(১)

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

اُولٰٓئِكَ الَّذِیۡنَ هَدَی اللّٰهُ فَبِهُدٰىهُمُ اقۡتَدِهۡ  قُلۡ لَّاۤ اَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ اَجۡرًا  اِنۡ هُوَ اِلَّا ذِكۡرٰی لِلۡعٰلَمِیۡنَ

“এরাই (নবীগণ) তাঁরা, যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন, কাজেই আপনি তাঁদের পথের অনুসরণ করুন।  বলুন, ‘এর জন্য আমি তোমাদের কাছে পারিশ্রমিক চাই না, এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ।’”

আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে নিয়ে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত সকল নবীর (আলাইহিমুস সালাম) জীবনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে এক আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের অধীনে নিয়ে আসা।  যেন আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের বিপরীতে কোনো ব্যক্তি, নেতা, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা রাষ্ট্রের আনুগত্য প্রাধান্য না থাকে।

وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ قَبۡلِكَ مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا نُوۡحِیۡۤ اِلَیۡهِ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَا فَاعۡبُدُوۡنِ

“আর আপনার পূর্বে এমন কোনো রাসূল আমি পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই; সুতরাং তোমরা আমার ইবাদাত করো।’”

وَ لَقَدۡ بَعَثۡنَا فِیۡ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوۡلًا اَنِ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَ اجۡتَنِبُوا الطَّاغُوۡتَ

“আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং পরিহার করো তাগুতকে।’”

সকল নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরিত হয়েছিলেন জমিনে তাওহীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়।  প্রত্যেক ব্যক্তি, সত্তা ও শক্তির ঊর্ধ্বে জমিনে আল্লাহ তা’আলার দ্বীনকে প্রবল করার জন্যই নবীরা নিজ সঙ্গীদের নিয়ে মেহনত করেছেন।

وَ كَاَیِّنۡ مِّنۡ نَّبِیٍّ قٰتَلَ مَعَهٗ رِبِّیُّوۡنَ كَثِیۡرٌ ۚ فَمَا وَهَنُوۡا لِمَاۤ اَصَابَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ مَا ضَعُفُوۡا وَ مَا اسۡتَكَانُوۡا وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الصّٰبِرِیۡنَ

“আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে।  তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে, তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি।  আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি।  আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন।”

আম্বিয়ায়ে কেরাম ও উনাদের উত্তরসূরিদের আল্লাহ তা’আলা পাঠিয়েছেন মানুষকে হিদায়েতের পথে নিয়ে আসার জন্য।  মানুষের উপর চেপে বসা সমস্ত জুলুম–নির্যাতনের অবসান ঘটানোর জন্য।  সৃষ্টির ইবাদত করা থেকে বের করে কেবল মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্যের অধীনে আনার জন্য। 

لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنٰتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

“নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।”

اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَاۤ اَرٰىكَ اللّٰهُ وَلَا تَكُنْ لِّلْخَآئِنِيْنَ خَصِيْمًا

“নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন। তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ক করো না।”

এই মহান দায়িত্ব আদায়ের অপরিহার্যতা চরমপন্থী মুরজিয়া ও বিদআতিরা ব্যতীত কেউই অস্বীকার করেনা। 

আলহামদুলিল্লাহ।  প্রত্যেক যুগের, প্রত্যেক জাতির তাওফিকপ্রাপ্ত, সত্যবাদী ও মনোনীত ব্যক্তিরা এই মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।  ধৈর্য এবং দৃঢ়তার সাথে। তারাই প্রত্যেক যুগের অগ্রগামী, মুহসিন ব্যক্তিবর্গ! আর এই উন্নত ব্যক্তিদের সমন্বিত ও সুসংগঠিত মেহনত ছাড়া ইসলাম কায়েমের কথা ভাবাই যায় না। 

শায়খ উমার মাহমুদ উসমান বলেন,

“আল্লাহর দ্বীনে ইমামত বা নেতৃত্ব একটি কাঙ্ক্ষিত বিষয়।  নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব (ইমামত) ব্যতীত পৃথিবীতে মুসলিমের ইবাদাত বাস্তবায়িত হয় না।  আর এখানে আমরা ইমামত ও ইমাম দ্বারা বুঝাচ্ছি, যা অর্জন হবে বিজয় ও শক্তির মাধ্যমে।  ক্ষমতাশীল হওয়ার মাধ্যমে।  তাই পৃথিবীতে মুসলমানদের তামকিন যত বৃদ্ধি পাবে, তাদের ইবাদতও তত বৃদ্ধি পাবে।  আর পৃথিবীতে মুসলমানদের ক্ষমতা যত হ্রাস পাবে, তাদের ইবাদতও তত হ্রাস পাবে।”

আল্লাহ তা’আলার পবিত্র কুরআনের এই আয়াত থেকে নবীগণের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আরও বিস্তারিতভাবে জানা যায়,

وَ جَعَلۡنٰهُمۡ اَئِمَّةً یَّهۡدُوۡنَ بِاَمۡرِنَا وَ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡهِمۡ فِعۡلَ الۡخَیۡرٰتِ وَ اِقَامَ الصَّلٰوةِ وَ اِیۡتَآءَ الزَّكٰوةِ  وَ كَانُوۡا لَنَا عٰبِدِیۡنَ

“আর আমি তাদেরকে করেছিলাম নেতা; তারা আমাদের নির্দেশ অনুসারে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত; আর আমি তাদেরকে সৎকাজ করতে ও সালাত কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে ওহী পাঠিয়েছিলাম; এবং তারা আমাদেরই ইবাদাতকারী ছিল।”

সুতরাং, জমিনে তাওহীদের কর্তৃত্বের অন্যতম অর্থই হচ্ছে, জমিনে মানুষের সকল বিষয় নির্ধারিত হবে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশনা অনুযায়ী। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ, করণীয়-বর্জনীয়, ব্যবস্থাপনাগত বা মূল্যবোধগত সকল কিছুই ঠিক করা হবে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা অনুযায়ী।  এর মাধ্যমেই আসতে পারে ইনসাফ, ও ভারসাম্য।  এ পথে অর্জিত হয় আত্মিক প্রশান্তি ও সামাজিক ভারসাম্য।  যা আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিস্তারিত জানিয়েছেন, দেখিয়েছেন।  পাশাপাশি, জাতির ইমাম নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) নিজেরাও ছিলেন ইবাদাত ও আখলাকে সবার অগ্রগামী।

আর এতেও সন্দেহ নেই যে, নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) নিজ জাতিকে ঈমানের দিকে আহবান করার পাশাপাশি তাদের ওপর চেপে বসা কর্তৃত্ববাদীদের কুফর ও জুলুমের কবল থেকে বের করে আনতে চেয়েছেন।  কারণ, এসকল কর্তৃত্ববাদীরাই তাওহীদের পথে প্রধান বাধা হয়ে থাকে।  আর হিদায়াতের পথের প্রতিবন্ধকতাসমূহকে চিহ্নিত করে, তা থেকে মানবজাতিকে রক্ষার মেহনত ছাড়া সামগ্রিক ইবাদাত নিশ্চিত করা সম্ভব না।  দ্বীনের পথের প্রতিবন্ধকতার অপসারণ ব্যতীত প্রবৃত্তিপূজারী বিত্তশালী বা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাবানদের হাতে পিষ্ট মানবতাকে মুক্তি দেওয়াও সম্ভব না।

وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡ قَرۡیَةٍ مِّنۡ نَّذِیۡرٍ اِلَّا قَالَ مُتۡرَفُوۡهَاۤ  اِنَّا بِمَاۤ اُرۡسِلۡتُمۡ بِهٖ كٰفِرُوۡنَ

“আর আমরা কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করলেই তার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, ‘তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ, আমরা তার সাথে কুফরি করি।’”

