রুততমভাবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। কেননা, মুসলিমদের সাথে রয়েছে আল্লাহ তা’আলার তাওফিক, ওয়াদা ও সাহায্য। আরও রয়েছে সর্বোত্তম পথনির্দেশ—কুরআন ও সুন্নাহ।

এটাও ইতোমধ্যেই স্পষ্ট যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে আদর্শিক বিপ্লব অপরিহার্য। ইতিহাসের আলোকে আদর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন বিপ্লবের কয়েকটি স্তর অতিক্রম করতেই হয় মর্মে আমরা দেখতে পাই। কাঙ্ক্ষিত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রূপরেখার ব্যাপারে একটি ধারণা আমরা এভাবে দেখতে পারি—

১. আদর্শিক দাওয়াহ’র আত্মপ্রকাশ। যা বিপ্লবের বয়ান হাজির করা এবং বিপ্লবী আদর্শ ধারণকারী অগ্রগামী ব্যক্তিদের (যাদের অন্তরে দ্বীনের বুঝ ও চেতনা প্রবেশ করেছে। যারা আত্মত্যাগী, দূরদর্শী, জ্ঞানী) সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। (মাক্কী যুগের প্রথম তিন, মতান্তরে চার বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন দাওয়াহ-তারবিয়াহ’র স্তরে দেখা যায়।)

২. বিপ্লবী সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে সমাজে আদর্শিক দাওয়াহর ব্যাপক প্রচার-প্রসার। এক্ষেত্রে তারা শত প্রলোভন ও বাধার মুখেও সমাজে আদর্শের মূর্তরূপ হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় ও বিকশিত হতে থাকে। (যা মাক্কী যুগের বাকি সময়ে দেখা গিয়েছে, বাইয়াতে আক্বাবার আগ পর্যন্ত।)

৩. বৈপ্লবিক সংগঠিত শক্তির ধারাবাহিক আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের ফলে সমাজে আদর্শিক মেরুকরণ সম্পন্ন করা হয়। যা সম্পন্ন হবে আত্মত্যাগী, দৃঢ় ও শক্তিশালী দাওয়াহ ও সাংগঠনিক মেহনতের মাধ্যমে। 

আমাদের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, সেক্যুলার রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে বিপ্লবী শক্তির নেতৃত্বে থাকা ইসলামপন্থীদের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হওয়া। 

৪. মেরুকরণ সম্পন্ন হবার পর বিপ্লবী পরিস্থিতি প্রস্তুতে কর্মসূচি তীব্রতর করা, যেন পূর্বতন ব্যবস্থার প্রতিস্থাপনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। এবং পরিস্থিতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী তীব্র সংঘাতের পথ মাড়িয়ে পূর্বতন শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা।

৫. শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপন পরবর্তী কার্যক্রম। এই স্তরটিই সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে। যে স্তরের জন্যই মূলত পূর্ববর্তী স্তরগুলোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। 

(মদীনায় খন্দকের যুদ্ধ শেষ হওয়া অবধি এই স্তর ছিল)। যে স্তরেই সাধারণত আপস বা ব্যর্থতা বিপ্লবকে নস্যাৎ করে দেয়।

৬. ক্রমাগত শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি করা। সভ্যতাগত উপাদানগুলো সক্রিয় ও ব্যাপক করা। (সাহাবাদের জীবনের আলোকে যা আমরা দেখি ক্রমান্বয়ে মক্কা বিজয়, পারস্য, রোম, সিরিয়া, স্পেন বিজয়ের মাধ্যমে সুসংহত হওয়ার মাধ্যমে।)

কাঙ্ক্ষিত বৈপ্লবিক আন্দোলনকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে কীভাবে আমরা বুঝব? সহজভাবে বৈপ্লবিক আন্দোলনকে চার স্তরে বিন্যস্ত করা যায়।

    ১.  মেরুকরণ (Polarisation): 

সাম্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী শক্তির তাবেদার সেক্যুলার শাসনব্যবস্থা ও তার সর্বব্যাপী জুলুমের বিরুদ্ধে মেরুকরণ তৈরিতে কাজ করতে হবে। এবং বিপ্লবের উপযুক্ত নেতৃত্ব ও সংগঠিত শক্তির বিকাশ ঘটতে হবে। আর এমনটা গণমানুষকে সঠিক ইসলামী দাওয়াহ ও ন্যারেটিভের আলোকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। আর রাজনৈতিক মেরুকরণ সম্পন্ন করার পূর্বশর্ত হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলিমদের সামজিকভাবে আধিপত্য অর্জন। 

বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে বলতে গেলে, ‘৭১ এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট তৈরিতে ‘৬০ এর দশকে (৬২-৭০) স্বাধীকার আন্দোলন বড় ভূমিকা রেখেছিল।

    ২. তীব্রতাবৃদ্ধি (Escalation):

শাসকগোষ্ঠী ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হলে আন্দোলনের দাবি ও প্রকৃতিকে তীব্র করে তোলা। সাধারণত এমন অবস্থায় জনবিচ্ছিন্ন শাসকগোষ্ঠী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে থাকে। এমতাবস্থায় জনরোষ প্রচণ্ড হয়ে উঠতে থাকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। 

    ৩. অভ্যুত্থান (Upheaval):

আন্দোলন তীব্রতা বৃদ্ধির চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গেলে, জালিম শাসকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সম্পন্ন হবে; তখন তাদের মাঝে থাকা বিপ্লবীদের নেতৃত্বে জনমানুষকে সাথে নিয়ে বিপ্লবী শাসনব্যবস্থা কায়েম হবে। যেমন, আরব বসন্তে মিশর ও তিউনিসিয়াতে দেখা গেছে। বা ‘৯০ এর এরশাদবিরোধী অভ্যুত্থানে দেখা গেছে। যদিও এই অভ্যুত্থানগুলো বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বিপ্লবে পরিণত হয়নি। 

তবে শাসকগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াসাপেক্ষে অরাজকতা ও দীর্ঘ লড়াইয়ের দিকেও পরিস্থিতি যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘ লড়াই ও জনযুদ্ধের মাধ্যমেই অভ্যুত্থান সম্পন্ন হবে।

    ৪. প্রতিষ্ঠালাভ (Consolidation):

অভ্যুত্থান-পরবর্তী অরাজক অবস্থার যথাযথ ব্যবস্থাপনা, পূর্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলোপ ঘটিয়ে নতুন বিপ্লবী সরকার গঠন ও ক্ষমতা সুসংহতকরণ। এক্ষেত্রেই সাধারণত দুর্বলতা দেখা যায় এবং অভ্যুত্থান আর বিপ্লবে পরিণত হতে পারে না।

বিপ্লবের সফলতা ও ব্যর্থতার অনেক কিছুই নির্ভর করে ‘মেরুকরণ’ স্তরে সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক বিপ্লবী মেহনতের ওপর। এই স্তর বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে কষ্টকর ও দীর্ঘায়িত স্তর। এ স্তরে ধারাবাহিক ও ক্রমবিকশিত কর্মসূচির মাধ্যমে আদর্শিক, রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী সংগঠন ও নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। এবং এই স্তরেই জনসাধারণের চিন্তার জগতে বিপ্লবের বীজ বপন করা হয়। এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা অন্য কোনো সময় করা যাবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে। এটি এমন একটি মূলনীতি, যে ব্যাপারে মাও সে তুং ও চে গুয়েভারা উভয়েই একমত—

“The matters on which they agree are: The population as the key to victory, the importance of politics, and the importance of context when developing strategy.”