وَ اِذَاۤ اَرَدۡنَاۤ اَنۡ نُّهۡلِكَ قَرۡیَةً اَمَرۡنَا مُتۡرَفِیۡهَا فَفَسَقُوۡا فِیۡهَا فَحَقَّ عَلَیۡهَا الۡقَوۡلُ فَدَمَّرۡنٰهَا تَدۡمِیۡرًا

“আর আমি যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন সেখানকার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে আদেশ করি, ফলে তারা সেখানে অসৎকাজ করে; অতঃপর সেখানকার প্রতি শাস্তির আদেশ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমরা তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।”

কুরআন মাজীদের বহু স্থানে বর্ণিত হয়েছে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রুখে দাঁড়াত সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি, যারা ছিল অর্থ-বিত্ত, সহায়-সম্পদ ও কর্তৃত্ব-ক্ষমতার অধিকারী।

সুতরাং, কর্তৃত্ববাদী কুফরি শক্তির অপসারণ ছাড়া তাওহীদ ও ইবাদাত পরিপূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।  এজন্যই জমিনে তথা মানুষের ওপর তাওহীদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার জন্য কুফরি শাসনকর্তৃত্বের অপসারণ অপরিহার্য।  নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আগমনের উদ্দেশ্যকে পূর্ণতা দানকারী, মানবজাতির জন্য রহমতরূপে প্রেরিত সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রেরণের উদ্দেশ্য দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে,

هُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَهٗ بِالۡهُدٰی وَ دِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡهِرَهٗ عَلَی الدِّیۡنِ كُلِّهٖ وَ لَوۡ كَرِهَ الۡمُشۡرِكُوۡنَ

“তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ; সকল দ্বীনের ওপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”

আর এ উদ্দেশ্যেই নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর নাযিল হয়েছে কিতাব, যেন কুফরের অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোয় মানবজাতিকে নিয়ে আসা হয়।

الٓرٰ کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ لِتُخۡرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ بِاِذۡنِ رَبِّہِمۡ اِلٰی صِرَاطِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ

“আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে।”

সুতরাং, জমিনে ও মানুষের ওপর আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল নবীগণের প্রধান উদ্দেশ্য।  আর এ উদ্দেশ্যে নবীগণের রেখে যাওয়া জিম্মাদারি আদায়ের কারণেই উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব।

كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّةٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ لَوۡ اٰمَنَ اَهۡلُ الۡكِتٰبِ لَكَانَ خَیۡرًا لَّهُمۡ مِنۡهُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ اَكۡثَرُهُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে।  তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে।  আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তবে অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো।  তাদের কতক ঈমানদার।  আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক।”

এ লক্ষ্যে আমৃত্যু নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) চেষ্টা করে গেছেন, মানুষ যেন আল্লাহ তা’আলার বিধানের অধীনে চলে আসে।  বিশেষত, মানবজাতির ওপর থেকে কুফরের কর্তৃত্ব অপসারণ এবং জমিনে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই ছিল নবীগণের প্রধান লক্ষ্য।  কেননা, ব্যক্তি, সমাজ তথা গোটা মানবজাতির জন্য কীসে কল্যাণ, তা কেবলমাত্র সেই সত্তাই জানতে পারেন, যে সত্তা সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন। 

اَلَا یَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ  وَ هُوَ اللَّطِیۡفُ الۡخَبِیۡرُ

“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কি জানবেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত।”

তাই, যে বা যারাই আল্লাহ তা’আলাকে রব, স্রষ্টা হিসেবে মেনে নিয়েছে, তার জন্য ব্যক্তিগত, সামাজিক অঙ্গন থেকে নিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার নিরংকুশ আনুগত্য মেনে না নেওয়ার মানেই হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করা।  উল্লেখ্য, আত্মিক দুর্বলতার কারণে কখনো কখনো আল্লাহ তা’আলার বিধান প্রতিপালন না করতে পারা এবং আল্লাহ তা’আলার বিধানকে অনুশোচনাহীনভাবে উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যান করা এক নয়।  প্রথমটি ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে না, কিন্তু পরবর্তী অবস্থানগ্রহণকারী ব্যক্তি মুসলিম থাকতে পারে না।

দুনিয়াতে মানুষের ওপর কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যই যেন কার্যকর থাকে, যেন আল্লাহ তা’আলার নাযিলকৃত বিধানের ইনসাফ মানবসমাজের দুনিয়াবি জীবন ও আখিরাতের জীবনকে করে তোলে কল্যাণে পরিপূর্ণ- এমনটা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।  এজন্যই আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত বানিয়েছেন।  এবং আমাদেরকে পাঠিয়েছেন মানবজাতিকে তাঁর ইবাদাতের দিকে নিয়ে আসার জন্য।  তিনি বলেন,

كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّةٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ  وَ لَوۡ اٰمَنَ اَهۡلُ الۡكِتٰبِ لَكَانَ خَیۡرًا لَّهُمۡ  مِنۡهُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ اَكۡثَرُهُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে।  তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে।  আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তবে অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো।  তাদের কতক ঈমানদার।  আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক।”

আর, নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) অনুসরণ, ইবাদাত ও আমলে সালিহের মাধ্যমেই আসে প্রকৃত প্রশান্তি।  যা কাড়ি কাড়ি টাকা, সুবিশাল অট্টালিকা কিংবা সুন্দরী নারী দ্বারা অর্জন করা যায় না!

مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَكَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَ هُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّهٗ حَیٰوةً طَیِّبَةً وَ لَنَجۡزِیَنَّهُمۡ اَجۡرَهُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا كَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমরা তাকে পবিত্র জীবন দান করব।  আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব।”

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসিরের মতে, এখানে ‘হায়াতে তাইয়িবা’ বলতে ‘দুনিয়ার পবিত্র ও আনন্দময় জীবন’ বোঝানো হয়েছে। 

আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর অর্থ করেছেন ‘স্বল্পে তুষ্টি।’

দাহহাক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, হায়াতে তাইয়িবা হলো ‘হালাল রিযিক ও দুনিয়াতে ইবাদাত করার তাওফিক।’

যে বা যারাই নবীগণের পথ থেকে সরে গিয়ে, ইবাদাতের পূর্ণতা বিধানের আমানতকে উপেক্ষা করে তুচ্ছ দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তার জন্য দুনিয়াতে থাকবে অতৃপ্ত, সংকীর্ণ জীবন।

وَ مَنۡ اَعۡرَضَ عَنۡ ذِكۡرِیۡ فَاِنَّ لَهٗ مَعِیۡشَةً ضَنۡكًا وَّ نَحۡشُرُهٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَةِ اَعۡمٰی

“আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয়ই তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত।”

অর্থাৎ, ইবাদাতে গাফিলতির দরুন তাদের দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ হবে।  তাদের কাছ থেকে অল্পে তুষ্টির গুণ ছিনিয়ে নেওয়া হবে এবং সাংসারিক লোভ-লালসা বাড়িয়ে দেওয়া হবে; যা তাদের জীবনকে অতিষ্ট করে তুলবে।  ফলে তাদের কাছে যত অর্থ-সম্পদই সঞ্চিত হোক না কেন, আত্মিক শান্তি তাদের ভাগ্যে জুটবে না।  সদা-সর্বদা সম্পদ বৃদ্ধি করার চিন্তা এবং ক্ষতির আশঙ্কা তাদেরকে অস্থির করে তুলবে।  কেননা সুখ-শান্তি; অন্তরের স্থিরতা ও নিশ্চিন্ততার মাধ্যমেই অর্জিত হয়; শুধু প্রাচুর্য্যে নয়। 