“যে বিষয়গুলোতে তাদের (মাও ও চে) মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে তা হলো: জনগণ বিজয়ের মূল চাবিকাঠি, রাজনীতির গুরুত্ব এবং কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নেয়ার গুরুত্ব।”

আসলে, পরিবর্তনের লক্ষ্যে জনসমর্থন আদায় সম্ভব হলে জনসাধারণ, আমলাতন্ত্রের (সামরিক/বেসামরিক) তুলনামূলক উন্নত অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এগিয়ে আসে এবং বিপ্লবে নিয়ামক ভূমিকা রাখে। এ পরিস্থিতি উপস্থিত হবার আগে ক্রমান্বয়ে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। প্রধান দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে মেরুকরণকে প্রাথমিক লক্ষ্য সাব্যস্ত করে বিপ্লবী আন্দোলন এগোতে হবে সঠিক, যোগ্য নেতৃত্ব ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে। এজন্যই ইসলামপন্থীদের জন্য মেরুকরণ ও সংগঠন প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই সর্বাগ্রে করণীয়।

শায়খ সালাহউদ্দিন জায়দান বলেন,

“বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য অবশ্যই যোগ্য নেতৃত্ব, সংগঠিত সংগঠন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ আত্মরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর এই মৌলিক উপকরণটির অভাবের কারণেই আরব বিপ্লব রাষ্ট্রীয় শোষণের নিচে চাপা পড়ে যায় এবং জনসাধারণের আশা নিরাশায় পরিণত হয়।”

আমরা ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে দেখতে পাই, সমাজে বিদ্যমান বিরোধ বা দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবেই বৈপ্লবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট অনিবার্য করে তোলে। 

ব্যবহারিক রাজনীতির আলোকে বলতে গেলে, বিপ্লবের পরিণতি লাভের প্রশ্নকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—

✓ Objective Condition: বিপ্লবের Objective Condition বলতে এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যা বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করে—স্রেফ ব্যক্তি বা কোনো দলের ইচ্ছা দিয়ে এগুলো সরাসরি তৈরি হয় না। যা নানা রকম বিচ্ছিন্ন ও স্বতঃস্ফূর্ত আর্থ-সামাজিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। 

✓ Subjective Condition: অপর দিক হচ্ছে, রাজনৈতিক চেতনা ও সাংগঠনিক শক্তির বাস্তবতা (Subjective Condition)। অর্থাৎ, বৈপ্লবিক শক্তির সক্ষমতা পরিমাপের আলোকে নির্ধারিত অবস্থা। বিপ্লবী আদর্শ, লক্ষ্য ও পরিকল্পনার আলোকে গড়ে ওঠা সংগঠিত শক্তির জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হওয়া বিপ্লবী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লব সম্পন্ন করার সক্ষমতার শর্তকে বলা হয় Subjective Condition।

অর্থাৎ, বিপ্লবের উপযোগী পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই নয়, বরং বিপ্লবী শ্রেণির আদর্শিক-রাজনৈতিক চেতনা এবং সংগঠন কর্তৃক বিপ্লব সম্পাদনের সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে। বিপ্লবীরা কি অভ্যুত্থানের পর যথাযথ সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি গ্রহণের (প্রতিবিপ্লব প্রতিহত করা, অরাজকতা দূরীকরণ এবং সমাজকে সম্পৃক্ত করে বিপ্লবী আদর্শের আলোকে রাষ্ট্রগঠন) মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম কিনা, তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শাসকগোষ্ঠীর মধ্যকার বিভাজন, ব্যাপক গণঅসন্তোষ, মানুষের মাঝে পরিবর্তনের আকাঙ্খা (Objective condition) থাকলেও, যদি কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি না থাকে, নেতৃত্ব দুর্বল হয় এবং জনগণকে সংগঠিত করা না যায়, তাহলে বিপ্লব না-ও ঘটতে পারে।

অন্যদিকে, শক্তিশালী বিপ্লবী দল, দক্ষ নেতৃত্ব ও সংগঠন (Subjective Condition) থাকলেও যদি সমাজে গভীর সংকট বা ব্যাপক গণঅসন্তোষ না থাকে, তাহলেও বিপ্লব ঘটানো অত্যন্ত কঠিন।

উদাহরণত, আরব বসন্ত বা  আমাদের দেশের ১৯৬৯ ও ১৯৯০ এর গণআন্দোলনে বিপ্লবী চেতনা, বিপ্লবী সংগঠন  ও পরিকল্পনা ছিল না। তাই শুধু অভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়েছে, বিপ্লবী লক্ষ্য হাসিল হয়নি।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্য না থাকলেও উলামায়ে কেরাম, দাঈদের মেহনত নিঃসন্দেহে বিপ্লবের Objective Condition কে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু বিপ্লবী আদর্শ, তত্ত্ব ও চেতনার আলোকে বিকশিত সক্ষম সংগঠিত শক্তি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয় ব্যতীত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কখনোই আসার নয়।

সহজভাবে বুঝতে—

“In short, in order for a revolutionary situation to turn into a revolution that will replace the old system, the subjective factor must be ripe enough. In other words, there must be correct leadership and the revolutionary class must have a sufficient level of political consciousness and organization.”

“সংক্ষেপে, একটি বিপ্লবী পরিস্থিতিকে এমন একটি বিপ্লবে রূপ নিতে হলে - যা পুরোনো ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করবে - বিপ্লবের সাংগঠনিক (subjective) উপাদানটিকেও যথেষ্ট পরিণত হতে হবে। অর্থাৎ, সঠিক নেতৃত্ব থাকতে হবে এবং বিপ্লবী শ্রেণির রাজনৈতিক চেতনা ও সংগঠনের মাত্রা যথেষ্ট উন্নত হতে হবে।”


বিপ্লবের উপযোগী পরিস্থিতি কখন হাজির হবে? অর্থাৎ, বিপ্লবের  Objective Condition ও Subjective Condition উভয়ই উপস্থিত হবার আলামত কী? 