তাই, আখিরাত তো বটেই, দুনিয়াতেও যদি কেউ প্রশান্তির জীবন চায়; তার উচিৎ ইবাদাতে মনোযোগী হওয়া, ইসলামকে ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন দ্বীন-মতবাদসহ সমস্ত কিছুর ওপর বিজয়ী করায় ভূমিকা রাখা।  কেবলমাত্র এই মহান আদর্শ বাস্তবায়নই ব্যক্তি, সমাজ ও মানবতাকে সম্পদের অসম বণ্টন, স্বেচ্ছাচারীর আগ্রাসনসহ সকলপ্রকার জুলুমের নিষ্পেষণ থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে।  কেননা, তাওহীদের বাস্তবায়নই হলো আমাদের ইবাদাতসমুহের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদাত, যা আমাদের দান করবে হায়াতে তাইয়িবা।  আর এটাই আল্লাহ তা’আলার সাহায্য পাওয়ার মাধ্যম।

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَنۡصُرُوا اللّٰهَ یَنۡصُرۡكُمۡ وَ یُثَبِّتۡ اَقۡدَامَكُمۡ

“হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সমূহ সুদৃঢ় করবেন।”

আর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য সাহায্য করতেই আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।  তিনি চেয়েছেন মুমিনরা যেন আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যায়।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُوۡنُوۡۤا اَنۡصَارَ اللّٰہِ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও।”


(২)

সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামী সভ্যতার কর্তৃত্ব এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নজির ইতিহাসে আগে-পরে পাওয়া যায় না।  এই কর্তৃত্ব বিভিন্ন মাত্রায় টিকে থাকে উনিশ শতক পর্যন্ত।  তারপর, জাতির উত্থান-পতনের সূত্রানুযায়ী আল্লাহ তা’আলা এই জাতির নেতৃত্ব খর্ব করলেন।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

لَهٗ مُعَقِّبٰتٌ مِّنۡۢ بَیۡنِ یَدَیۡهِ وَ مِنۡ خَلۡفِهٖ یَحۡفَظُوۡنَهٗ مِنۡ اَمۡرِ اللّٰهِ  اِنَّ اللّٰهَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِهِمۡ  وَ اِذَاۤ اَرَادَ اللّٰهُ بِقَوۡمٍ سُوۡٓءًا فَلَا مَرَدَّ لَهٗ  وَ مَا لَهُمۡ مِّنۡ دُوۡنِهٖ مِنۡ وَّالٍ

“মানুষের জন্য রয়েছে সামনে ও পেছনে, একের পর এক আগমনকারী প্রহরী, যারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে হিফাজত করে।  নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।  আর যখন আল্লাহ কোনো জাতির মন্দ চান, তখন তা প্রতিহত করা যায় না এবং তাদের জন্য তিনি ছাড়া কোনো অভিভাবক নেই।”

اَوَ لَمۡ یَهۡدِ لِلَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡاَرۡضَ مِنۡۢ بَعۡدِ اَهۡلِهَاۤ اَنۡ لَّوۡ نَشَآءُ اَصَبۡنٰهُمۡ بِذُنُوۡبِهِمۡ وَ نَطۡبَعُ عَلٰی قُلُوۡبِهِمۡ فَهُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡنَ

“জমিনের অধিবাসীদের (চলে যাবার) পর যারা তার উত্তরাধিকারী হয়, তাদের কাছে কি এ কথা পরিষ্কার হয়নি যে, আমি যদি চাই, তাদের পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারি?”

ফলে, আল্লাহ তা’আলার সুন্নাহ অনুসারেই মুসলিমদের কর্তৃত্ব খর্ব হলো।  পাশাপাশি, ইউরোপের ভোগবাদী জীবনাদর্শকে এই উম্মাহর অধিকাংশ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, বুঝে বা না-বুঝে গ্রহণ করে নিল।  আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি, উম্মাহ আজ শরীয়াহ’র বদলে সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রকে, কুরআনের বদলে মানবরচিত সংবিধানকে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বদলে শেখ মুজিব বা কামাল পাশাকে, আলিমদের পরিবর্তে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের বেছে নিয়েছে।  যারা সচেতনভাবে বাতিলকে হকের ওপর গ্রহণ করে নিয়েছে, তাদের কুফর ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্ট।  কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই উম্মাহর এক বিরাট অংশ গাফিলতি ও অজ্ঞতাবশত এই মরীচিকার পেছনে ছুটছে।  ওয়াল্লাহুল মুস্তা’আন। 

উম্মাহর এই দুরবস্থার জন্য কাফির-মুরতাদ-মুনাফিক গোষ্ঠীর অনবরত চক্রান্ত এবং গোমরাহ, বেতনভোগী আলিম-দাঈরা যেমন দায়ী, একইভাবে উম্মাহর হিদায়াতপ্রাপ্ত ও বুঝদার অংশটির একক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাবও সমানভাবে দায়ী।  অক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে এই উম্মাহর মাঝে, পর্যাপ্ত সংখ্যক সুযোগ্য, মুখলিস দাঈ ইলাল্লাহ’র অভাবে।  ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুশি দাইয়্যান, থিওডর হার্জেল বা টি আই লরেন্স উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছে, জীবনের ওপর মৃত্যুকে প্রাধান্য দিয়েছে—খিলাফতের অবশিষ্টাংশটুকুও মুছে ফেলতে এবং ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।  আর অব্যবহিত কাল পরেই তারা সফল হয়েছে।  লেনিন, স্ট্যালিন, ট্রটস্কিরা কারাগার আর নির্বাসনের মাঝে জীবন পার করা সত্ত্বেও অন্তঃসারশূন্য, বাস্তবতা বিবর্জিত এক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র।

এমনকি, মাত্র ৪০ বছর পূর্বের স্থাপিত শিয়া রাষ্ট্র ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দোর্দণ্ড প্রতাপে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।  নিজেদের চিন্তাধারা, রাজনৈতিক ও কূটনীতিক কর্মসূচির প্রভাব পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তার করতে তাদের জেনারেলরা বিরামহীন সফরে জীবন অতিবাহিত করছে।

সমস্যা কেবল জনসাধারণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলেও হয়তো ক্রান্তিকাল এত দীর্ঘায়িত হতো না।  এখনো মুসলিম ভূখণ্ডসমূহের কিছুসংখ্যক ছাড়া বাকিগুলোতে ইসলামী বিপ্লবের অগ্রযাত্রা থমকে আছে।  আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক দুনিয়াতে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে একমাত্র আল্লাহর দাস বানানো, তাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আনা, সকল তাগুতের প্রতাপ নির্মূল করা এবং জমিনকে নৈরাজ্য থেকে মুক্ত করা।

উম্মাহর পূর্বসূরি ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা এই দ্বীন বুঝেছিলেন এবং তা পালনও করেছিলেন।  ফলে এটা তাদের অন্তরে একটি বদ্ধমূল চিত্র ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়।  এ কারণে তাঁরা রিসালাতের বুঝ ও ইলম দেশে দেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। 

ইমাম তাবারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

“সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের আবেদনের প্রেক্ষিতে রিবয়ী’ ইবনু আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে রুস্তমের উদ্দেশ্যে কাদিসিয়া অভিমুখে প্রেরণ করেন।

তখন সে জিজ্ঞেস করল: ‘তোমরা কী কারণে এসেছ?’