লেনিনের বক্তব্য অনুযায়ী বিপ্লবী পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে আমাদের মতো করে সাজালে যা পাওয়া যায়ঃ

ক. নিপীড়িত জনগণ যখন পুরাতন কায়দায় জীবনযাপন অসম্ভব মনে করবে। 

খ. শাসকেরা আর পুরাতন কায়দায় তাদের শাসন চালাতে সক্ষম হবে না। 

গ. সুবিধাবাদ ও সামাজিক উগ্র-জাতিবাদকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্থ করে, ইসলামপন্থীদের অগ্রবাহিনী, বিভিন্ন শক্তির কেন্দ্র ও ধারাসমূহকে আদর্শগতভাবে প্রস্তুত হতে হবে।

ঘ. অবস্থা এমন যে, বিপ্লবী অগ্রবাহিনীর সমর্থনে ইসলামপন্থী শ্রেণি ও জনসাধারণ এগিয়ে আসবে এবং সমাজের মূখ্য স্টেকহোল্ডাররা (সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি) বিপ্লবকে মেনে নেবে, সক্রিয় বিরোধিতা বা প্রতিহত করতে আসবে না।

ঙ. জনগণকে এই নতুন অবস্থানে টেনে আনার জন্য অগ্রবাহিনীর মধ্যে ইসলামপন্থীদের তত্ত্ববাগিশতা এবং তার ভুলত্রুটিসমূহকে নির্মূল ও দূরীভূত হতে হবে।

চ. তোতাপাখির মতো করে আবৃত্তি ও পুনরাবৃত্তি করা ‘বিক্ষুব্ধ’ রাজনৈতিক/কৌশলগত রেটোরিক শুনে শুধু নয়, নিজেদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত বোধের আলোকে জনগণকে উপলব্ধি করানো হবে—“বিপ্লব কেন প্রয়োজন এবং কেন তারা বিপ্লবের ক্ষেত্রে বিপ্লবী শ্রেণির এই অগ্রবাহিনীকে সমর্থন করবেন।”

ছ. বিপ্লবের বিরুদ্ধে যে শক্তিসমূহ আছে, সেই সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লবী শক্তিসমূহের (যেমন, সামরিক বাহিনীর ইসলামবিরোধী ও দেশবিরোধী অংশ, পশ্চিমা বা ভারতীয় চিন্তায় প্রভাবিত লিবারেল রাজনৈতিক দলসমূহ, যারা ইসলামপন্থীদের মেহনত ও কুরবানির ফল নিজেদের ঘরে তুলতে চাইবে) নিজেদের মধ্যে বিপ্লব প্রশ্নে এমন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে, যার কোনো মীমাংসার পথ থাকবে না এবং যার ফলে তারা নিজেরা দুর্বল হয়ে পড়বে। বিপ্লবকে মেনে নেওয়ার বিকল্প তাদের থাকবে না।

জ. সেক্যুলার শাসকগোষ্ঠী ছাড়াও সমস্ত দোদুল্যমান এবং অদৃঢ়, শিথিলপন্থী সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহ (যেমন—জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মতো দল, মিডিয়া, একাডেমিয়া ইত্যাদি) নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার মাধ্যমে জনগণের চোখে যথেষ্ট পরিমাণে উলঙ্গ, খেলো এবং মর্যাদাহীন হয়ে পড়বে। 

ঝ. ব্যাপকভাবে বিপ্লবী শ্রেণির মধ্যে দৃঢ়, সাহসী এবং একনিষ্ঠ বিপ্লবী সংগ্রামের একটা চেতনার দ্রুত বিকাশ ও বৃদ্ধি ঘটবে। লেনিনের মতে, 

“উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হওয়ার ফলে যে বিপ্লবী পরিস্থিতি (Objective Condition) সৃষ্টি হবে, সেই পরিস্থিতিতে সামগ্রিক অবস্থাকে (Subjective Condition) যথাযথভাবে পরিমাপ করে চূড়ান্ত সংগ্রামের সঠিক মুহূর্তটি যদি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়, একমাত্র তাহলেই সাফল্য অর্জিত হবে, অর্থাৎ বিপ্লব ঘটবে, অন্যথায় নয়।” 

ঞ. মুসলিমদের অনুসরণীয় উলামায়ে কেরাম, তালিবুল ইলম, দাঈসহ সকল ইসলামপন্থীদের ও ইসলামি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে (সর্বোপরি জনসাধারণকে) বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং তার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিই যেন তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে, সেটা খেয়াল রাখা গেলে তা অর্জন করা তুলনামূলক সহজ হবে।

ট. শাসক শ্রেণিকে এমন একটি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়তে হবে, যা জনগণের সব থেকে পশ্চাৎপদ অংশকেও রাজনীতিতে টেনে আনবে, সরকারকে দুর্বল করবে এবং বিপ্লবীদের দ্বারা তার দ্রুত উচ্ছেদকে সম্ভব করবে।

অল্প কথায় সহজভাবে বললে, বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য থাকতে হবে চতুর্বিধ শর্তঃ

ক. শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ সংকট, 

খ. তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারানো, 

গ. জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ,

ঘ. সমগ্র জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী বিপ্লবী রাজনৈতিক দল, সে দলের সক্রিয়তা ও নেতৃত্ব। যে দলের শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলই নয়, তাকে টিকিয়ে রাখা ও আরও অগ্রসর করে নেওয়ার মতো যথেষ্ট নীতিমালা ও কর্মকৌশল প্রণয়নে সক্ষমতা রয়েছে।

এখন, আমাদের চারপাশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনপ্রক্রিয়া, আভ্যন্তরীণ কাঠামো, রাজনৈতিক লাইন ও আদর্শিক তারবিয়াহ’র বাস্তবতা সকলের সামনেই রয়েছে। তাই শুধুমাত্র আক্বীদাহ-মানহাজের সাধারণ বুঝকে সামনে রেখে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের দিকে তাকিয়ে থেকে চূড়ান্ত সফলতার কাছাকাছি দলগুলোর পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় কেন, তা আশা করি যে কেউ উপলব্ধি করবেন। আর গণতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতির মাধ্যমে ইসলামী পরিবর্তন যে অসম্ভব, তা ইসলাম, গণতন্ত্র, সংসদীয় রাজনীতি ও বিপ্লবের ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা রাখা ব্যক্তিমাত্রই জানে।

আমি বলতে চাচ্ছি, ১৯৭১ এর মতো রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধ বা ১৯৬৯ বা ‘৯০ এর মতো গণঅভ্যুত্থান সত্ত্বেও- এদেশে সাধারণ গণতান্ত্রিক বিপ্লবই সফল হয়নি। আর এমনটাই হবার ছিল। কেননা, বিপ্লবী সংগঠন, আদর্শকে সামনে রেখে প্রধান দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে রাজনৈতিক মেরুকরণে নের্তৃত্ব প্রদানে সক্ষমতা ব্যতীত স্রেফ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে তাকিয়ে থাকা- মানুষের আত্মত্যাগই নিশ্চিত করবে কেবল। বিশেষ আর কিছু অর্জন হবে না।

বদরুদ্দীন উমর লিখেন,

“জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর নির্ভর করে যে রাজনীতি গড়ে ওঠে, তার দ্বারা জনগণের মুক্তি আসতে পারে না—এ কথার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই অথবা তাকে কোনো প্রকারেই কাজে লাগানো যায় না। মোটেই তা নয়। উপরন্তু জনগণের এই বিক্ষোভ জনগণ কর্তৃক শাসকদলের পরিবর্তন কামনা সমাজে যে বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, সে পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সত্যিকারের কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চিন্তা ও প্রচেষ্টা কোনো সমাজেই সম্ভব নয়।

স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক আন্দোলনে স্বল্পকালের জন্য জনগণ একটা উত্তাল তরঙ্গের মতো সমাজে ভেসে উঠলেও, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠনের অভাবে তারা নিজেদের শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে পারেন না। তাদের ক্ষমতা হয় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এজন্য তাদের ক্ষণস্থায়ী বিক্ষোভ আন্দোলনের পর যারা ক্ষমতায় আসেন, তারা জনগণের কেউ নন। নিজেদের শ্রেণিস্বার্থেই কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত জনগণকে তারা প্রয়োজন ও সুযোগমতো শাসন ও শোষণ করেন।”

আদর্শিক চেতনা, গণভিত্তি ও সাংগঠনিক শক্তি প্রতিটিই সফল বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য অনিবার্য। যেকোনো একদিকে হেলে পড়ে শতসহস্র বছরের মেহনত আমাদের ফলাফল দেবে না। আন্তরিকতা বা আত্মত্যাগের  পরিমাণ যেমনই হোক না কেন। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

আর সবশেষে যা না বললেই নয়, দ্বীনি বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জনে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ, সুনির্দিষ্ট মানহাজ ও পরিকল্পনার আলোকে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অগ্রসর হওয়া জরুরি।



(২)

শারঈ ও সার্বজনীন মূলনীতির আলোকে অগ্রগামী জামাআতের নেতৃত্বে সুসংগঠিত মেহনত, বৈপ্লবিক কর্মসূচি পরিচালিত হতে হবে জাতির ওপর চেপে বসা সেক্যুলার কুফরি শাসনের আধিপত্য অপসারণ এবং জাতির মাঝে তাওহীদী চেতনা ব্যাপক করার লক্ষ্যে। হকের অনুসারীদেরকে কুফরি শাসনের পতন হোক বা না হোক, সমাজে নববি দাওয়াহ, তাওহীদের চেতনাকে প্রবল করতে ভূমিকা রেখে যেতে যাবে... যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলার সাথে মিলিত হওয়ার সময় আসে!

উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নিজস্ব দাবি দ্বারা, অথবা নিছক কোনো নাম ও পরিভাষার সাথে সংশ্লিষ্টতা থেকে কোনোকিছু সাব্যস্ত হয় না। বরং, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা হবে দাওয়াত ও মেহনতের বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানহাজ।

সঠিক বিপ্লবী সংগঠনই আমাদের জাতির আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক পদস্খলনগুলো বুঝার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে এবং এমন এক ভবিষ্যৎ সময়ের চিন্তা লালন করে, যার নেতৃত্ব দেবে ইসলাম।

এ কারণে বিপ্লবী সংগঠনের জন্য আদৌ গ্রহণযোগ্য নয় যে, তারা আকিদা, ইখলাস ও সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে। কেননা, বহু ইসলামপন্থী জামাআত এমন পরিবেশে বেড়ে উঠে, যেখানে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান। কিন্তু তারা এগুলোর দিকে মাথা তুলেও তাকায় না। যেন ইসলামি সংগঠনগুলোর কাজ স্রেফ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করা। আর যেন তারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক কাজের উপায়সমূহের একটি উপায় হিসেবে জিহাদ, বিপ্লবের পথ বেছে নিয়েছে।

আমাদের জাতি ও সমাজের মাঝে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক বিচ্যুতিগুলোর প্রতিকারে বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষ থেকে সঠিক মানহাজের পরিপূর্ণ উপস্থাপনা খুবই জরুরি। কারণ, সঠিক কর্মপন্থাই একসময় ইসলামী সংগঠনকে এমন শারঈ রূপ প্রদান করতে সক্ষম, যা সামগ্রিকভাবে ইসলামী আন্দোলনকে সাহাবাদের প্রজন্মের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে!

তাই কোনো বিপ্লবী আন্দোলন বা জিহাদি আন্দোলন কেবল নাম, পরিভাষা ও দাবির কারণে আনুগত্যের হকদার হয়ে যায় না। বরং দেখতে হয় তাদের দাওয়াহ, মানহাজ, মানসিকতা ও লক্ষ্য অর্জনে সক্ষমতার দিকগুলোও।

নববী মানহাজের আলোকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য উপযোগী নেতৃত্ব ও আন্দোলনের জন্য উচিৎ-

ক) সঠিক মানহাজ ও রাজনৈতিক লাইনের আলোকে সুপরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক সংগ্রাম পরিচালনা, 

খ) সংগ্রামের আগত পরীক্ষা ও বিপদ সত্ত্বেও অবিচল ও সুদৃঢ় থাকা এবং 

গ) প্রতিকূলতার মাঝেও আন্দোলনকে ব্যাপক ও বিস্তৃত করা।

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও মুহাজির সাহাবাদের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই আছে। তাই কুফরের ইমামদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে জাতির মাঝে বলিষ্ঠ সাংগঠনিক মেহনত জরুরি। হকের অগ্রগতি ঠেকাতে কুফরি শক্তির আগত আঘাত সত্ত্বেও ইস্তিকামাত থাকা এবং ইহতিসাব তথা সাওয়াবের আশা রাখা কাম্য।

শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম বলেন,

“অতএব, যারা কুফরের সাথে সংঘাতের চিন্তা বাদ দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী জনসংখ্যার শতকরা দশ ভাগ বা বিশ ভাগে পৌঁছার অপেক্ষা করে; এবং বলে যে, ‘শতকরা দশ কিংবা বিশ ভাগ জনগণ যখন ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হবে, তখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করব’, তারা সমাজের প্রকৃতি, দাওয়াতের নীতি ও পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টিগত সুন্নাহ উপলব্ধি করেনি।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মী সংখ্যা জনসংখ্যার একশ ভাগের পাঁচ কিংবা দশ ভাগে এসে পৌঁছা কখনোই সম্ভব না। এটা অবাস্তব স্বপ্ন ছাড়া কিছুই না।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীদের দিকে দেখুন।

মক্কার তেরো বছরে তাঁদের সংখ্যা ছিল শতের কাছাকাছি।

জিহাদের পথে অগ্রসর হওয়ার পর বদরে গিয়ে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়াল ৩১৩ (তিনশ তেরো) জনে।

উহুদে গিয়ে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়াল ৭০০ (সাতশ) এ।

হুদাইবিয়ায় গিয়ে তাঁদের সংখ্যা এসে উপনীত হয় ১৪০০ (চৌদ্দশ) এ।

মক্কা বিজয়ের দিন তাঁদের সংখ্যা হয় ১০,০০০ (দশ হাজার) ।

কেন এত বিরাট পার্থক্য?