রিবয়ী’ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: ‘আল্লাহ আমাদেরকে পাঠিয়েছেন।  তিনি আমাদেরকে নিয়ে এসেছেন, যেন আমরা তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাদেরকে তিনি চান, তাদেরকে বান্দাদের দাসত্ব থেকে তাঁর দাসত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারি, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে পারি এবং সকল দ্বীনের (জীবনাদর্শের) জুলুম থেকে ইসলামের ইনসাফের দিকে নিয়ে যেতে পারি।

তাই তিনি আমাদেরকে তাঁর দ্বীন দিয়ে তাঁর বান্দাদের নিকট প্রেরণ করেছেন, যেন আমরা তাদেরকে তাঁর দিকে আহ্বান করি।  সুতরাং যে আমাদের থেকে তা গ্রহণ করবে, আমরা তাকে মেনে নেবো, তার থেকে ফিরে যাব এবং তাকে তার নেতৃত্বে বহাল রাখব।  আর যে তা প্রত্যাখ্যান করবে, আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকব, যতক্ষণ না আল্লাহর প্রতিশ্রুত বিষয়ের দিকে পৌঁছে যাই।’

সে জিজ্ঞেস করল: ‘প্রতিশ্রুত বিষয় কী?’ 

বললেন: ‘তা হলো, যে অবাধ্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিহত হবে, তার জন্য আছে জান্নাত।  আর যে বেঁচে থাকবে, তার জন্য আছে বিজয়।’”

তারপর উম্মতের ওপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হলো, সময়ের পরিক্রমায় পিছুটান শুরু হলো, প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া হলো।  যেন যুগ সে সময়ের দিকে ঘুরে গেল, যে সময় তা শুরু হয়েছিল।  দ্বীন তার প্রাথমিক অপরিচিত অবস্থার দিকে ফিরে গেল। যেমন হাদীসের মধ্যে এসেছে–

“ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছে।  অচিরেই তা যেভাবে শুরু হয়েছে, সে অবস্থার দিকেই ফিরে যাবে।  আর সেসকল অপরিচিতদের জন্য আছে সুসংবাদ।”

ইবনু খালদুনের ভাষায়–

“যেন মহাবিশ্বের মুখপাত্র বিশ্বকে নিস্তেজতা ও সংকোচনের ডাক দিল, আর বিশ্ব সঙ্গে সঙ্গে তাতে সাড়া দিল।”

পৃথিবীর এই নিস্প্রভতার পর সংস্কারের প্রয়োজন হয়।  সংস্কার (তাজদিদ) তো সেই অস্পষ্টতার পরেই হয়ে থাকে, যে অস্পষ্টতাকে ভিন্নভাবে বলা যায়- ইসলাম অপরিচিত হয়ে যাওয়া।  এই সংস্কার ইতিপূর্বে করে থাকতেন নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম), যার পূর্ণতা লাভ হয় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে। তারপর দ্বীনের নবজাগরণের দায়িত্ব বর্তায় উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর।  যাদের পরিচয়,

وَ كَاَیِّنۡ مِّنۡ نَّبِیٍّ قٰتَلَ مَعَهٗ رِبِّیُّوۡنَ كَثِیۡرٌ ۚ فَمَا وَهَنُوۡا لِمَاۤ اَصَابَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ مَا ضَعُفُوۡا وَ مَا اسۡتَكَانُوۡا وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الصّٰبِرِیۡنَ

“আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে।  তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে, তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি।  আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি।  আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন।” 

উকবা ইবনু আমির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন,

عن عقبة بن عامر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: لا تزال عصابة من أمتي يقاتلون على أمر الله قاهرين لعدوهم، لا يضرهم من خالفهم، حتى تأتيهم الساعة وهم على ذلك

“আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ‘আমার উম্মতের একদল শত্রুদের পরাস্তকারী হয়ে আল্লাহর নির্দেশের ওপর অবিচল থেকে, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।  তাদের বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।  কিয়ামত পর্যন্ত তারা এ অবস্থার ওপর চলমান থাকবে।’”

নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আগমনের ধারা সমাপ্ত হবার পর, মানুষকে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনার মহান দায়িত্ব বুঝে নেন নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পতাকাবাহীরা; যাদের প্রথম ব্যক্তি ছিলেন আস-সিদ্দীক আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।  অতঃপর, যুগে যুগে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) উত্তরসূরিরা বারবার পতনের পর আল্লাহর দ্বীনের উত্থান ঘটিয়েছেন।  যা আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ বহন করে।  কেননা, আমাদের ইমাম মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন,

عن المغيرة بن شعبة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا يزال من أمتي قوم ظاهرين على الناس حتى يأتيهم أمر الله وهم ظاهرون

মুগিরা ইবনু শু’বা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “আমার উম্মতের একটি সম্প্রদায় সর্বদা মানুষের ওপর বিজয়ী থাকবে।  আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত তারা বিজয়ী থাকবে।”

যুগে যুগে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) মানহাজ আঁকড়ে ধরা আল্লাহওয়ালাদের কাফেলাই জমিনে হিদায়াতের চেরাগ জ্বালিয়ে রাখেন।  কুফর ও জুলুমের বিরুদ্ধে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে ইসলামের পতাকা বহন করেন।  বারবারই যখন উম্মাহ তাওহীদের দাবি থেকে সরে গিয়ে নিজেদের ভুলের মাশুল দিয়েছে আর তখনই নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) প্রকৃত উত্তরসূরিরা দাঁড়িয়ে গেছেন, বিপরীত দিকে ঘুরে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা সঠিক পথে ফিরিয়ে দিয়েছেন।  মু’তাজিলা, ক্রুসেডার, উবাইদিয়া বা তাতারদের ফিতনার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে আল্লাহর দ্বীন ও উম্মতকে সুরক্ষা দিতে এগিয়ে এসেছেন নবীজির পতাকাবাহীরা।  যেমন—আবু বকর, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, ইবনু তাইমিয়া, সাইফুদ্দিন কুতুজ বা মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল ওয়াহহাব প্রমুখ ইমামগণ।  রাদিয়াল্লাহু আনহুম।

এখন সময় এসেছে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) উত্তরাধিকারী, নেককার পূর্বসূরিদের ন্যায় পুনরায় জাতিকে সংস্কারের।  পাশাপাশি এ-ও উল্লেখ্য, তাওহীদের কর্তৃত্ব কেবল রাজনৈতিক, জ্ঞানগত বা অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।  নবীগণ ও সালাফ আস সালেহিনদের উদ্দেশ্য এমন সীমাবদ্ধ ছিল না।  বরং, সকল ক্ষেত্রেই তাওহীদের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য, যার প্রধানতম বাধা ছিল জাতির মাঝে কুফরের কর্তৃত্ব।  তাই, সমাজে কুফরের নেতাদের কর্তৃত্বকে ইসলামের কর্তৃত্ব দ্বারা প্রতিস্থাপন করাই আমাদের মহান পূর্বসূরীদের লক্ষ্য ছিল।  তাঁদের সামগ্রিক লক্ষ্য ছিল মানুষকে নিজের খেয়ালখুশি, সকল প্রকার ভ্রান্ত চিন্তা ও সীমা লঙ্ঘনকারীর (চাই উক্ত ব্যক্তি বা সত্তা হোক নিজ পিতা, পরিবার, পীর, শাসক বা মুরব্বি) আনুগত্য থেকে মুক্ত করে এককভাবে আল্লাহর আনুগত্যের অধীনে নিয়ে আসা।

এ বিষয়টি ভুলে যাওয়ার কারণেই, কোনো কোনো গোষ্ঠী কেবল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জনকে লক্ষ্য সাব্যস্ত করে, ভ্রান্ত আক্বীদাহ ও মতবাদসমূহকে মেনে নিয়েছে।  রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে সকল প্রকার আপস ও হীনমন্যতা মেনে নিয়ে তারা অগ্রসর হচ্ছেন, অথচ নিজেদেরকে মানহাজুল আম্বিয়ার পতাকাবাহীও মনে করছেন। 

আবার, অনেকেই কেবল মুসলিমদের মাঝে বিদ্যমান কিছু ভ্রান্ত চিন্তার অপনোদন আর শাখাগত মাসয়ালার বিতর্কে মশগুল হয়ে কুফরের রাজনৈতিক ও সামগ্রিক আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে রয়েছে!