ষষ্ঠ হিজরিতে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় সাহাবীদের সংখ্যা ছিল ১৪০০। কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন দশ হাজার হলো কীভাবে?

এর কারণ, যুদ্ধে হেরে কুরাইশরা তাঁদের দম্ভ অহংকারকে খুইয়ে স্বীকার করে নিল যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ই কর্তৃত্বের অধিকারী। তাই তারা তাঁর হাতে কর্তৃত্বের চাবি তুলে দিতে বাধ্য হয়। হুদাইবিয়ার সন্ধি আরব উপদ্বীপে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি করল। ফলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবেশ করা শুরু করল। কারণ, মানুষের ইসলামগ্রহণে কুরাইশদের দম্ভ ও আল্লাহর দ্বীনের সাথে তাঁদের শত্রুতা বড় বাধা ছিল।

হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা যখন তাঁদের দম্ভ অহংকার থেকে হটে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হলো, তখন জনসাধারণ মনে করল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিজয় অনিবার্য। ফলে তাঁরা ব্যাপকভাবে ইসলামে দীক্ষিত হতে শুরু করে। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় হলো এবং কুরাইশরা পরাজয় স্বীকার করে নিল।

মক্কা বিজয় রমাদানে হয়েছিল। নবম হিজরির জুমাদাল উখরা বা রজব মাসে তথা মক্কা বিজয়ের নয় মাস পর তাবুক অভিযান পরিচালিত হয়। মুসলমানদের সংখ্যা মক্কা বিজয়ের দিন দশ হাজার ছিল। কিন্তু তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ত্রিশ হাজারে। বিপুলভাবে বর্ধমান এ সংখ্যা মুসলমানদের সামরিক-রাজনৈতিক বিজয়েরই ফল। দশম হিজরির শেষের দিকে যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিদায় হজ করতে গিয়েছিলেন, তখন মুসলমানদের সংখ্যা এসে পৌঁছে এক লক্ষ চৌদ্দ হাজারে।

শক্তিশালী না হলে মানুষ আপনার পক্ষ নেবে না। দুর্বলতা ও কষ্টের সময় গণমানুষের পক্ষে আপনার সাথে এসে দাঁড়ানো কল্পনাতীত ব্যাপার। কারণ, গণমানুষ অবস্থা দেখেই ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

আল্লাহ বলেছেন,

‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেল, আর আপনি মানুষকে দেখছেন, তারা আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবেশ করছে।’

আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের পরই মানুষ আল্লাহর দ্বীনে গণহারে দীক্ষিত হয়। দুর্বলতা ও কঠিন পরিস্থিতির সময় কেবল সেসব দুর্লভ ও অনন্যসাধারণ লোকেরা তোমার পাশে থাকবে, যারা ত্যাগ ও মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে।”

শায়খ আরও বলেন,

“সমাজবিপ্লব, জাতি গঠন ও সম্মান পুনরুদ্ধারের যে পথনির্দেশ আমাদেরকে দান করা হয়েছে, তার মর্মকথা হচ্ছে এই যে, বিপ্লবের জন্য একটি শুদ্ধি-আন্দোলন অপরিহার্য, যা শুরু হবে তাওহীদের দাওয়াতকে সামনে রেখে। অতঃপর জাহিলিয়াত তার সর্বশক্তি নিয়ে তাওহীদের এই দাওয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে।

শুরু হবে উভয়ের মধ্যে সংঘাত। মুমিনরা ধৈর্য্যধারণ করবে। অতঃপর এমন দিন আসবে, মুমিনদের দল তাদের রবের ইচ্ছায় বজ্রের ন্যায় অগ্রসর হয়ে, উম্মাহর শক্তি ও কল্যাণকে বিস্ফোরিত করবে। জনসাধারণ তাদের পক্ষ নেবে এবং লোহা ভক্ষণকারী ঈমানদাররা এ জ্বলন্ত চুলায় (ময়দানে) ত্যাগ দিতে থাকবে এবং সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

এ সংঘাতের প্রধান উপকরণ ইসলামী আন্দোলনের বীর সৈনিকেরা। মাঝপথে দুর্বল ও কাপুরুষেরা ঝরে পড়তে থাকবে, আর দৃঢ়পদরা পথচলা অব্যাহত রাখবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর লড়াইয়ের উত্তাপে আত্মাগুলো পরিশুদ্ধ হবে এবং হৃদয়গুলো পরিচ্ছন্ন ও চকচকে হবে।

আল্লাহ তাদেরকে তাঁর সম্মানের আচ্ছাদন বানাবেন, তাদের বিজয়ের ফলগুলোকে হিফাজত করবেন, তাদেরকে তাঁর দ্বীনের বিশ্বস্ত সংরক্ষক বানাবেন এবং তাদেরকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করবেন।”

শায়খ মুহাম্মাদ খলিল বলেন,

“যখন থেকে মুসলিম জাতির ওপর হিদায়াতের সূর্য উদিত হয়েছে, তখন থেকেই তাদের ওপর ধারাবাহিক নানান পরীক্ষা ও মুসিবত আপতিত হয়েছে। মানুষকে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা ও পরীক্ষার মোকাবিলা করতে হয়। অনেক সময় মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো আসে, ইসলামের হিদায়াত পাওয়ার আগে। তবে ঈমানের প্রফুল্লতা অন্তরে মেশার পর পরীক্ষা আর ফিতনা ব্যক্তির অন্তরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি তৈরি করে। বিয়ের ফিতনা, সম্পদের ফিতনা, চাকরি কিংবা রোজগারের ফিতনা, নানান ধরনের ফিতনার মুখোমুখি তাকে হতে হয়। কিন্তু ঈমানদার যখনই সফলতার সাথে কোনো ফিতনার মোকাবিলা করে, তখন সেই ফিতনার মাত্রা অনুযায়ী তার অন্তরে একটি সাদা ফোঁটা পড়ে। অর্থাৎ তার অন্তরে গুনাহর কারণে যে কালো দাগ পড়েছিল, তা দূর হয়। পাশাপাশি তার ঈমানও উন্নতির দিকে উঠতে থাকে।  

সাহাবীদের প্রজন্মের ঈমান শুরু থেকেই শক্ত ছিল, ব্যাপক ছিল। তাঁরা শুরু থেকেই বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এসব পরীক্ষার সামনে তাদের অবিচলতা আর দৃঢ়তার ফলে তাদের ঈমানের স্তর আরও উঁচু হয়েছিল। ঈমান আরও মজবুত আরও শক্তিশালী হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকের অনেক মাশায়েখ এবং উস্তাদরা আমাদের দুঃখ-দুর্দশা বয়ে আনতে পারে এমন সব কাজ এড়িয়ে যাবার শিক্ষা দেন। 

এভাবে আমরা অবনতি ও অধঃপতনের যাত্রা শুরু করি। আমাদের ঈমানী হালতের উন্নতি হয় না, অবনতি হয়। আমাদের ঈমান মজবুত হয় না, বরং যা ছিল তা আরও দুর্বল হয়।