তাই নববী মানহাজের অনুসারী মুমিনদের জন্য সকল প্রকার বাতিলের অপসারণে ফিকির ও মেহনত করা জরুরি, যেন দ্বীন কেবল আল্লাহর জন্যই হয়ে যায়।  তবে, অবশ্যই কুফর ও বাতিলের মাত্রা অনুযায়ী ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।  আর এজন্যই, শরীয়াহসম্মত সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে কুফরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অপসারণ এবং জাতির ধারাবাহিক ঈমানী ও চিন্তাগত পরিশুদ্ধির আন্দোলনই তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

শায়খ উমার মাহমুদ উসমান বলেন,

“নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মাঝে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) কর্মতৎপরতার কুরআনী বিবরণের মাধ্যমে ফুটে উঠে যে, তাঁরা সকলেই একটি মৌলিক বিষয়ে এক ছিলেন।  এটাই সেই হাদীসের কথা, যাতে বলা হয়েছে—

‘মানুষের সাথে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) লড়াই ও সংঘাতের উদ্দেশ্য ছিল- মানুষের মাঝে আল্লাহর উবুদিয়্যাহ বা দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করা।’

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে মানুষ সবচেয়ে বড় যে বিপদে আক্রান্ত হয়, তা হলো শিরক।  এটা মানবজীবনের সবচেয়ে বড় জুলুম বা অন্যায়। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

إن الشرك لظلم عظيم

‘নিশ্চয়ই শিরক ভয়াবহ জুলুম।’ 

নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) লড়াই ছিল এই বক্রতাকে সোজা করার উদ্দেশ্যে এবং তাকে সঠিক পথে, অর্থাৎ তাওহীদের পথে ফেরানোর উদ্দেশ্যে।  যেহেতু নবীগণ আল্লাহর দূত ও তাঁর দাস, এ কারণে তাঁরা সর্বপ্রথম যে দায়িত্বটি পালন করেন, তা হলো পৃথিবীতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং এই সুরক্ষিত বিষয়ের ক্ষেত্রে মানুষ যে অন্যায়ে লিপ্ত হয়ে পড়েছে, তা মানুষের সামনে উম্মোচন করা।

যদিও এটা এমন এক অন্যায়, যা আরও বহু অন্যায়ের জনক।  যেমন- সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জুলুম ইত্যাদি।  কিন্তু প্রথম হকটির সংশোধন ছাড়া এ সবগুলোর সংশোধন আলাদাভাবে হওয়া সম্ভব নয়।

…এই শেকড়টি পাশ কাটিয়ে গেলে একজন মুসলিম আল্লাহর সেই দাসত্ব থেকে দূরে সরে যাবে, যা তার কর্তব্য ছিল।  আর সেই কর্তব্য হলো নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) দাওয়াতের বাস্তবায়নকারী হওয়া।

সরাসরি বলতে গেলে বলতে পারি, একজন মুসলিম যখন সামাজিক বিশৃঙ্খলাগুলো দূর করার জন্য নিজেকে একজন সমাজ সংস্কারকরূপে দাঁড় করায়, অথবা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাগুলো দূর করার জন্য নিজেকে একজন রাজনৈতিক সংস্কারক রূপে দাঁড় করায়, অথবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য নিজেকে একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরূপে দাঁড় করায়, তখন এই ভূমিকাগুলোর মাঝে কুরআনে বর্ণিত নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) মেহনতের প্রধান চিত্রটির অনেকগুলো নিদর্শন অনুপস্থিত দেখা যায়।

এর আলোকে আমরা প্রতিটি ইসলামী দলের প্রকৃত রূপ জানতে পারি; অর্থাৎ তারা কুরআনে বর্ণিত নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) দাওয়াত থেকে কতটা নিকটে বা কতটা দূরে।  আমরা স্মরণ করতে পারি যে, নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাথে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) যুদ্ধটি ছিল শিরকের মোকাবিলায় তাওহীদের যুদ্ধ।  অর্থাৎ তাওহীদের পতাকাতলে যুদ্ধ।”

তাই, সমাজে তাওহীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব।  মৌলিক দাওয়াতকে পাশ কাটিয়ে শাখাগত সংস্কারের চিন্তা হবে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) দাওয়াতের বিপরীত অবস্থান।  এখন যদি আমরা তাওহীদের বিপ্লব চাই; যেমন চেয়েছিলেন নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম); তাহলে করণীয় কী?


(৩)

আমরা যদি আমাদের ভূখণ্ডে আল্লাহ তা’আলার ওয়াদার বাস্তবায়ন দেখতে চাই, ইসলামের শাসন ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে চাই; তবে ইসলামী আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাইয়্যিদুল মুরসালিন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহ ও সালাফে সালেহিনের মানহাজ আঁকড়ে ধরা আবশ্যক!

মানহাজ বলতে বোঝানো হয়- কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহীনগন যেভাবে বুঝেছেন, সেভাবেই সঠিক বোঝাপড়া পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য আমরা যে পদ্ধতি বা মাধ্যম অবলম্বন করি। হক পর্যন্ত পৌঁছানোর অনেক মাধ্যম বা পথ থাকতে পারে।  যেমন কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

وَمَنۡ یُّشَاقِقِ الرَّسُوۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُ الۡہُدٰی وَیَتَّبِعۡ غَیۡرَ سَبِیۡلِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ نُوَلِّہٖ مَا تَوَلّٰی وَنُصۡلِہٖ جَہَنَّمَ   وَسَآءَتۡ مَصِیۡرًا

“যে ব্যক্তি সত্য পথ প্রকাশিত হওয়ার পরও রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মু’মিনদের পথসমূহ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সে পথেই ফিরাব যে পথে সে ফিরে যায়, আর তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব, কত মন্দই না সে আবাস!”

একারণেই বিশ্বস্ত ও হকপন্থী সমসাময়িক আলেমদের অনুসরণের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়।  অন্ধ অনুসরণের জন্য নয়, বরং তাঁদেরকে সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করে নেককার পূর্বসূরীদের বুঝ পর্যন্ত পৌঁছানোর লক্ষ্যেই তা করা হয়।  এটাই বর্তমান যুগে সালাফদের উসূল ও মানহাজে পৌঁছার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতি।

আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য যেভাবে সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরে থেকে অন্য মাধ্যমে কল্যাণলাভ সম্ভব নয়।  আর এই সুস্পষ্ট লক্ষ্য থেকে মানুষ সরে গেছে মূলত সালাফদের মানহাজের আলোকে এই মহান লক্ষ্যকে বুঝতে না পারায়।

যখন শাসনকর্তৃত্বে কুফরি শক্তি, যখন পরিবার থেকে সমাজের সর্বত্র ইসলামকে অপসারণে সেক্যুলাররা তৎপর; তখন করণীয় কি?  সালাফদের মানহাজের আলোকে তা বুঝতে না পারাই আমাদের পিছিয়ে পড়ার প্রথম কারণ।

অথচ, নামায, রোজা, জবাই, দু’আ, মান্নত ইত্যাদি ইবাদাতসমূহের মত শাসনকতৃত্বও একটি ইবাদত।  এগুলোর মাঝে কোন ব্যবধান নেই।  আল্লাহ তা’আলা বলেন,

إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ أَمَرَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ

“শাসন একমাত্র আল্লাহরই জন্য, তিনি আদেশ করেছেন, তোমরা একমাত্র তারই ইবাদত কর।  এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

وَهُوَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُولَى وَالْآخِرَةِ وَلَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“তিনিই আল্লাহ।  তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।  ইহলোকে ও পরলোকে প্রশংসা শুধু তারই জন্য।  শাসনের অধিকারও শুধু তারই আর তোমাদেরকে তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করানো হবে।”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ

“শাসন শুরু আল্লাহরই জন্য।  আমি তার উপরই ভরসা করেছি আর ভরসাকারীদের তার উপরই ভরসা করা উচিত।”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

أَلاَ لَهُ الْحُكْمُ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ

“জেনে রেখ, শাসন শুধু তারই অধিকার।  তিনি সর্বাপেক্ষা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

وَكَذَلِكَ أَنزَلْنَاهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءهُم بَعْدَ مَا جَاءكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللّهِ مِن وَلِيٍّ وَلاَ وَاقٍ

“এভাবে আমি কুরআন অবতরণ করেছি শাসন-বিধান রূপে, আরবী ভাষায়।  তোমার নিকট জ্ঞান আসার পরও তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর, তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষক থাকবে না।”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

“আর তিনি তার শাসন কর্তৃত্বে কাউকে শরীক করেন না।”

অতএব, এককভাবে আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করাই দাবি করে, হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রেও তিনি একক হবেন।

যেমন,  আল্লাহ তা’আলা বলেন,

اتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُواْ إِلاَّ لِيَعْبُدُواْ إِلَـهًا وَاحِدًا لاَّ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

“তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মীয় গুরু ও সংসার বিরাগীদেরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়াম পুত্র মাসীহ-কেও।  অথচ তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্য। যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।  যিনি তাদের শিরক থেকে পবিত্র।”

এ সকল আয়াতগুলো প্রমাণ করে: শাসন-কর্তৃত্ব বা হাকিমিয়্যাতে আল্লাহকে একক সাব্যস্ত করা আল্লাহ তা’আলাকে ইবাদাতের ক্ষেত্রে একক মানার অন্তর্ভূক্ত। 

যে শাসনের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করে, সে ঐ ব্যক্তির মতই, যে অন্য যেকোন প্রকার ইবাদাতে শরীক করে।

আল্লামা শানক্বিতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

 اعْلَمُوا أَيُّهَا الإِخْوَانُ: أَنَّ الإِشْرَاكَ بِاللَّهِ فِي حُكْمِهِ، وَالإِشْرَاكَ بِهِ فِي عِبَادَتِهِ كِلَاهُمَا بِمَعْنًى وَاحِدٍ، لَا فَرْقَ بَيْنَهُمَا الْبَتَّةَ؛ فَالَّذِي يَتَّبِعُ نِظَامًا غَيْرَ نِظَامِ اللَّهِ، وَتَشْرِيعًا غَيْرَ مَا شَرَعَهُ اللَّهُ، وَقَانُونًا مُخَالِفًا لِشَرْعِ اللَّهِ مِنْ وَضْعِ الْبَشَرِ، مُعْرِضًا عَنْ نُورِ السَّمَاءِ الَّذِي أَنْزَلَهُ اللَّهُ عَلَى لِسَانِ رَسُولِهِ؛ مَنْ كَانَ يَفْعَلُ هَذَا: هُوَ وَمَنْ يَعْبُدُ الصَّنَمَ وَيَسْجُدُ لِلْوَثَنِ، لَا فَرْقَ بَيْنَهُمَا الْبَتَّةَ بِوَجْهٍ مِنَ الْوُجُوهِ؛ فَهُمَا وَاحِدٌ، فَكِلَاهُمَا مُشْرِكٌ بِاللَّهِ؛ هَذَا أَشْرَكَ بِهِ فِي عِبَادَتِهِ، وَهَذَا أَشْرَكَ بِهِ فِي حُكْمِهِ، وَالإِشْرَاكُ بِهِ فِي عِبَادَتِهِ، وَالإِشْرَاكُ بِهِ فِي حُكْمِهِ كِلَاهُمَا سَوَاءٌ 


“হে ভাইয়েরা! জেনে রাখুন, আল্লাহর শাসন-বিধানে তাঁর সঙ্গে শরিক করা এবং তাঁর ইবাদতে তাঁর সঙ্গে শরিক করা-উভয়ের অর্থ একই; এ দুটির মধ্যে আদৌ কোনো পার্থক্য নেই। 

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর দীন ছাড়া অন্য কোনো দীনের অনুসরণ করে, আল্লাহ যা বিধান দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোনো আইন/বিধান গ্রহণ করে এবং মানুষের প্রণীত এমন কোনো আইন অনুসরণ করে -যা আল্লাহর শরিয়তের বিরোধী- এবং এভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে যে আসমানি আলো নাযিল করেছেন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়-সে ব্যক্তি এমনটি করে, আর মূর্তির উপাসনা ও মূর্তির সামনে সিজদাকারী-ব্যক্তির মধ্যে কোনো দিক থেকে আদৌ কোনো পার্থক্য নেই। 

উভয়ই এক। উভয়েই আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী।  একজন তাঁর ইবাদতে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করেছে, আর অন্যজন তাঁর শাসন-বিধানে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করেছে।  আর আল্লাহর ইবাদতে তাঁর সঙ্গে শরিক করা এবং তাঁর শাসন-বিধানে তাঁর সঙ্গে শরিক করা-উভয়ই সমান।”

সালিম ইবনে আবুল জা’দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিআল্লাহু আনহু) কে বলা হল, সুহত কি?  তিনি বললেন, ঘুষ।  তারা বলল, ফায়সালা করার ক্ষেত্রে?  তিনি বললেন, এটা তো কুফর।

তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন, 

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللّهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ 

“যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসন করে না, এ সকল লোক কাফের।”  (সুরা মায়েদা ৫:৪৪) 

ঘটনাটি ইমাম তাবারী, আবু ইয়ালা ও অন্যান্যরাও বর্ণনা করেন।  তার থেকে বিশুদ্ধভাবে এটা বর্ণিত হওয়ার ব্যাপারে কোন মতবিরোধ নেই।

ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“আল্লাহ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর যা নাযিল করেছে,  তা দ্বারা শাসন করাই হল ইনসাফ।  এটাই ইনসাফের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম প্রকার।

এর দ্বারা শাসন করা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর এবং যারা তার অনুসরণ করে তাদের উপর ওয়াজিব।  আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিধানকে শিরোধার্য করে না, সে কাফের।”

ইবনে আব্দুল বার (রহিমাহুল্লাহ) ইসহাক ইবনে রাহওয়াই থেকে বর্ণনা করেন, 

“এ ব্যাপারে আলেমগণের ইজমা হয়েছে যে, যে আল্লাহর অবতীর্ণ কোন বিষয় প্রত্যাখ্যান করে বা কোন নবীকে হত্যা করে আর এমতাবস্থায় সে আল্লাহর অবতীর্ণ বিষয়কে মৌখিকভাবে স্বীকারও করে, তাহলেও সে কাফের।”

এই কথাটি লক্ষণীয়!  ইমাম বলছেন, “যদিও এমতাবস্থায় সে আল্লাহর অবতীর্ণ বিষয়কে মৌখিকভাবে স্বীকার করে, তাহলেও সে কাফের।”

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ (أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ - “তারা কি জাহিলিয়াতের শাসন কামনা করে? বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর শাসন অপেক্ষা উত্তম শাসন আর কি আছে?”) -এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন,

“যে সকল কল্যাণের ধারক ও অকল্যাণের অপসারক আল্লাহর সুদৃঢ় বিধান থেকে বের হয়ে যায় এবং মানুষের গড়া ও শরীয়ত থেকে সম্পর্কমুক্ত মতামত ও খেয়াল-খুশির প্রতি প্রত্যাবর্তন করে,

যেমন বর্বরতার যুগের লোকেরা পথভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার বিষয়াবলী দ্বারা শাসন করত, সে কাফের; তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না সে আল্লাহর শরীয়াহ’র শাসনের প্রতি ফিরে আসে; অত:পর কম/বেশি কোন ক্ষেত্রে অন্য কিছুর শাসন না মানে।”

তাতার জাতি যে ‘ইয়াসিক’ নামক সংবিধান দ্বারা শাসন করত, তার কিছু অংশ ইমাম জুওয়াইনীর সুত্রে বর্ণনা করার পর ইবনে কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“তাই যখন, যে শেষ নবী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর প্রতি অবতীর্ণ সুদৃঢ় শরীয়তকে পরিত্যাগ করে অন্য কোন রহিত শরীয়তের বিধান দ্বারা শাসন করে, সে কাফের হয়ে যায়,

তখন যে ইয়াসিক দ্বারা শাসন করে এবং তাকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শরীয়তের উপর প্রাধ্যন্য দেয়, তার অবস্থা কি হবে?