একইভাবে আমরা দেখি যে, প্রথম প্রজন্মের মধ্য থেকে যারা মক্কাতে হিদায়াতের আলোতে আলোকিত হয়েছিলেন, তাঁদের কুফরি শক্তির কর্তৃত্বের ফিতনা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। আর যারা মদীনায় হিদায়াত পেয়েছিলেন, তাঁদের জিহাদ এবং তরবারির ঝনঝনানির মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

(তাই হকপন্থীদের কাফেলা) বাতিলের সামনে বলিষ্ঠভাবে হক তুলে ধরে, বস্তুগত ও আত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে, আনসার সংগ্রহ করে (তথা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা গ্রহণ করে); কিন্তু স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব ও কারাগারকে বরণ করে নেয় না। তবে বন্দিত্ব ও পরীক্ষা এসে গেলে ধৈর্যধারণ করে এবং এটাকে শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করে।

বিপরীতে আরেক দল রয়েছে, যারা এ ব্যাপারে বেশ শিথিলতা করে থাকে। বিপদের আশঙ্কা আছে এমন সব কাজ থেকে তারা দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। যেমন- বাতিলের সামনে স্পষ্ট হক বলা অথবা বাহ্যিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা থেকে তারা বিরত থাকে। কিন্তু কোনো কাজ না করলেও গর্বভরে চিৎকার করে বলাবলি করে, ‘আমরা এখন মাক্কী জীবনে আছি। আমরা সবরের পর্যায়ে আছি।’ 

আমি জানি না, মাক্কী জীবনের কোন বিধান তারা পালন করছে। তাদের অবস্থান হলো নিফাক, কুফরের সাথে মিশ্রণ, সহাবস্থান এবং প্রতারণার।”

অর্থাৎ, আদর্শের প্রভাব বিস্তার ও বিজয়ের ক্ষেত্রে বাতিলের সাথে সংঘাত অনিবার্য। এই কঠিন দায়িত্ব আদায়ে উম্মতের মাঝে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব ও জামাআত আবশ্যক, যারা দ্বীনকে প্রবল করবেন, মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসবেন। আর সাহাবাওয়ালা এমন নেতৃত্ব ও জামাআত, যা গড়ে ওঠে কেবল হক আঁকড়ে ধরার কারণে উদ্ভুত কঠিন পরিস্থিতিতেই। আরামদায়ক আলস্য ও বিলাসী জীবনযাত্রার মাঝে সময় অতিবাহিতকারীদের মধ্য থেকে এমন নেতৃত্ব ও জামাআত উঠে আসে না।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَاصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَ اَعۡرِضۡ عَنِ الۡمُشۡرِكِیۡنَ

“অতএব আপনি যে বিষয়ে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।”

اِنَّا كَفَیۡنٰكَ الۡمُسۡتَهۡزِءِیۡنَ

“নিশ্চয়ই আমরা বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট।”

وَ لَقَدۡ نَعۡلَمُ اَنَّكَ یَضِیۡقُ صَدۡرُكَ بِمَا یَقُوۡلُوۡنَ َ

“আর অবশ্যই আমরা জানি, তারা যা বলে তাতে আপনার অন্তর সংকুচিত হয়…”

فَسَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّكَ وَ كُنۡ مِّنَ السّٰجِدِیۡنَ

“কাজেই আপনি আপনার রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং আপনি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন;”

وَ اعۡبُدۡ رَبَّكَ حَتّٰی یَاۡتِیَكَ الۡیَقِیۡنُ

“আর মৃত্যু আসা পর্যন্ত আপনি আপনার রবের ইবাদাত করুন।”

অতএব, ইসলামী বিপ্লব সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় যোগ্য নেতৃত্ব ও জামাআতকে প্রথমে জাতির মাঝে ইসলামি দাওয়াহ প্রবল করার মাধ্যমে মেরুকরণে ভুমিকা রাখতে হবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুহাজির সাহাবীরা যেভাবে সুসংগঠিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিকে সামনে রেখে মেহনত করেছিলেন, তার আলোকে।

অর্থাৎ, সমাজে তাওহীদ ও কুফরের (সেক্যুলারিজম) মেরুকরণের ফলে উভয়পক্ষের শক্তির ভারসাম্য কমে আসবে। আর এক্ষেত্রে বাতিল শক্তির আঘাত তো অনিবার্যই। কারণ, দাওয়াহ ও দলিলের ময়দানে হককে পরাজিত করা তার জন্য সম্ভব না। তাই হক তীব্র হলে, বাতিল তাকে শক্তির মাধ্যমেই দমন করতে চাইবে। তাই দাওয়াহ ও বাতিলের সাথে সংঘাত, এই মূলনীতির আলোকে সুসংগঠিত আন্দোলন ঈমান, আত্মত্যাগ ও অবিচলতাকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহর ইচ্ছায় এমন আসবাব গ্রহণ করবে; যা উপযোগী পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দিয়ে বিপ্লব সম্পাদনে সক্ষম হবে।

তাই, শুরুতে বিপ্লবের উপযোগী পরিস্থিতির অর্জনের আগ অবধি, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক (فَاصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَ اَعۡرِضۡ عَنِ الۡمُشۡرِكِیۡنََ) মূলনীতির আলোকে হক ও বাতিলের মেরুকরণ স্পষ্ট করে দেওয়ার ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত মেহনত চালিয়ে যাওয়াই হবে নববি মানহাজের দাবী! আল্লাহই ভালো জানেন।

এ উদ্দেশ্যেই সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করা হয় দাওয়াহ ও সংগঠনের মাধ্যমে। কেননা, বিপ্লবের জন্য অপরিহার্য হলো আদর্শিক ভিত্তি, রাজনৈতিক ও ঈমানী প্রস্তুতি। পাশাপাশি উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি ও তাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।

আফসোসের বিষয় হলো, সাধারণ এক দল তো উপযোগী পরিস্থিতি না থাকার অজুহাত দিয়ে গণতন্ত্র, ব্যালট বাক্স আর আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় মগ্ন হয়ে সামাজিক শক্তি অর্জনের চিন্তা বাদ দিয়েছে। আবার আরেক দল উপযোগী পরিস্থিতি আনয়নের মেহনত বাদ দিয়ে স্রেফ বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারা, সামরিক প্রস্তুতি বা শক্তি অর্জনের ভাসাভাসা মেহনতকেই যথেষ্ট মনে করছে। কিন্ত বাস্তবতা হলো, শক্তি বলতে কেবল গোলাবারুদ আর মানুষের জমায়েত বোঝায় না। শক্তি বলতে প্রশিক্ষণের মতো বিমূর্ত বিষয় যেমন বোঝায়; একইভাবে উপযোগী পরিস্থিতি ও মুহাজিরীনদের জামাআতের ন্যায় আদর্শের ওপর দীক্ষালাভকে আরও বেশি বোঝায়; যা সমকালীন জামাআতগুলো উপেক্ষা করেছে। অথচ, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও রব্বানী ব্যক্তিবর্গ শারঈ ও সার্বজনীন সূত্র অনুযায়ী পরিস্থিতির আলোকে শক্তি অর্জন করেই শত্রুর ওপর বিজয়ী হয়েছেন। 

ভুলে যাওয়া উচিৎ হবে না- শক্তি সঞ্চয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যোগ্য নেতৃত্ব ও জামাআত গড়ে তোলা, যারা যেকোনো পরিস্থিতি ও উপকরণ নিজেদের অনুকূলে পাওয়ামাত্র যথাযথ আনুগত্য ও কুরবানির মাধ্যমে বিজয় অর্জনে সক্ষম এবং বিপ্লবের উপযোগী পরিস্থিতি।


(৩)

আমাদের ইমামরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, জীবনের প্রতি আসক্তি আর মৃত্যুর ভয়কে পদদলিত করতে সক্ষম বিপ্লবী জামাআত ছাড়া মানবতার উদ্ধার ও অস্তিত্ব রক্ষার আশা কিছুতেই করা যায় না। জিহাদ ও শাহাদাতের চেতনাকে পাশ কাটিয়ে দ্বীনের বিজয়ের আশা করা ভ্রান্তি বৈ কিছু নয়।

দুনিয়ার তুচ্ছতা, আত্মমগ্নতা আর আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহতা উপলব্ধি করা ছাড়া ইসলামের মহান দাওয়াত ও আন্দোলনের সফলতার কথা চিন্তা করা অসম্ভব। আর নিজের প্রতিষ্ঠা বা প্রসারের পরিবর্তে আল্লাহর দ্বীনের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার ফিকির ব্যতীত আমরা সফল হব না, এটাও মনে রাখা জরুরি।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, 

وَ هُوَ الَّذِیۡ جَعَلَكُمۡ خَلٰٓئِفَ الۡاَرۡضِ وَ رَفَعَ بَعۡضَكُمۡ فَوۡقَ بَعۡضٍ دَرَجٰتٍ لِّیَبۡلُوَكُمۡ فِیۡ مَاۤ اٰتٰكُمۡ  اِنَّ رَبَّكَ سَرِیۡعُ الۡعِقَابِ  وَ اِنَّهٗ لَغَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

“আর তিনি সে সত্তা, যিনি তোমাদেরকে জমিনের খলীফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা প্রদান করেছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তোমার রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

অর্থাৎ, মেধা, শক্তি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সম্পদ ইত্যাদি নিয়ামতের তারতম্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেছেন। কারও সম্পদ আছে বেশি, তো মেধার স্বল্পতা রয়েছে। কারও জ্ঞানের প্রাচুর্য রয়েছে, তো শারীরিক শক্তির ঘাটতি রয়েছে। মহাপ্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা’আলা এভাবে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

তাই প্রত্যেকের জন্য ওয়াজিব হলো, তাকে যা দেওয়া হয়েছে, তার সবটুকু দিয়ে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের মেহনতে অগ্রসর হওয়া। আল্লাহ তা’আলার সাথে সততা বজায়কারী প্রত্যেকের জন্য অবশ্যক, ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত তাওহীদ বাস্তবায়নের দাওয়াতের পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া। ইসলামের পুনর্জাগরণের এই শতাব্দীতে কোনো মুসলিমই যেন বিপ্লবী আন্দোলনের পথে কোনো প্রচেষ্টা বা সুযোগকে হাতছাড়া না করেন। বাহ্যত তা যতই হালকা মনে হোক না কেন। 

উদাসীনতা, গাফিলতির ব্যাধি যেহেতু আজ ব্যাপক, তাই সময়গুলো বিপ্লবী মেহনতে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি সচেতন ও উদ্যমী হওয়া কাম্য। নিশ্চয়ই আদম সন্তান কিছু সময়েরই সমষ্টি। তার একটি দিন চলে যাওয়া মানে নিজ সত্তার একটি অংশও চলে যাওয়া।

“পরে করব” বা “এখন থাকুক” মানসিকতা সম্পূর্ণই পরিত্যাজ্য। কেননা, এই মহান আমানত এতই ভারী, যার আহ্বানে আমাদের ইমাম, নবীগণের সর্দার মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং দুনিয়াত্যাগের আগ পর্যন্ত ন্যূনতম বিশ্রামও গ্রহণ করেননি।

يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ   قُمْ فَأَنذِرْ

“হে বস্ত্রাবৃত! উঠো, অতঃপর সতর্ক করো।”

উস্তাদ সাইয়িদ কুতুব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“মুসলিম জাতির নেতৃত্বদানের অক্ষমতার কারণে মানবতা আজ মহাদুর্যোগ ও অধঃপতনের শিকার হয়েছে। মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই আজ বিশ্বনেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন ইসলামের সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের, যার আবির্ভাব ঘটেছে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং জাহিলিয়্যাত থেকে জ্ঞান ও অন্তর্জ্ঞানের দিকে বের করে আনার জন্য।

পৃথিবীতে (ও সকল জাতিতে) ইসলামের নেতৃত্ব অপরিহার্য এবং এর অনুপস্থিতির কারণে শুধু মুসলিম জাতি নয়, বরং সমস্ত মানবজাতি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বস্তুত এই ক্ষতির পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, তা সবকিছুকেই ঘিরে আছে।”

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই দাওয়াতের সত্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব, গুরুত্ব এবং প্রয়োজন অনুধাবন করা এখন অনেক সহজ। জাহিলিয়্যাতের কদর্যতা ও বাস্তবতা উৎকটভাবে আজ প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। বস্তুবাদী ও ভোগবাদী জীবনের অনাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে মানুষ।

ইসলামী উম্মাহর সামনে আজ তার ছিনতাই হওয়া নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করার সর্বোত্তম সময় ও সুযোগ। যদি উম্মাহর নিবেদিতপ্রাণ দাঈরা উঠে দাঁড়ায় এবং ইখলাস, আত্নত্যাগ, উদ্যম ও সংকল্পের সঙ্গে ইসলামি দাওয়াত বুকে ধারণ করে জাতিকে আহ্বান করে। যদি আহবান করে আস্থার সাথে, দরদের সাথে, মমতার সাথে, কল্যাণকামিতার সাথে এবং যুক্তি, শ্রদ্ধা আর আচরণ দিয়ে যদি বোঝাতে পারে যে, এটাই একমাত্র পথ; যা জাতিকে পতন ও অধঃপতনের চরম পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে, তবে শীঘ্রই হারানো নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, ইন শা আল্লাহ।

কবির ভাষায়, 

“এ ভূমি এখন বড় সিক্ত, উর্বর ও উপযোগী, 

চাই শুধু উন্নত বীজ আর দরদী কৃষক।”

তাই, নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) প্রকৃত বিপ্লবী উত্তরসূরিরা ঈমান ও দাওয়াতের শক্তি এবং আল্লাহ তা’আলার নুসরতকে সঙ্গী করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব আদায়ে হবেন আগের চেয়েও আরও উদ্যমী ও দৃঢ়- এটাই আশা করা হয়।