অতএব যে এমনটা করবে সে মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যাবে।”

ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“অত:পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা জানালেন যে, যে রাসূলের আনিত বিধান ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা বিচার করল বা অন্য কিছুর নিকট বিচার প্রার্থনা করল, সে তাগুতকে শাসক বানালো বা তাগুতের নিকট বিচার প্রার্থনা করল।

আর তাগুত হল, যার ব্যাপারে বান্দা সীমালঙ্ঘন করে, চাই সে উপাস্য হোক বা অনুসৃত হোক বা মান্যবর হোক।

সুতরাং প্রত্যেক কওমের তাগুত হল, তারা আল্লাহ ও তার রাসূল ব্যতীত যাদের নিকট বিচার প্রার্থনা করে, অথবা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদাত করে, অথবা যাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ ব্যতীত অনুসরণ করে, অথবা এমন বিষয়ে আনুগত্য করে, যে বিষয়ে সে জানে না যে, এতে আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে কি না।”

শাসনকর্তৃত্বে ইসলামের নিরঙ্কুশ আনুগত্যকে আল্লাহ তা’আলা ঈমানের অংশ গণ্য করেছেন।  আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيمًا

“না, তোমার রবের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের বিবাদমান বিষয়ে তোমাকে ফায়সালাকারী বানায়, অতঃপর তাদের অন্তরে কোন সংকোচ না থাকে এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করে।”

এই আয়াতের উপর ইমাম ইবনে হাযম  (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“এখানে আল্লাহ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে শাসনকর্তৃত্ব দেওয়াকে ঈমান বললেন।

আল্লাহ তা’আলা আরও জানালেন, এটা ছাড়া কোন ঈমান নেই।  উপরন্তু তিনি যে ফায়সালা করেন, তার ব্যাপারে অন্তরে কোন সংকোচ থাকতে পারবে না।

সুতরাং নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হল, ঈমান- আমল, আক্বীদাহ ও কথার নাম।  কেননা শাসন কর্তৃত্ব দেওয়া একটি আমল।  আর তা কথা ছাড়া বাস্তবায়িত হয় না।  আর অন্তরের সংকোচ ছাড়া হতে হবে, তা হচ্ছে বিশ্বাস।”

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

“একারণেই শরীয়ত তার বিধানের শাসন মেনে নেওয়াকে আবশ্যক করেছে এবং একে ঈমানের জন্য শর্ত বানিয়েছে।  আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ

“আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের পরস্পরে বিরোধ হয়, তাহলে তা আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে ফিরাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাক।”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্য আয়াতে বলেন,

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ

“তোমরা যেকোন বিষয়ে মতবিরোধ করলে, তার ফায়সালার ভার আল্লাহর উপর।” (সুরা শূরা ৪২:১০)

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন,

“সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিধান তথা কুরআন ও সুন্নাহ, যা দিয়ে আল্লাহ তার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে প্রেরণ করেছেন, তার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারো অধিকার নেই; একমাত্র কাফেরই তার থেকে বের হয়ে যেতে পারে।”

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন,

“যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সুন্নাহ ও তার আনিত শরীয়ত থেকে বেরিয়ে যায়, তার ব্যাপারে আল্লাহ স্বীয় পবিত্র সত্ত্বার শপথ করে বলেছেন, ‘সে কিছুতেই মুমিন হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের মাঝে বিবাদমান সকল দ্বীনী ও দুনিয়াবী বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে ফায়সালাকারী না মানে এবং তার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোন সংকোচ না থাকে।’”

সালাফে সালেহিনদের মানহাজের আলোকে সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম আমাদের সময়ের সেক্যুলার শাসকদের ব্যাপারে বিধান স্পষ্ট করতে গিয়ে লিখেছেন- 

“যে আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান ব্যতীত অন্য কিছুর দ্বারা শাসন করল, সে কুফরীতে লিপ্ত হল।  তখন তার উপর হুজ্জাহ প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তথা তাকফীরের সকল শর্তগুলো পূরণ করা হবে এবং সকল বাঁধাগুলো নিশ্চিতভাবে দূর করা হবে; সন্দেহপূর্ণভাবে নয়।  যদি সে তাওবা করে তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।  আর যদি প্রমাণ ও দলিল পেশ করা সত্ত্বেও, তাতে অটল থাকে ও অহংকার করে তাহলে তার উপর আল্লাহ প্রদত্ত কুফরের হুকুম কার্যকর হবে।”

আর যখন কোনো ইসলামী দেশে কুফরি শাসন কায়েম হয়, সেক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কেও ইসলামের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আমাদের সামনে রয়েছে।

উবাদা ইবনে সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

دعانا النبي صلى الله عليه وسلم فَبَايَعْنَاهُ. فكان فيما أخذ علينا أَنْ بَايَعَنَا على السمع والطاعة في مَنشَطِنا ومَكْرَهِنا، وعُسرنا ويُسرنا، وَأَثَرَة علينا، وَأَنْ لا نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَه. قَالَ: إِلاَّ أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ


“আমাদেরকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকলেন এবং আমরা তাঁর হাতে বাইআতবদ্ধ হলাম।  রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের কাছ থেকে যে বিষয়গুলোর ওপর বাইআত নিলেন, তা হলো- আমাদের পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় বিষয়ে, সুখে-দুঃখে এবং আমাদের ওপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও আমরা (আমীরের কথা) শুনব ও আনুগত্য করব এবং দায়িত্বশীলদের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে বিবাদে জড়াব না।”

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা কোনো স্পষ্ট কুফর দেখতে পাও, যার ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।”

আউফ ইবনে মালিক (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

خِيارُ أئمتكم الذين تُحِبُّونَهُمْ ويُحِبُّونَكُمْ، ويُصَلُّون عليكم وتُصَلُّون عليهم. وشِرارُ أئمتكم الذين تُبْغِضُونَهم ويُبْغِضُونَكم، وتُلْعَنُوْنَهم ويُلْعَنُونُكم. قِيلَ يا رسولَ الله، أفلا نُنابِذُهم بالسيف؟ فقال: لا؛ ما أقاموا فيكم الصلاةَ. 