ইসলামের পথ কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মেহনত ও কুরবানিকে সমর্থন করে না। এ পথের বাস্তবতা এমন নয় যে, কোনো ব্যক্তি বা জামাআত কিছু সময় চেষ্টা সংগ্রাম করার পর আরাম-আয়েশ ও অবসর যাপনের দিকে মনোনিবেশ করবে। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে থাকবে যে, ‘সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছে এবং বাকিরা এসে তার পথ ও সফর পরিপূর্ণ করে দেবে।’ এভাবেই শয়তান এ সকল ধারণাকে সুশোভিত করে। এমনটা কখনোই ইসলামী চিন্তা-ফিকিরের ফলাফল নয়! নিশ্চয়ই ইসলামের পথ এমন নয়। বরং ইসলাম হলো অবিরত চেষ্টা-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও জিহাদের নাম। যা চলমান থাকবে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত, আজীবন।

একজন দাঈ পরোয়া করে না সে জীবনে তার দাওয়াতের পূর্ণাঙ্গতা দেখে যেতে পারল কিনা। কেননা সে জানে, দাঈদের ইমাম মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীদের রোম ও পারস্য বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে জীবদ্দশায় তা দেখে যাননি। একইভাবে, আমাদের ইমাম শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম, উস্তাদ সাইয়িদ কুতুব (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর দাওয়াত পূর্ণাঙ্গতা দেখতে পাওয়ার পূর্বেই শাহাদাত বরণ করেছেন। কিন্তু উনাদের যোগ্য উত্তরসূরিগণ তাওহীদের আমানত বহন করে সমগ্র দুনিয়াতে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

আমাদের কর্তব্য এই মহান পূর্বসূরিদের দাওয়াতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, তাওহীদ প্রতিষ্ঠার বিশুদ্ধ মানহাজ তথা দাওয়াহ ও জিহাদের পথকে সম্ভাব্য সকল উপকরণকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা, যেন কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা’আলার ক্ষমা লাভ হয়ে যায়।

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ

وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا

“যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। আর আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন; তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবুলকারী।”

প্রত্যেক আন্তরিক ইসলামপন্থীর জন্য আবশ্যক যে, ব্যক্তি ইসলামের পথে বিপ্লবী মেহনতে সময় ও শ্রমের সবটুকু ব্যয় করবে। মুসলিমরা প্রকৃত শান্তির খোঁজ একমাত্র জান্নাতে পাবে। আর এ বিষয়টি উপলব্ধি করা যায় পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতগুলো থেকে, যেখানে আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর বান্দাদের মধ্যকার ক্রয়-বিক্রয়ের কথা বলেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

اِنَّ اللّٰهَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَهُمۡ وَ اَمۡوَالَهُمۡ بِاَنَّ لَهُمُ الۡجَنَّةَ  یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ فَیَقۡتُلُوۡنَ وَ یُقۡتَلُوۡنَ  وَعۡدًا عَلَیۡهِ حَقًّا فِی التَّوۡرٰىةِ وَ الۡاِنۡجِیۡلِ وَ الۡقُرۡاٰنِ  وَ مَنۡ اَوۡفٰی بِعَهۡدِهٖ مِنَ اللّٰهِ فَاسۡتَبۡشِرُوۡا بِبَیۡعِكُمُ الَّذِیۡ بَایَعۡتُمۡ بِهٖ  وَ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহর চেয়ে অধিক (সত্যবাদী) কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা (আল্লাহর সঙ্গে) যে সাওদা করেছ, সে সাওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহাসাফল্য।”

অতএব ক্রয়-বিক্রয় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে এবং চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে; এতে কোনো ধরনের কম-বেশি করার সুযোগ নেই, নেই প্রত্যাহারের সুযোগ। ওপরের বিষয়টি যদি আমরা ভালোভাবে অনুধাবন করে থাকি, তো আমরা নিম্নোক্ত হাদীসের মর্মও বুঝতে সক্ষম হব ইন শা আল্লাহ। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,

إنما الناسُ كإبلٍ مائة لا تكاد تجدُ فيها راحلةً

“নিশ্চয়ই মানুষ এমন একশটি উটের ন্যায়, যেগুলোর মধ্যে হতে আরোহণযোগ্য একটি উট পাওয়া যাওয়াও দুর্লভ।”

অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলার তাওফিকপ্রাপ্ত বান্দারা হলেন এমন বাহনের ন্যায়, যা সফরের কষ্ট সহ্য করতে পারে এবং শেষপর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

আর সর্বোত্তম কথা তা-ই, যা আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَاصۡبِرۡ اِنَّ وَعۡدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّ لَا یَسۡتَخِفَّنَّكَ الَّذِیۡنَ لَا یُوۡقِنُوۡنَ

“অতএব আপনি সবর করুন, নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর যারা দৃঢ়বিশ্বাসী নয়, তারা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে।”

এই আয়াতের ব্যাপারে আল্লামা সা’দি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“সুতরাং আপনাকে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে ধৈর্যধারণ করুন এবং আল্লাহর পথে দাওয়াতেও লেগে থাকুন। তাদের কাছ থেকে বিমুখ হওয়া দেখলেও তা যেন আপনাকে আপনার কাজ থেকে বিমুখ না করে। আর বিশ্বাস করুন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা বিশ্বাস থাকলে আপনার পক্ষে ধৈর্যধারণ করা সহজ হবে।

কারণ, বান্দা যখন জানতে পারে যে, তার কাজ নষ্ট হচ্ছে না, বরং সে সেটাকে পূর্ণমাত্রায় পাবে, তখন এ পথে যত কষ্টের মুখোমুখিই সে হোক না কেন, সে সেটাকে ভ্রুক্ষেপ করবে না, কঠিন কাজও তার জন্য সহজ হয়ে যায়, বেশি কাজও তার কাছে অল্প মনে হয়, আর তার পক্ষে ধৈর্যধারণ করা সহজ হয়ে যায়।”

এবং আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَاصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ اُولُوا الۡعَزۡمِ مِنَ الرُّسُلِ وَ لَا تَسۡتَعۡجِلۡ لَّهُمۡ  كَاَنَّهُمۡ یَوۡمَ یَرَوۡنَ مَا یُوۡعَدُوۡنَ  لَمۡ یَلۡبَثُوۡۤا اِلَّا سَاعَةً مِّنۡ نَّهَارٍ بَلٰغٌۚ فَهَلۡ یُهۡلَكُ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

“অতএব আপনি সবর করুন, যেমন সবর করেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। আর আপনি তাদের জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা যেদিন তারা দেখতে পাবে, সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন দিনের এক দণ্ডের বেশি দুনিয়াতে অবস্থান করেনি। এ এক ঘোষণা, সুতরাং পাপাচারী সম্প্রদায়কেই কেবল ধ্বংস করা হবে।”