“তোমাদের মধ্যে উত্তম শাসক হলো তারা, যাদেরকে তোমরা ভালোবাসবে এবং তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসবে, তোমরা তাদের জন্য দোয়া করবে এবং তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করবে।  আর তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট শাসক হলো তারা, যাদেরকে তোমরা অপছন্দ করবে এবং তারাও তোমাদেরকে অপছন্দ করবে, যাদেরকে তোমরা লানত করবে এবং তারাও তোমাদেরকে লানত করবে।”

বলা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তরবারি দ্বারা তাদের মোকাবিলা করব না?” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “না; যতদিন তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করে।”

উম্মুল হুসাইন আল-আহমাসিয়্যাহ (রাদিআল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন,

وَعَنْ أُمِّ الْحُصَيْنِ الأحْمَسِيَّةِ أَنَّهَا سَمِعْت النَّبِيَّ يَقُولُ: اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَإِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ مَا أَقَامَ فِيكُمْ كِتَابَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ 


“তোমরা শোনো এবং আনুগত্য করো, যদিও একজন হাবশি গোলামকে তোমাদের আমীর বানিয়ে দেওয়া হয়, যতক্ষণ সে তোমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ’কে প্রতিষ্ঠিত রাখে।”

ইয়াহইয়া ইবনে হুসাইন বলেন, আমি আমার দাদা থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিদায় হজ্বে বলতে শুনেছি,

 ولو اْسْتُعْمِلَ عليكُم عبْدُ حَبَشِيٌّ يَقُوْدُكُم بكتاب الله فاسمَعُوا له وأطِيْعُوا

“যদি কোনো হাবশি গোলামকেও তোমাদের দায়িত্বশীল নিয়োগ করা হয়, যে তোমাদেরকে কিতাবুল্লাহ দিয়ে পরিচালনা করে, তাহলে তার আদেশ শুনবে ও মানবে।”

এই সুস্পষ্ট হাদিসগুলোর পাশাপাশি উলামায়ে কেরামের বক্তব্যকেও সামনে রাখলে দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুফরি শাসনের অপসারণের আবশ্যকতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

فإن أَمَرَ بمعصيةٍ فلا تَجُوْزُ طاعتُه في تلكَ المعصيَة قولاً واحدًا، ثم إنْ كانتْ تلكَ المعصيةُ كُفرًا: وَجَبَ خَلْعُه على المسلمين كلِّهم. وكذلك: لو تَرَكَ إقامةَ قاعدةٍ من قواعدِ الدينِ؛ كإقامة الصلاةِ، وصومِ رمضانَ، وإقامة الحدودِ، ومَنَعَ من ذلكَ. وكذلك لو أباحَ شُربَ الخَمَرِ، والزِّنى، ولم يَمنَعْ منهما، لا يُخْتَلَفُ في وُجوبِ خَلْعِهِ"


“শাসক যদি গুনাহের আদেশ করে, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে সেই গুনাহের কাজে তার আনুগত্য করা জায়েয হবে না।  এখন সেই গুনাহটি যদি কুফর হয়, তাহলে সকল মুসলমানের ওপর তাকে অপসারণ করা ফরজ হয়।

একইভাবে সে যদি দ্বীনের কোনো মৌলিক বিধান, যেমন নামাজ, রমাদানের রোজা, হুদুদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা ছেড়ে দেয় এবং সেগুলো পালনে বাধা দেয়, তদ্রূপ সে যদি মদপান ও ব্যভিচারকে বৈধতা দান করে এবং সেগুলো থেকে বারণ না করে, তাহলে তার অপসারণ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।”

ইবনে বাত্তাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

قال أبو بكر بن الطيب: أجمعت الأُمَّةُ أنه يُوجِبُ خَلْعَ الإمامِ وسُقوطَ فرضِ طاعتِه كُفرُه بعدَ الإيمانِ، وتركُه إقامةَ الصلاة والدعاءَ إليها، واختلفوا إذا كان فاسقًا ظالمًاً غاصبًا للأموالِ"


“আবু বকর ইবনুত তায়্যিব বলেন, উম্মাহ এ বিষয়ে ইজমা করেছেন যে, ঈমান গ্রহণের পর শাসক কুফরি করলে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা ও নামাজের দিকে আহ্বান করা ছেড়ে দিলে তাকে অপসারণ করা ফরজ হয়ে যায় এবং তার আনুগত্যের আবশ্যকতা শেষ হয়ে যায়।”

ইমাম কাজী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,

أجمع العلماءُ على أن الإمامةَ لاتنعقدُ لكافرٍ وعلى أنه لو طَرَأَ عليه الكفرُ انعزلَ، قال: وكذا لو تركِ إقامةَ الصلواتِ والدعاءَ إليها.


“উলামায়ে কেরাম সবাই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, কোনো কাফিরকে ইমাম নিযুক্ত করলে সে ইমাম হবে না।  আর ইমামের মাঝে যদি কুফরি প্রকাশ পায়, তাহলে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপসারিত হয়ে যাবে।  তিনি আরও বলেন, একইভাবে শাসক যদি নামাজ কায়েম করা অথবা নামাজের দিকে আহ্বান করা ছেড়ে দেয়, (তাহলেও সে অপসারিত হয়ে যাবে)।”

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসগুলো ও পূর্বসূরী উলামাদের বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, শাসকের বিরুদ্ধে ততক্ষণ লড়াই করা হয় না- যতক্ষণ তার মাঝে কোনো ‘কুফরে বাওয়াহ’ বা সুস্পষ্ট কুফর দেখা না যায়।  অন্য আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নামাজ কায়েম রাখে।  অপর দুটি হাদিসে বলা হয়েছে, যতক্ষণ সে মানুষের মাঝে কিতাবুল্লাহ’কে প্রতিষ্ঠিত রাখে; তথা কুরআনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করে।  পক্ষান্তরে এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, শাসক থেকে যদি ‘কুফরে বাওয়াহ’ বা সুস্পষ্ট কুফর প্রকাশ পায়, অথবা কুরআন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা না করে, অথবা নামাজসহ ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো প্রতিষ্ঠা না করে, তাহলে সে আর মুসলমানদের শাসক হিসেবে বাকী থাকে না; তাই তাকে অপসারণ করে এমন একজন শাসক নিয়োগ করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব হয়ে যায়,  যিনি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

এই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সময়ে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) সংগ্রামের পূর্ণতা বিধানের লক্ষ্যে সঠিক মানহাজের ব্যাপারে পরিচয় লাভ করা এবং তা অনুসরণ করার গুরুত্ব অপরিসীম। 

শায়খ মুস্তফা নাসির বলেন, 

“প্রত্যেক জামাআতের আচরণ, কার্যক্রম তাদের চিন্তাধারা ও মানহাজের ফলাফল” 

শায়খ এখানে মানহাজ বলতে, দ্বীন কায়েমের ক্ষেত্রে অনুসৃতব্য মানহাজকে বুঝিয়েছেন।  কেননা, মানুষের মানহাজ, চিন্তাধারা যা-ই হবে তাদের আচরণ-কার্যক্রমে তা-ই প্রকাশ পায়।  এজন্যই আমরা বুঝতে পারি ইরজাগ্রস্থরা কেন কেবল আপোস-মীমাংসা ও নতজানু মেহনতের পথ বেছে নেয় আর কেন তাকফিরি মানসিকতার লোকেরা যত্রতত্র রক্তপাত আর খুনোখুনির পথই বেছে নেয়।  আমাদেরকে তাই সবার আগে আক্বীদাহ, চিন্তা ও মানহাজকে মাড়ির দাঁত আঁকড়ে ধরতে হবে, যেন কোনোভাবেই এই রাস্তা থেকে না সরে যেতে হয়।

স্মর্তব্য যে, কোনো দাওয়াত টিকে থাকা, প্রচার-প্রসার লাভ করা এবং স্থায়ী হওয়ার জন্য সংগঠিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।  কোনো জামাআত বা দল থাকা ছাড়া কোনো চিন্তাধারাই অস্তিত্বে আসে না বা টিকে থাকে না।  যদি ক্ষুদ্র জামাআতেরও অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে তামকিন (কর্তৃত্ব) লাভ এমন বিষয়, যা কল্পনা করা যায় না।

এজন্য সময়ের অপরিহার্য দাবী হচ্ছে- বিশুদ্ধ ইসলামি আক্বীদাহ, সালাফদের মানহাজকে জানা ও গ্রহণ করা।  অত:পর, সঠিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সুষ্ঠু পরিকল্পনার আলোকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের পথে ইসলামি বিপ্লব সম্পন্ন করা।  যে বিপ্লব যমীন থেকে কুফরের মূলোৎপাটন করে ইসলামি ইনসাফ ফিরিয়ে এনে দিবে। আর আল্লাহ তা’আলাই সর্বোত্তম তাওফিকদাতা।